অনেকক্ষণ আমরা চুপ করে আছি। নিচে বাচ্চাদের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। জাগ্রত বাড়িতে রোজকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরু হয়েছে কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের যেন কোনো যাগ নেই—এই মুহূর্তে আমি আর মা যেন অনেক দূরে অন্য জগতে অন্য কোনো সময়ে চলে গেছি। দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ পরে মা বললেন, “রু সত্যি কথা বল, মির্চা তোমায় কি কি করেছে?” আমি বালিশে মুখ গুঁজলাম। আমি এসব প্রশ্নের উত্তর দেব না, কিছুতে না, নয়ত মিথ্যা কথা বলব। কি করে আমি সত্য কথা বলব? তাহলে সব তো ওর দোষ হবে। শুধু ওরই কি দোষ? আমার দোষও কম নয়, একটুও কম নয়, ওর এখানে মা নেই বাবা নেই কেউ নেই, পরের বাড়িতে আছে। এখানে আমার বাবাই ওর সব, এখন তিনিও যদি বিরূপ হয়ে যান ও কোথায় যাবে?
মা বললেন, “রু ওঠ, মুখ তোলো, আমার দিকে তাকাও।” মার স্বর কঠিন, স্নেহলেশশূন্য। আমি মুখ তুলেছি কিন্তু মার দিকে তাকাতে পারছি না, মার চোখে চোখ রেখে মিথ্যা কথা বলা! আমার মুখ শুকিয়ে গেছে, গলা শুকিয়ে গেছে, কথা বলতে পারছি না। অত সুন্দর জিনিস পাবার জন্য এত নিচে নামতে হবে কেন?
“তুমি কথা বলছ না কেন রু, তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছই বা না কেন? তোমার মুখ এমন কাল হয়ে গেছে কেন? কোথায় আমার তেজস্বিনী সত্যবাদিনী মেয়ে যে মিথ্যার সঙ্গে কখনো আপস করে না? আজ তার এ’দশা কেন? ছিঃ অপরাধের ভারে তোমার মাথা নিচু হয়ে গেছে এও আমায় দেখতে হল” মার গলা ধরে এসেছে। আমি জানি মা যা বলছেন তা সত্য কিন্তু যত অন্যায়ই হোক আমি মিথ্যা কথাই বলব। ওকে কখনো বিপদে ফেলব না।
“বল রু, ও তোমাকে চুমো খেয়েছে?”
“হ্যাঁ—”
“কোথায়?”
এইবার মনে পড়ে গেছে, একটা নিরাপদ উত্তর দিতে হবে—
“কপালে—”
“শুধু এই?”
“হ্যাঁ—”
“তোমরা কোনো গন্ধর্ব বিবাহটিবাহ কর নি তো?”
“সে আবার কি?”
“কেন গন্ধববিবাহ কি তুমি জান না? মালা বদল, আংটি বদল বা ঐ রকম কিছু?”
“না মা, ও সব কথা আমাদের মনেই হয়নি।” পরে বুঝতে পেরেছি মা ভাবছিলেন ও রকম একটা কিছু হয়ে থাকলে মার পক্ষে আমাদের সাহায্য করা সহজ হবে।
“দেখ রু, আমি তোমাকে যা বলেছলাম, তা পারলাম না, তোমার বাবা কিছুতে রাজী হলেন না।”
আমি কাপছি—মা আমার গায়ের উপর হাত রাখলেন—“শান্ত হও।”
“কেন মা? কেন মা?”
“তোমার বাবা বলেছেন ওদের আমরা কিছু জানি না—ওদের বংশ জানি না, ওর বাপ কেমন ঠাকুর্দা কেমন কে জানে? ওর হয়তো কোনো খারাপ অসুখও থাকতে পারে।”
আমি অবাক হয়ে গেছি, এ আবার কি অদ্ভুত কথা—“মা আজ প্রায় এক বছর ও আমাদের এখানে আছে একদিনের জন্য জ্বর পর্যন্ত হয়নি। ওর অসুখ হবে কেন?”
“সে অসুখ নয়, সে সব অনেক কথা ও তোমার দরকার নেই জেনে। তুমি তো জান ফরাসীরা কি রকম খারাপ লোক হয়, একেবারে অসভ্য।”
“কিন্তু ও তো ফরাসী নয়”
“ওই একই হল—ওদের সভ্যতাটা ফরাসী সভ্যতা।”
“ফরাসী সভ্যতা খারাপ হবে কেন? সমস্ত ইয়োরোপই তো ফরাসীদের অনুকরণ করে।”
“করে করে কি উন্নতি হয়েছে?”
