কবি প্রিয়ংবদা দেবী তার ছোট ছোট মাপের কবিতার বইগুলি সব আমায় দিয়েছিলেন। তাকে তো খুব কাছ থেকে দেখেছি। অমন স্নেহপ্রবণ মধুরভাব বিদূষী আজকাল তো দেখি না। কেউ হয়তো জানে না, তার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাহের প্রস্তাব হয়েছিল—রবীন্দ্রনাথের পত্নীবিয়োগের পর। মহর্ষিদেবও ইচ্ছা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ করেন নি। শুনেছি প্রসিদ্ধ জাপানী শিল্পী ওকাকুরা তাঁকে ভালোবেসেছিলেন—একটা ছবিও এঁকেছিলেন! এসব কথা আভাসে শুনতাম—মধুর সুখস্পর্শ কাহিনী—এঁরা কেউ এদের জীবন লিখে গেলেন না, আমরা ভালো করে কিছু জানতে পারলাম না। কোন কোন মানুষের জীবনই তো দীপ যা অন্যের পথে আলো ফেলে। পৃথিবীকে চিনতে শেখায়।
প্রিয়ংবদাদেবীর কথা মনে পড়লে একসঙ্গে অনেকগুলি নারীমূর্তি মনে আসে—এঁরা সকলেই বিদগ্ধা ও বহুগুণসম্পন্না—এবং প্রত্যেকেরই নানা বৈশিষ্ট্য—সরলা দেবী, হিরন্ময়ী দেবী, প্রিয়ংবদা দেবী, ইন্দিরা দেবী—সমস্ত নাম উল্লেখযোগ্য, সভাসমিতিতে এদের পাশাপাশি দেখতে আমাদের চোখ অভ্যস্ত ছিল—সকলেরই ব্রাহ্মিকা করে শাড়ি পরা, হাতে জাপানী পাখা—আভিজাত্যের প্রতিমূর্তি। সরলা দেবী শুনেছি খবু কড়া মেজাজের মানুষ ছিলেন। কিন্তু তার কাছে আমি যে স্নেহ পেয়েছি তাতে আমার সে কথা সমর্থন করতে ইচ্ছে হয় না। বস্তুতঃ ঠাকুরবাড়ির সম্পর্কিত প্রত্যেককেই আমার খুব ভালো লাগত, কাজেই আমার তাদের সম্বন্ধে মতামত পক্ষপাত-দোষে দুষ্ট। অনুরূপা দেবীকে খুব কাছ থেকে আমি দেখি নি, তিনি এ সমাজের মানুষ নন।
কান্তিচন্দ্র ঘোষের গোফ ছিল কিন্তু তিনি তা দিচ্ছিলেন না। যদিও ওমর খৈয়ামের রুবায়েৎ-এর অনুবাদ করে তখন তিনি বিশেষ খ্যাতিলাভ করেছেন তিনি সুন্দর আবৃত্তি করতেন—’Oh! take the cash and let the credit gonor heed the rumbling of the distant drum’—কথাটা সেদিন বড় সত্য ছিল—ভবিষ্যতের কোনো বিভীষিকা সেদিন আমি দেখতে পাইনি—আমার দুই হাত cash-এ পূর্ণ—নগদ মূল্যে ভরা, মোহর বাজছে ঝম্ঝম্।
এখনকার সঙ্গে একটা তুলনা আমার মনে আসে, এখন যারা ইনটেলেকচুয়াল বলে খ্যাত তাদের উন্নাসিকতা মনে হয় অনেক বেশী। অল্পবয়সী ছেলেরাও কেউ অমুক কাগজে লিখছে, কেউ অমুক প্রাইজ পেয়েছে, ব্যাস তাদের সামনে এ বয়সেও ভয়ে আমরা মাথা তুলতে পারি না। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয় তবে তারা ব্যতিক্রমই। আমি তো আজ রীতিমত হীনমন্যতা রোগে ভুগি কারণ পুরনো হয়ে গেছি। কিন্তু সেদিন এইসব প্রসিদ্ধ সাহিত্যিকরা যারা জ্ঞানে গুণে বয়সে আমার চেয়ে অনেক বড়, তাঁদের ব্যবহারে এতটুকু অবজ্ঞা দেখতে পাই নি। আমার বাবা যে এইটুকু একটা মেয়েকে নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু করেছেন তাতেও কেউ তাচ্ছিল্যের ভাব দেখাচ্ছেন না তারা খুব খুশি তুষ্ট ও তৃপ্ত। তারা আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন যেন সহযাত্রীকে গাড়িতে তুলে নিলেন। ১৯৩০ সালের ১লা সেপ্টেম্বর আমি হঠাৎ কামিনী রায়, প্রিয়ংবদা দেবী, কান্তিচন্দ্র ঘোষ, জলধর সেন প্রভৃতির কটেম্পরারি হয়ে গেলাম।
উদয়শঙ্করকে নিয়ে তো আমরা মনে মনে মেতেছিলাম, বাবা তাকেও নিয়ে এলেন। তার সঙ্গে একটু একলা কথা বলবার ইচ্ছায় দোতলার বারান্দায় আলাদা করে ‘চা’ দিলাম। বাড়ি তখন লোকারণ্য। আমি গল্প করবার চেষ্টা করছি, মির্চা কোচাটি সামলিয়ে সেখানে এল, ওতো আমার চেয়েও ভক্ত, তা ও কথা বলুক না। আমি কি বারণ করেছি, ইচ্ছে করলে ওর নিচের ঘরেও নিয়ে যেতে পারে, একলা কথা বলতে যদি চায়, আমার কোন আপত্তি নেই। তা নয়, একপাক ঘুরে বিমর্ষমুখে চলে গেল।
সত্যি বলতে কি কাছ থেকে তাকে দেখে আমি একটু নিরাশ হলাম। কারণ কথা বলা তো আর তার শিল্পের মাধ্যম নয়, যে মানুষটিকে স্টেজের উপরে কখনো পর্বতচূড়া কখনো সমুদ্রের ঢেউ মনে হয়েছিল সে হঠাৎ মানুষ হয়ে গেল!
আমার আগে সকলে একসঙ্গে গাড়ি করে বেড়াতে যেতাম দূরে দূরে, বাবার চোখের অসুখের পর বাবা আর যেতে পারেন না—তাই আমরা অর্থাৎ আমি, সাবি, ছোট দুটি ভাই, শান্তি, মির্চা আমরা লেকে বেড়াতে যেতাম। তখন ঢাকুরিয়া লেক সবে কাটা হয়েছে বা হচ্ছে। বড় লেকটার সাজান গোছান শেষ হয়েছে, ওপাশের ছোট লেকটা কাটা হচ্ছে। তখন সেখানে এত জনসমাগম হত না। কলকাতাতে লোক এর এক চতুর্থাংশ ছিল কিনা সন্দেহ, সাদার্ন এভিন্যু দিয়ে হয়ত ঘণ্টায় দু-তিন খানার বেশী গাড়ি চলত না।
বেড়াতে যাবার সময় মির্চা রোজই ধুতি পাঞ্জাবী ও চটি পরে নিত, ও যেন বাড়িরই একজনবাড়ির অল্পবয়সীরা মোটামুটি সকলেই আমাদের ব্যাপারটা জানত—কেউ কিছু বলত না। শান্তি তো বরং বেশ সুযোগ করে দিত বাচ্চাদের নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরতে চলে গিয়ে।
জন্মদিনের উৎসব আয়োজনের মধ্যে ও একটু দূরে চলে গিয়েছিল, আবার আমাদের আগের মত ভাব হয়ে গেল। ক্রমেই এমন অবস্থা হচ্ছে যে আমরা একজন আর একজনকে ছেড়ে একটুও থাকতে পারি না। অথচ থাকতে হয়। তাই সর্বদা দুঃখ এবং সুখ পাশাপাশি মেশামেশি করে মনকে ব্যাকুল করে রাখে—ও বলছে কয়েক দিনের জন্য ও দেশে ঘুরে আসবে, তাহলেই বা কি হবে। ভবিষ্যতের চিন্তা করবার বয়স আমার নয়। আমাদের যে বিয়ে হবে না সেটা মোটামুটি আমি জানি। কিন্তু ওকে ছেড়ে থাকতে পারব না তাও জানি,
তবু এ দুয়ের মধ্যে যে সামঞ্জস্য করা দরকার তা আমার মনেও আসে না, চেষ্টাও করি না।
