“না, না, মির্চা না”—আর ঠিক সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলাম, ওকে তো বলা হল না, কতবার ভেবেছি এইবারে বলব কিন্তু বলাই হল না। আর কোনও দিনও বলা হবে না…।
তারপর আমার কিছু স্পষ্ট মনে পড়ে না—আমার ধারণা মা আমাকে শুইয়ে দিয়েছিলেন। পরে শুনেছি আমি পড়ে গিয়েছিলাম। আশ্চর্য নয়। আমার হাড়গুলোই যে নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল। যখন আমার জ্ঞান হল,দেখি আমার ঘরের পাশের সরু বারান্দা যেটা মির্চার ঘরের সামনের সরু গলির উপর সেখানে শুয়ে আছি—মা আমার মাথায় জল দিচ্ছেন আর তার চোখ দিয়ে জল পড়ছে, তিনি বলছেন, “দুর্গা শ্রীহরি, দুর্গা শ্রীহরি কি করি আমি, কি করি এখন?”
মির্চা চলে গেছে—কোথায় গেল কে জানে? কে আমাকে বলবে? আমার সঙ্গে কারু দেখা হচ্ছে না—মা আমাকে বেরুতে দিচ্ছেন না, আমার শোকাহত মূর্তিটা সকলের সামনে। থেকে আড়াল করে রাখতে চান-লোকে যে হাসবে। আমি শরবৎ ছাড়া কিছু খাই না, খাওয়া অসম্ভব। মা তো ছোটখাট ডাক্তার বললেই হয়, মাও জোর করেন না। মা বলেন—দুঃখ শোক রাগ এর যে কোন অবস্থায়ই শরীরে বিষ হয়। তখন জলীয় কিছু খেলেই যথেষ্ট। মাঝে মাঝে আমার ইচ্ছে হয় সাবিকে ডেকে জিজ্ঞাসা করি যাবার সময়। ওকে কিছু বলে গেছে কিনা। আবার ভাবি, না থাক, ও ছেলেমানুষ, ওর সামনে এই যে কাণ্ডটা হল এটাই যথেষ্ট অন্যায় হয়েছে, এ রকমটা না হওয়াই উচিত ছিল। তা ছাড়া ওকে আর বলবেই বা কি?
পরে শুনেছি ও বলেছিল—“কি করলে সাবি, এ কি করলে?” সাবি বেচারা কেঁদে কেঁদে বলেছে—“আমি বুঝতে পারি নি ইউক্লিডদা, আমি বুঝতে পারি নি। তোমার এত কষ্ট হবে, দিদির এত কষ্ট হবে।”
ক’দিন পরে কি জানি–একটা সন্ধ্যা দেখতে পাচ্ছি–বাইরে তখনও ম্লান আলো আছে—ঘরের ভিতর অন্ধকার—এককোণে নীল বাতি—ঢাকনা পরান—বেশির ভাগ দরজা বন্ধ। আমাকে বন্দী করা হয় নি, লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা হয়েছে, হঠাৎ দরজা ফাক করে একজন কে ঢুকল—তার কথাগুলো মনে আছে, কিন্তু তার মুখটা আমি দেখতে পাচ্ছি না। তার শাড়ির বেড় দেওয়া পা দুটো আস্তে আস্তে আমার দিকে এগিয়ে আসছে, সে কে? কাকীমা, না শান্তি, না চাপা পিসি, না অন্য কেউ? সে আমার বিছানার কাছে এসে দাঁড়াল—“দেখো রু, পালাবার চেষ্টা করো না। জেনো তুমি এখনও নাবালিকা–তুমি যদি পালাও, তোমাকে তো ধরে আনা হবেই—অবশ্য তোমার আর কোন ক্ষতি হবে না, কিন্তু ওকে জেলে দেওয়া হবে। সে কোনো ভদ্রলোকের জেল নয়, চোর ডাকাতের সঙ্গে থাকতে হবে। হাফ প্যান্ট পরিয়ে ওকে দিয়ে পাথর ভাঙাবে।”
“কেন তোমরা আমাকে শাসাচ্ছ”—আমি বালিশে মুখ গুঁজে আছি, কি নিরুপায় আমি কি নিরুপায়–“আমি কি কোথাও যাচ্ছি? আমি তো এই ঘরে একলা পড়ে আছি—এত বাক্যযন্ত্রণার দরকার কি?”
