মা বলছেন, “বল রু বল সত্যি তুমি চাও কিনা। যদি তুমি চাও তাহলে ওরই সঙ্গে নিশ্চয় তোমার বিয়ে দেব। আমি আমার মেয়েকে মনে মনেও দ্বিচারিণী হতে দেব না।” আমি মার পায়ে মাথা রেখে বললুম, “হ্যাঁ মা আমি চাই, চাই আমি। ওকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না।”
“তাই নাকি?” মা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন, “আচ্ছা তাই হবে।” আমি অনেকক্ষণ মার কোলে শুয়ে রইলাম, আকাশের নিচে রাত্রের শীতল স্পর্শ মার স্নেহের মতই আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। আমার মন শান্ত, শান্ত। চারদিক কী নীরব প্রগাঢ় শান্তি। আমরা এত দিনের এত আশঙ্কা ধুয়ে মুছে গেল এক মুহূর্তে। আমার অনেক আগেই মাকে বলা উচিত ছিল। আমি মাকে সম্পূর্ণ ভুল বুঝেছিলাম। মা তো একবারও বললেন না ওকে ভালোবাসা আমার পাপ হয়েছে। আর সাবি যদি সবটা বলেও থাকে তাও তো কিছু বললেন না। অনেকক্ষণ পরে মা বললেন, “তুই তোর ঘরে চলে যা রু। আজ আর নিচে যাসনে। আমি তোর ঘরে খাবার নিয়ে আসব।”
সে রাত্রে ওর সঙ্গে আর দেখা হল না। ও সেদিন পিয়ানোও বাজাল না। নিচে পিয়ানো বাজালে আমি মনে এবং শরীরেও অর্থাৎ আমার চেতনার পর্বে পর্বে মিলনের গভীর আনন্দ অনুভব করতাম। একেক দিন আমার মনে হত—ওর সঙ্গে যদি আমার দেখা নাও হয়—শুধু সুরের মধ্যে ওর অস্তিত্বের খবর ভেসে আসে সেও যথেষ্ট। সেদিন রাতে কেবল মনে হতে লাগল ওকে আমি এত ভয়ের কথা বলেছি কিন্তু আজ বলতে পারলাম না। ভয় নাহি ভয় নাহি। কাল সকালে মা হয়ত ওকে প্রথম বলবেন। বিনিদ্র চোখে অনেক রাত অবধি আমি বিবাহরাত্রির উৎসবের দিবাস্বপ্ন দেখতে লাগলাম। আমি ওকে দেখছি আলপনা দেওয়া পিড়ির উপর দাঁড়িয়ে আছে—গরদের ধুতি চাদর পরে—চন্দনচর্চিত নীল কলেবর, পীত বসনে বনমালী, নীল কলেবর যতই ভালো হোক তার চেয়ে শ্বেত কলেবরই বেশী ভালো। ওকে কি যজ্ঞােপবীত রান হবে? নাঃ, তা কি করে হবে? আর শুভদৃষ্টির সময়? যখন চাদরটা মাথার উপর দিয়ে দেবে আমাদের তখন শ্ৰীমতী মালবিকা অর্থাৎ মালাদেবী যিনি হিংসায় মরে যাবেন বা এখনই যাচ্ছেন কারণ তিনি ইতিমধ্যে একবার ঠোঁট বাকিয়ে আমাকে বলেছেন, কচ ও দেবযানী অভিনয় কেমন চলছে? তিনি বললেন, এচোড়ে পাকা মেয়েটি তো শুভদৃষ্টি আগেই সেরে নিয়েছে। আর রানু, আমার স্কুলের বন্ধু রানু, সে বিস্ফারিত চোখে আমায় বলবে, “তুই শেষ পর্যন্ত লভম্যারেজ করলি, তোর তো খুব সাহস!”
