একদিন হঠাৎ ঝড় উঠে বৃষ্টি নেমেছে। আমি দুপুরবেলা নিচে নেমে এসেছি—ভাবছি উঠোনে দাঁড়িয়ে ভিজব, ও বললে—“অমৃতা এদিকে এস।”
আমরা ওর ঘরের সামনের দিকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছি, ও চৌকাঠে হেলান দিয়ে ছিল, দু হাত বাড়িয়ে আমাকে টেনে নিল।
“কেন তুমি আমার হাতটা সরিয়ে দিচ্ছ অমৃতা?”
“আমার ভয় করে।”
“ভয়, না ঈর্ষা?”
“ঈর্ষা আবার কাকে?”
“তোমার নিজেকে কি তুমি ঈর্ষা কর? তোমার শরীরকে কি তুমি ঈর্ষা কর? তোমার কি মনে হয় আমি তোমার চেয়ে তোমার শরীরটাকে বেশি ভালোবাসছি? তা নয় অমৃতা তা নয়, আমি তোমাকেই খুঁজছি তোমার আত্মাকে খুঁজছি। তুমি তো তোমার শরীরেই আছ, যে তোমাকে চোখে দেখা যায় না হাতে হেঁয়া যায় না সেই দেহের অতীত তোমার সত্তাকেই আমি পাচ্ছি তোমাকে স্পর্শ করে।” ও আমার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে।
“আমি বুঝতে পারি না মির্চা, বুঝতে পারি না।”
১৯৩০ সালের কাহিনী শেষ হয়ে এল। আমার দুর্ধর্ষ তত্ত্বজ্ঞানী পিতা ও অভিজ্ঞ মাতা এই দুই তরুণ তরুণীর প্রণয়লীলার কোনো খবরই রাখেন না। কোনো সন্দেহ তাঁদের হয় নি, তারা খবর পেলেন এগার বছরের একটা মেয়ের কাছ থেকে।
সাবির অসুখের কোনো স্থিরতা নেই, ওর মেজাজ অনুসারে তা কমে বাড়ে। যখন মনোযোগ আকর্ষণের সময় হয় তখন ওলট পালট কথা বেড়ে ওঠে। সেদিন আমরা সকলে অর্থাৎ ভাইবোনদের নিয়ে লেকে বেড়াচ্ছি, ওরা ছুটোছুটি খেলছে। আমরা দুজনে একটা ঝোপের পাশে বসে আছি নূতন লেকটার উত্তর দিকে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। লোকজন বিশেষ কেউ নেই। আমার মনে পড়ে না শান্তি আমাদের সঙ্গে সেদিন ছিল কিনা। আমরা দুজনে কাছাকাছি বসে আছি, নীরব অন্ধকার মাখান আকাশ আমাদের ঘিরে আছে, সামনের তরঙ্গহীন নিথর জলে পিছনের বাতির আলোতে আমাদের যুগল ছায়া দীর্ঘীকৃত। চারিদিক নিস্তব্ধ, আমার মনও শান্ত। এক আশ্চর্য প্রশান্তিতে আমি আবিষ্ট। ও কিন্তু চঞ্চল, অস্থির, ধৈর্যহারা হঠাৎ ও আমার উরু স্পর্শ করল।
“না না মির্চা না!”
“কেন না? তুমি আমার হবে না? আমাকে তোমার ভালো লাগছে না?”
“হবে না মির্চা হবে না। ওরা কখনো রাজি হবেন না।”
“সে কি, ওরা তো তোমায় আমাকে দিয়েই দিয়েছেন।”
বেচারা ও একেবারে আমাদের বুঝতে পারে না। আমাদের সংস্কার ধর্ম আচার ব্যবহার ও যতই শুনুক বুঝতে পারে না। ও আমাকেও বুঝতে পারে না।
“ছেড়ে দাও মির্চা আমার ভয় করছে।”
“কখনই তোমাকে ছাড়ব না। কখনই না, এ জীবনে নয়।”
এমন সময় হঠাৎ একটা চেঁচামেচি, কে যেন ডাকল, আমরা ছুটে গিয়ে দেখি সাবি মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে, চিৎকার করে আবোল-তাবোল বকছে। মির্চা তাকে তুলে এনে বড় লেকের পাশে একটা বেঞ্চিতে শুইয়ে দিল। আমি ওর মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে ওকে শান্ত করতে চেষ্টা করছি। আস্তে আস্তে চাঁদ উঠছে, চাঁদের ছায়া পড়েছে লেকের জলে। সাবি ছটফট করছে “ইউক্লিডদা তুমি আমার কাছে বস। আমাকে একটু আদর কর।” মির্চা এগিয়ে এল “কি কষ্ট হচ্ছে তোমার, কি কষ্ট হচ্ছে?” সে ওর কপালের