দুতিন দিন কেটে গেল খোকার আর দেখা নেই—শেষটায় একদিন ওকে ধরলাম, “কি হল? আমার বই আর চিঠিটা দিয়েছ?”
“হ্যাঁ।”
“তারপর?”
“তারপর আর কি?”
“তারপর আর কি মানে? ও কিছু বলল না?”
“না তো।”
“না তো! তুমি আজই একবার যাও ভাই, বল তাকে আমি উত্তর চাই।”
“সে তো ওখানে নেই, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, ওদের বাড়িতে বললে সে সেখানে নেই।”
“ও মা। সে কি কথা! এতদিন আমায় বল নি কেন?”
“বললে তুমি কি করবে? ও যদি জলেই ঝাঁপ দেয় তোমার কিছু করবার আছে?” “ও খোকা, ভাই তুমি কিছু কর লক্ষ্মীটি, তোমার পায়ে ধরছি ওর খবরটা আমাকে এনে দাও—”
“আচ্ছা আচ্ছা”, খোকা পালিয়ে গেল—
১.৬ সকাল হচ্ছে, রাত্রি আসছে
সকাল হচ্ছে, রাত্রি আসছে, কী অমোঘ নিয়মে চাকা ঘুরছে। সেই ঘূর্ণমান চক্র আমাদের ভিতরে সুখ দুঃখ, শোক আনন্দকে পরিস্তুত করে এক ভাবকে অন্য ভাবে পরিণত করছে। মা বলেন, শোকের দাহ থাকে প্রথম তিন দিন, তখন আগুনে পোড়ায়, তারপর আস্তে আস্তে কমে আসে। মাতা পুত্রশোক ভোলে—বিধবা উঠে দাঁড়ায়। ক্ষয় হচ্ছে প্রতিদিন আবার ক্ষতিপূরণও হচ্ছে। সবাই জানে একথা, কানে শুনে কিংবা বইয়ে পড়ে—সে জানা জানাই নয়, এই দুঃখদহন আমাকে শেখাচ্ছে কি করে সত্যকে জানতে হয়। আমি ভেবেছিলাম চুল কেটে ফেলব—পারি নি—এখন আর ইচ্ছেও নেই। আমার অন্য মন বলছে চুল কেটে কি হবে, বিশ্রী দেখাবে। এটাই তো জীবনলিপ্সা। আমি তা জানি।
মা আমার কাছে বসে নানা গল্প করছেন—কাকা কি রকম খারাপ ব্যবহার শুরু করেছে, ওরা অন্য বাড়িতে চলে যাবে। বৌটি সুবিধের নয়। বাপের বাড়ি গিয়ে বাবার নামে মার নামে লাগাচ্ছে। আমার নামেও। আমি কিছু শুনছি নাবালিশে মুখ গুঁজে আছি। এসব কথা শুনে কি হবে? এরা যা খুশি করুক। এ সংসার আমার কাছে নিতান্ত পর হয়ে গেছে।
মা আঙ্গুল চালিয়ে চালিয়ে আমার চুলের জট ছাড়িয়ে দিয়েছেন, চুলে বিনুনী করে দিয়েছেন, মা আস্তে আস্তে বলছেন, “রু দুঃখ পাওয়াটারও দাম আছে—সব জ্ঞানীগুণীরাই তাই বলে গেছেন, তুমি ভগবানকে ডাক, তিনিই তোমার মন ঠিক করে দেবেন। শান্ত করে দেবেন। দুঃখ পেলেই তবে মানুষ তার শরণাগত হয়, অমনি তো হয় না—বাণ খেয়ে যে পড়ে সে যে ধরে তোমার চরণকে।”
মা ঘরের আলো নিবিয়ে দিয়ে চলে গেলেন—গানের কলিগুলি ঘুরে ফিরে মনের মধ্যে আসছে কিন্তু আমার আচ্ছন্ন আবিষ্ট মনে তার অর্থবোধ হচ্ছে না। আরামে যার আঘাত ঢাকা, কলঙ্ক যার সুগন্ধ’, ‘কলঙ্ক যার সুগন্ধ আমার কলঙ্ক হয়েছে? নিশ্চয়। পাশের বাড়ির বৈদ্যনাথবাবু বলেছেন, “এই সব বড় ঘরের কীর্তি! বাড়ির মধ্যে একটা খেস্টান ঘোড়াকে রেখে ঢলাঢলি ব্যাপার।” বাবা ভীষণ রেগে গেছেন, এ বাড়ি আমরা ছেড়ে দেব। এ অসভ্য পাড়ায় আর থেকে দরকার নেই। সবাই নিন্দা করছে…আমার আচ্ছন্ন মন অদ্ভুত তন্দ্রায় জড়িয়ে আসছে—‘কলঙ্ক যার সুগন্ধ’,… ‘ধরে তোমার চরণকে’…‘দেহি পদপল্লবম্’…‘দেহি মুখকমলমধুপানম্’…ধরে তোমার চরণকে…ধরে তোমার চরণকে—গানের কলিগুলি পিনাকীর হাতের পিনাক হয়ে গেছে, সোজা এসে আমার মাথার মধ্যে লাগছে তার টঙ্কার–ঝনননন, ঝনননন, তোমার চরণকে…আমি বিছানায় গড়াগড়ি দিচ্ছি, হঠাৎ আমি খাট থেকে পড়ে গেলাম।