সকলের কথা আমার মনে পড়ছে—মীলু কি বলবে, দিদিমা কি বলবেন, আরাধনা? আমার মনে হচ্ছে সকলেই খুশি হবে। কেউ-ই আমাকে নিন্দে করবে না। সব ছাপিয়ে নিচে ওর ঘুমন্ত মুখটা চোখে ভেসে উঠছে, বেচারা এখনও কিছু জানে না ওর ইচ্ছা পূর্ণ হবে। ও আমাকে এত করে চায়, আমরা কখনো চার-পাঁচ মিনিটের বেশী কাছাকাছি হতেই পারি না, এখন? তোমাতে করিব বাস দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস। কিন্তু বাবা মাকে ছেড়ে থাকতে পারব ত? তা থাকতে হবেই বা কেন, ও তো এখানেই থাকবে বলেছে। বাঃ, ও যাই বলুক ওদের দেশেও যেতে হবে নিশ্চয়ই, ওর মাকে আমি দেখব না? ওর বোনকে? ওর দেশে যাবার কথায় আমার প্রিনসেপ ঘাটের কথা মনে পড়ল—একবার রবীন্দ্রনাথ বিলেতে যাবেন, তাকে বিদায় অভিনন্দন, যাকে বলা হত ‘সী অফ করার জন্য আমরা গিয়েছিলাম, সে দিনের কথাটা মনে এল, কী রকম প্রকাণ্ড জাহাজ! এবার ভয়-টয় কেটে গেছে, লজ্জা, দারুণ লজ্জায় আমার কান ঝা ঝা করছে—তাকে তো বলতে হবে, কে বলবে? আমিই বলব। কখন? যখন উনি কলকাতায় আসবেন! প্রায় এক বছর উনি বিদেশে।
রাত্রি গভীর হচ্ছে, আধো ঘুমে আধো জায়ায় আমি স্ট্র্যাথেয়ার্ড জাহাজটাকে দেখতে পাচ্ছি, দু’ধারে তটরেখার ভিতর দিয়ে সরু জলপথে এগিয়ে চলেছে দুলে দুলে— এটা সুয়েজ ক্যানাল—ওধারে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি, সেদিকে যেতে যেতে জাহাজটা ময়ূরপঙ্খী হয়ে গেছে।
পরের দিন মার মুখ দেখে আমার বুক কেঁপে উঠল। মার চোখ ফোলা স্বর গম্ভীর। মা কি সারারাত ঘুমোন নি?
“রু তুমি আজ নিচে নেমো না, তোমার ঘরেই থাক, কারু সঙ্গে কথা বোলো না—শান্তি, ছুটকি কারু সঙ্গেই নয়। আমি আসছি একটু পরে।”
আমি স্তম্ভিত দাঁড়িয়ে রইলাম–কি হল আবার?
আমার হাত পা ঝিম ঝিম করতে লাগল, দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব, আমি রাত্রের বিছানাতেই আবার শুয়ে পড়লাম।
কিছুক্ষণ বাদে মা এক গ্লাস দুধ নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
“এটা খেয়ে নাও। তোমার সঙ্গে কথা আছে।”
আমি দুধ খেতে ভালোবাসি না, একেবারে নয়। কিন্তু এখন বিনা প্রতিবাদে মেনে নিলাম। মা আমার পাশে খাটে বসে খুব কঠিন স্বরে, আমাকে বললেন, “তোমার বাবা আমাকে খুব ভালো করে খোঁজ নিতে বলছেন তোমরা কতদূর পর্যন্ত গিয়েছ?”
আমি চুপ করে আছি। আমি ভাবছি সাবি বা শান্তি কেউই বানিয়ে মিছে কথা বলবে! শান্তি যদিও বানিয়ে গল্প করতে পারে–সাবি কখনো বলবে না। আমরা ভাইবোনেরা মিছে কথা বলি না। মা বলে দিয়েছেন—“যদি দণ্ড সহিতে হয়, তবু মিথ্যা বাক্য নয়। আমরা তো দুরে কোথাও যাই নি ওখানেই তো ছিলাম। মা আবার বললেন, “বল বল কথার উত্তর দাও, কতদূর পর্যন্ত গেছ তোমরা?” মার প্রশ্ন আমার ঠিকমতো হৃদয়ঙ্গম হয়নি—আমি বললাম, “তুমি ওদের জিজ্ঞাসা কর না লেকের থেকে অন্য কোথাও দূরে যাইনি আমরা।” মা নিশ্চিন্ত হলেন। আমার অজ্ঞতায় খুশি হলেন।