উপর একটা ছোট্ট চুমো খেল। সাবি বলছে, “এবার দিদিকে আদর কর, কর, কর” ও উন্মত্তের মতো হয়ে উঠেছে। “আঃ সাবি চুপ কর, কি পাগলামি হচ্ছে।” আমি যত থামাতে চাই ও বার বার জেদ করছে, মির্চাও এ সুযোগ ছাড়তে রাজি নয়। “আচ্ছা আচ্ছা করছি” এই বলে ও আমাকে জড়িয়ে ধরে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলল। কিন্তু সাবি সেই মুহূর্তে আবার চিৎকার করতে লাগল “কি করেছ তুমি দিদিকে, কি করেছ।” যত বোঝাই কিচ্ছু না কোথায় কি, এই তো মির্চা তোর পাশে দাঁড়িয়ে আছে তা সে থামবেই না। অনেকক্ষণ গল্প করে ওকে থামাচ্ছি ভোলাচ্ছি—আর আমার বুকের ভেতর কাপতে শুরু করেছে। প্রেমের অমৃতকে ছাপিয়ে ভয়ের বিষ আমার সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে গেছে, আমাকে বিষধর ছোবল মেরেছে। আমরা গাড়িতে উঠলাম। মির্চার কোনো চিন্তা ভাবনা নেই। ও কল্পনাও করতে পারে নি কি ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে।।
বাড়ি এসে পৌঁছলাম। সাবি গাড়িতে চুপ করে ছিল। আমি ভাবছি ও হয় ভুলেই গেছে। অসুস্থ তো। মির্চা গাড়ি থেকে নেমে নিচের ঘরে চলে গেল…আমি উপরে।
এদিক থেকে, ওদিক থেকে বাবা মার গলা পাচ্ছি আর আমার বুকের ভিতর কেঁপে কেঁপে উঠছে। পরে যখন এ সময়ের কথা ভেবেছি, তখন মনে হয়েছে সেদিনের আনন্দের সঙ্গে ভয় কি ওতঃপ্রোত হয়েই না মিশে ছিল, এক মুহূর্তের জন্য ছাড়ে নি, সত্যিই কি আশ্চর্য চোখ রাঙানো ভয়-দেখানো সমাজে আমরা বাস করতুম।।
ঘণ্টাখানেকও হবে না মা এসে আমার ঘরে ঢুকলেন, “রু ছাতে চল।” মার মুখ গম্ভীর, গলা কাঁপছে। আমরা ছাদে এলাম, তারা ভরা ঠাণ্ডা রাত—আমার এখন আর তত ভয়। নেই। পারব, আমি হয়ত মার সঙ্গে কথা বলতে পারব।
“সাবির কাছে এ-সব কি শুনলাম রু? আমি তো বিশ্বাস করতে পারছি না।”
ছাদে একটা বড় তক্তপোষ আছে, মা তার উপর বসেছেন—দুহাত দিয়ে হাঁটু জড়িয়ে। মার চুল খোলা পড়ে আছে, মুখের উপর চাদের আলো পড়েছে। মাকে দেবতার মত দেখাচ্ছে। মার বয়সই বা কত? আমার চেয়ে মাত্র মোল বছরের বড়। আমরা আস্তে আস্তে বন্ধুর মত হয়ে উঠছি।
মা বললেন, “সব আমাকে খুলে বল।”
আমি খাটের উপর উপুড় হয়ে মার পায়ের উপর মাথা রাখলাম—“মা মা মা”
“বল রু বল, তুমি ওকে কি বিয়ে করতে চাও?”
গুরুত্বপূর্ণ সময়েও আমার অনেক সময় লঘু কথা মনে পড়ত—আমি ভাবছি এবার তো আমার নিজ মুখে বলতে হবে যে আমি ওকে বিয়ে করতে চাই, কি লজ্জার কথা! ছোটবেলার ঘটনার মত হবে। ছোট থেকে শুনে আসছি বিয়ের কথাটাই খুব লজ্জার ব্যাপার, যার বিয়ে সে কোনো কথা বলতে পারে না। মাথা নিচু করে থাকে লজ্জায়। আমি ভাবতুম বিয়ের কথাতেই যখন এত লজ্জা তখন বিয়েটা করে কি করে, লজ্জায় মরে যায় না কেন? তারপর ঠাকুমার সঙ্গে এক বিয়ে বাড়িতে গিয়ে সারাদিন ছিলামকনে খুব চটপটে—নিজেই সবাইকে বসাচ্ছে, আপ্যায়ন করছে, আলমারী খুলে গয়না দেখাচ্ছে, লজ্জার চিহ্নমাত্র দেখলুম না। ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ঠাকুমা, কনের তো লজ্জা করছে না?” ঠাকুমাও খুব বিরক্ত, “বেলজ্জা বেহায়া মেয়েমানুষ” আজ? আজ ঠাকুমা থাকলে?