সেদিন যখন আমার জ্ঞান ফিরে এল ঘরের মধ্যে সবাইকে দেখলাম, বাবাকেও। মির্চা চলে যাবার পর এই আমার বাবার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা। বাবা মাকে বলছেন— “দুধের সঙ্গে একটু ব্রাণ্ডি খাইয়ে দাও।”
“কালকে শ্যামাদাস কবিরাজকে ডাক–”
কাকা কতকগুলো কড়া কড়া কথা বলে ঘর থেকে চলে গেল। এই প্রথম আমি তাঁকে বাবার সামনে, উদ্ধত হতে দেখলাম। আমার কাকার উপর রাগ হচ্ছে। আস্পর্ধা দেখ, বাবাকে ওরকম বলবে-বাবা ওকে মানুষ করেছেন না! আমি নির্বাক তাকিয়ে আছি ঘরে দুটো আলো জ্বলছে কিন্তু মানুষগুলো যেন অন্ধকারে ছায়ামূর্তি—এমন কি বাবাওবাবার ছায়াটা আমার বইয়ের তাকের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বাবা খুঁজে খুঁজে বই বার করছেন। প্রথম বইটা একটা জাপানী রূপকথার বই, উজ্জ্বল নীল কাপড়ে বঁাধান তার উপর সোনালী রঙের ছাপ দেওয়া একটা অদ্ভুত জানোয়ারের ছবি। বাবা আস্তে আস্তে পাতা খুলে উপহারের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেললেন। ঐ বই ও আমাকে দিয়েছিল। তারপর ‘হাঙ্গার’ বইটার থেকেও ছিড়লেন। একটা একটা করে বই বের করছেন আর উপহারের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলছেন–গ্যেটের জীবনীখানা বের করে উপহারের লেখাটা খুঁজে পেলেন না—ওটা প্রথম পাতাতেই ছিল, মলাটের সঙ্গে লেগে রইল। ঐটুকুই ওর হাতের লেখা এবং একমাত্র চিহ্ন সারাজীবন আমার সঙ্গে আছে আর কিছু নয়-একখানা ছবি পর্যন্ত নয়!
বাবা আস্তে আস্তে কাগজগুলো কুচি কুচি করে জানালা দিয়ে নিচে ফেলে দিলেন—অন্য বাড়ি হলে হয়ত বইগুলোই নষ্ট করা হত। এ বাড়িতে তা হতে পারে না—এ বাড়িতেও চেঙ্গিস আছেন কিন্তু তিনি বই নষ্ট করতে পারেন না—মানুষ পোড়াতে পারেন কিন্তু বই নয়–বই তাঁর ঈশ্বর।
মধুপুরে বাবার বন্ধু সপরিবারে যাচ্ছেন পূজার ছুটিতে—আমাদেরও হাওয়া বদলান দরকার বাবা বলছেন নূতন জায়গায় গেলে শরীর মন ভালো হবে।
মন কিন্তু আমার ক্রমে খারাপ হচ্ছে—অন্য সব কারণ ছাপিয়ে একটা কথা তীক্ষ ছুরির ধারের মত আমার বুকের ভিতরটা খুঁচিয়ে দগদগে করে ফেলেছে—একবার যদি ওকে জিজ্ঞাসা করতে পারতাম—চিঠির উত্তর দাও না কেন? কিন্তু কি করে হবে? কে আমাকে রিপন স্ট্রীটে নিয়ে যাবে? আমি কলকাতার রাস্তা চিনি না যে তা নয়, কিন্তু একা বেরুনো তো অসম্ভব এবং বিপজ্জনক। একলা কলকাতার রাস্তায় আমি কখনো হাঁটি নি। ড্রাইভারটাকে পাঠান যায় কিন্তু ও লোকটাকে ভালো লাগছে না—ওর চোখ দুটো শাপদের মতো, ও আমাদের লক্ষ্য করে। ওকে তাই আমার ভয় করে।