“তোমার ভালোর জন্যই বলছি।”
বেশ দু’একটা দিন কেটে গেছে। আমার সবচেয়ে কষ্ট এই, ওকে কোনো কথা বলা হল না। কত কথা বলার ছিল, এ জীবনে আর বলা হবে না। যাবার আগে যদি একটা ঘণ্টাও একলা কথা বলতে পারতাম। যতদিন ছিল শুধু কষ্টই দিয়েছি ওকে, আর কিছু না, আর কিছু না
এখন ভোরবেলা দরজাটা একটু ফাক হল, খোকা ঘরে ঢুকল, ঢুকেই ওর স্বভাবসিদ্ধ ভাড়ামি শুরু করেছে—“এ্যাঃ পড়ে পড়ে কান্না, ধিক্ ধিক্ কোথা হতে এলে তুমি নির্মম পথিক…” ও বিদায়-অভিশাপ থেকে দেবযানীর বক্তব্য আওড়াচ্ছে—“ওঠো, মির্চা তোমার একখানা বই চেয়েছে, ওর কাছে নেই।”
“তুমি জানো সে কোথায় গেছে?”
“জানি বইকি, সেই রিপন স্ত্রীটে।”
“সেই অ্যাংলো ইণ্ডিয়ানদের বাড়িতে?” হায় কপাল! ও যে ওদের একেবারে ঘৃণা করে, ওদের ওখানে থাকতে ভালোবাসে না-ওখানকার মেয়েগুলো ভালো না রে…”
“তা যাবে কোথায়? একদিনের মধ্যে তাড়িয়ে দিলে এই বিদেশে বেচারা যাবে কোথায়?”
“ও খোকা ভাই-ওরে খোকা রে—কি করি ভাই এখন…?”
“চুপ চুপ চুপ” ও মুখে তর্জনী ঠেকিয়ে ভঙ্গিমা করে ঘুরে নিল এক পাক—“চারিদিকে স্পাই—আমি পালাব—শীঘ্র বই বার কর আমি বারান্দায় দাঁড়াই।”
আমি বইটা বের করে বারান্দায় এলাম…তখনই আমার মনে হল ওকে সাবধান করে দিই—বাবা যদি জিজ্ঞাসা করেন তাহলে কিছু যেন স্বীকার না করেও তো জানেই না যে অন্যায় কাজ করেছে তাই বলে ফেলতেও পারে—আমি বইটার পিছনের পাতা খুলে লিখতে গেলাম—আমার হাত কেঁপে গেল, লাইন বেঁকে গেল, আমি একটা মিথ্যা কথাকে প্রেমের মূল্যে অক্ষয় করে দিলাম সেকথা জানতেও পারলাম না—Mircea Mircea Mircea I have told my mother that you have kissed me only on my forehead.
“খোকা ভাই আমি একটা চিঠিও দেব। নিয়ে যাও, উত্তর নিয়ে এস।”
“তাড়াতাড়ি কর-মামা টের পেলে এই মুহূর্তে বিদায় করে দেবেন আমাকে।”
আমি ছোট্ট একটা কাগজ নিয়ে চিঠি লিখতে বসলাম। কি লিখব? কত কিছু লেখার ছিল মনে পড়ছে না। থাক। দুটোই কথা আছে খুব জোরের সঙ্গে বলতে হবে। মনে একান্ত বিশ্বাস নিয়ে এ সত্য আমি রাখবই রাখবই…আমি লিখলাম, তোমাকে কখনও ভুলব না I shall never forget you…never forget you, never forget you আর লিখলাম তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করব—I shall wait for you, wait for you.’লাইনের পর লাইন একই কথা লিখে কাগজটা ভরিয়ে আমি খোকাকে দিলাম—
“খোকা এই চিঠি ওকে দাও তারপর যা হয় করা যাবে।”
আমার অনেক চুল এই ক’দিনে জটা হয়ে গেছে। আমি মাকে ছুঁতে দিই নি। মার সঙ্গে সর্বদা খিটিমিটি করছি, মা সমস্ত সহ্য করছেন। আমি চিঠিটা ওকে দিয়ে ঘরে এসে আবার শুয়ে পড়লাম। আমার দীর্ঘ কেশভার ঝুলিয়ে দিয়ে চোখের উপর বাহু ঢাকা দিয়ে আমি প্রতিজ্ঞা করতে লাগলাম—“ভুলব না, ভুলব না, ভুলব না।” মনের উপর তো বাবার হাত নেই—সেই প্রতিজ্ঞা নিঃশব্দ পদসঞ্চারে আমার অগোচরে নামতে লাগল-পা ফেলে সন্তর্পণে নিচে বহু নিচে মনের অতলে যেখানে বাইরের জগতের যাতায়াত নেই, যেখানে দিন রাত্রি পৌঁছয় না, যেখানে সকাল সন্ধ্যা নেই, যেখানে সূর্য ওঠে না, চন্দ্র তারা জ্বলে না, সেইখানে নেমে গিয়ে মহাযোগনিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়ল—তখন কে জানত তেতাল্লিশ বছর পরে তার ঘুম ভাঙবে?”