“ইয়োরোপের উন্নতি হয় নি?”
“আরে সে কথা নয়—ওদের জীবনটা কি তা তো তুই জানিস না। বড় হলে মোপার্সার গল্পগুলি পড়লে বুঝতে পারবি। স্বামীস্ত্রীতে বিশ্বস্ততা নেই—এ ওকে ক্রমাগত ঠকাচ্ছে—একজনকে বিয়ে করছে আর একজনের সঙ্গে চলে যাচ্ছে, ওরকম একটা বিশ্রী সমাজে তুই বাঁচতে পারবি না।”
“আমি মোপাসার গল্প পড়েছি ‘নেকলেস’, কিছুই খারাপ না।–”
“আরে না না, কত গল্প আছে—আর তোর বাবা যা সব বললেন, ভয়ে আমার হাত পা গুটিয়ে যায়।…এ কখনো ভালো হবে না রু।”
“মা মা মাগো।”
“কি করব রু—উনি বলেছেন এ বিষয়ে আমি যদি জোর করি তাহলে উনি মরে যাবেন। তুমি ওঁকে মেরে ফেলতে চাও? তুমি ওঁকে একটুও ভালোবাস না? ঐ ছেলেটাই তোমার অত আপন হল?”
আমি নিজেই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি, আমার মনে বাবার অসুখের কথায় কোনো দুশ্চিন্তা আসছে না—বরং রাগ হচ্ছে—এই অসুখের ভয় দেখিয়েই মাকে উনি সর্বদা নিজের মতে নিয়ে আসেন। আর কি কারু ব্লাডপ্রেসার হতে পারে না? আমার কেন ব্লাডপ্রেসার হয় না? হে ভগবান আমার এখুনি ব্লাডপ্রেসার হোক। মা বলছেন “রু তুমি যদি এ নিয়ে বাড়াবাড়ি কর তাহলে ওর স্ট্রোক হয়ে যেতে পারে। সেটা কি তুমি চাও? নিজেকে সামলে নাও, যা চাওয়া যায় তার সব কি পাওয়া যায়?”
জানি না আমার-ঘণ্টা মিনিট কোথা দিয়ে কেমন করে কাটল। দুপুরবেলা এলেন, ‘রু ওঠ, মির্চা চলে যাচ্ছে, ও বলেছে যাবার আগে ও তোকে একটি বার দেখতে চায়।”
আমি উঠতে পারছি না, আমার শরীরের সমস্ত হাড় যেন গুড়ো হয়ে গেছে—আমি কি করে উঠে দাঁড়াব?
“রু ওঠ ওঠ, ও নিচে রোদে পঁড়িয়ে আছে—তুই ওপরের বারান্দায় দাঁড়াবি—তোর বাবা রাজি হয়েছেন, ও শুধু তোকে একবার দেখেই চলে যাবে।”
এই উনিশ শ’ বাহাত্তর সালে যখন আমি আবার উনিশ শ’ ত্রিশ সালে প্রবেশ করলাম তখন আবার ঠিক সেই আঠারই সেপ্টেম্বরের অবস্থা হল! আবার আমার হাড় গুঁড়িয়ে গেল, বুকে মোচড় দিতে লাগল—কী আশ্চর্য আমি জানতামই না তেতাল্লিশ বছর ধরে আমার সত্তার একটা অংশ উনিশ শ ত্রিশ সালেই স্থির দাঁড়িয়ে আছে—‘অজঃ নিত্য শাশ্বতোহয়ং পুরানো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’—আজ সে শরীর নেই কিন্তু সে আছে, সেই আছে, সে অমৃতা।
আমি বারান্দার মাঝখানের ফাকটার কাছে দাঁড়িয়েছি, ও নিচে দাঁড়িয়েছে— মাধবীলতাটার অল্প ছায়া ওর মুখের উপর পড়েছে—সেই যন্ত্রণাকাতর মুখ আমার দিকে তুলে আছে—মনে হচ্ছে ওকে যেন কেউ আগুনের শলা দিয়ে বিঁধছে। আমি আজ পর্যন্ত কারু মুখে অমন যন্ত্রণার চিহ্ন দেখি নি। ও হাত তুলে আমায় নমস্কার করল—“বিদায়—”
