রামানন্দবাবু কাছেই থাকতেন টাউনসেণ্ড রোডে। রোজ সকালবেলা তিনি প্রাতভ্রমণে বেরিয়ে লাঠি হাতে ধীরে ধীরে হেঁটে আমাদের বাড়ি আসতেন। আমাদের বাড়িতে সকালের চায়ের টেবিলে কিছুক্ষণের জন্য তার উপস্থিতি একেবারে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তিনি অবশ্য চা খেতেন না। খেতেন এক গ্লাস দুধ। যত দূর মনে পড়ে, ঐরকম সময়ই একটা ঘটনা নিয়ে তিনি খুব উত্তেজিত ছিলেন। একজন বিখ্যাত পণ্ডিত তার নিজের বইয়ের মধ্যে তাঁর ছাত্রের গবেষণার বিষয়টি অর্থাৎ ঐ ছাত্রের রচনা ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। এ কথা নিয়ে তখন দেশ জুড়ে তোলপাড় চলছিল। রামানন্দবাবু দুর্বল পক্ষের সহায় হয়েছিলেন, তাঁর মতে বেচারা ছাত্রটির হয়ে বলবার কেউ নেই—বাবার সঙ্গে এ বিষয়ে তার আলোচনা হত।
টাউনসেণ্ড রোড রামানন্দবাবুর বাড়িতে সেদিন দুপুরে কবি এসেছিলেন শেষের কবিতার পাণ্ডুলিপি নিয়ে। প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের সব রচনা চিরকাল প্রকাশিত হয় শুধু নয়, ঐ পত্রিকা তাকে ধারণ করে আছে সব রকমে। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় যেন বিরাট পক্ষ বিস্তার করে তাকে রক্ষা করছেন। পক্ষী মাতা যেমন করে তার শাবককে রক্ষা করে। উপমাটা অদ্ভুত শোনাচ্ছে। রামানন্দ কি করে রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করবেন, তিনি কি এর চেয়ে বড়? তা নয়। তবে রক্ষা করবার শক্তি তাঁর আছে—তাঁর হাতে ভারতের শ্রেষ্ঠ পত্রিকা, যে পত্রিকা শুধু সাহিত্যের জন্য নয়, নির্ভীক সাংবাদিকতা, সততা, সব কিছু নিয়ে বিশেষ সম্মানযোগ্য এবং প্রচারও যার সর্বাধিক। ওর চেয়ে বহুগুণে প্রচারসংখ্যা বেশি এমন তো কত পত্রিকা আজকাল আছে কিন্তু অত শ্রদ্ধার সঙ্গে কোনো পত্রিকার নাম আজ কেউ করবে না। তখনকার দিনে আরো যে দুটি বড় পত্রিকা ছিল বসুমতী’ ও ‘ভারতবর্ষ এ দুটোর কোনোটাতেই আমার যতদূর মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের একটি লেখাও প্রকাশিত হয়নি। কারণ রবীন্দ্রকাব্যের মেজাজের সঙ্গে এদের বিরোধ ছিল। রবীন্দ্রনাথের বিরোধী পত্রিকার সংখ্যাও কম নয়। হয়ত তারাই সংখ্যাগুরু, নিন্দমুখর এই দেশের ঈর্ষাজর্জর ছোটবড় প্রত্যেকটি লোকের সঙ্গে অবিশ্রান্তভাবে লড়াই করেছেন রামানন্দ। তার তীক্ষ্ণ নিপুণ পরিহাস-উজ্জ্বল ‘বিবিধ প্রসঙ্গ’-এ রবীন্দ্রনাথের সমস্ত কাজের সমর্থন ও বিপক্ষের প্রতি যুক্তিশানিত বিদ্রুপবাণ নিক্ষিপ্ত হয়েছে। যদি কেউ বলেন এর কি কোনো প্রয়োজন ছিল? তা ছিল। রামানন্দের সহায়তা না পেলে নিন্দার কুশাঙ্কুরে রবীন্দ্রনাথের কোমল মন ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত।
আমি রামানন্দের সঙ্গে এক বিশেষ আত্মিক যোগ অনুভব করতাম। উনিও কবিকে আমারই মতন ভালোবাসেন। অতএব রামানন্দেরও নিশ্চয় কখনো কখনো ঈর্ষা করবারও অধিকার ছিল। কাজেই যখন ‘বিচিত্রা’ পত্রিকা আধুনিক সজ্জায় অলঙ্কৃত হয়ে, রবীন্দ্রনাথের দুটি বৃহৎ রচনা ‘ঋতুরঙ্গ’ ও ‘তিন পুরুষ’-এ সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশ পেতে লাগল তখন তিনি যে একটু ক্ষুন্ন হবেন এ আর আশ্চর্য কি। তাই সেদিন রবীন্দ্রনাথ নিজের হাতে ‘শেষের কবিতা’র পাণ্ডুলিপি নিয়ে এসেছিলেন প্রবাসী সম্পাদকের মান ভাঙ্গাতে। ফলে আমারই লাভ হয়ে গেল—এরকম অপ্রত্যাশিত আবির্ভাবের চেয়ে আর কি সুখকর ঘটনা ঘটতে পারে?
আমার জন্মদিনের উৎসবে ঐ ‘বিচিত্রা’ পত্রিকা সম্পাদক উপেন গঙ্গোপাধ্যায়ও এসেছিলেন। তিনিও প্রায়ই আসতেন, ভারি মিষ্টভাষী মানুষ। রামানন্দবাবুর মত উপেন গঙ্গোপাধ্যায়ও বালিকার রচনা পকেটে করে নিয়ে যেতেন। আমাদের সে সময়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে এত ভীড় ঠেলাঠেলি ছিল না। সম্পাদকের পছন্দ হলেই লেখা প্রকাশিত হত এবং পছন্দটা নির্ভর করত লেখার উপরে, লেখকের ঠিকুজীকুষ্ঠির উপরে নয়।
সেদিন জন্মোৎসবে যারা যারা এসেছিলেন সকলের কথা লিখতে গেলে এ মহাভারত হয়ে যাবে। শ্রদ্ধেয়া কামিনী রায়ের তখন কবিখ্যাতি দেশজোড়া—তাছাড়া আরো একটা কারণে আমরা মেয়েরা তার প্রতি সমবেদনা অনুভব করতাম। আমরা শুনতাম জগদীশচন্দ্র বসুকে তিনি ভালোবাসতেন, জগদীশচন্দ্রও বাসতেন।
এদের বিবাহ ঠিক ছিল, হল না। শুনেছি এই বিরহের ফলশ্রুতি ‘আলোছায়া’ কবিতার বই। আর চিরকুমার পি. সি. রায় চিরকুমার রইলেন যাকে ভালোবেসে তিনিও এই কামিনী রায়। বিরাট পুরুষদের শ্রদ্ধা ও প্রীতি পাবার যোগ্য ছিলেন রমণীয়া কামিনী রায়।
সেদিন আমাদের বাড়িতে কামিনী রায়কে একজন নবীনা মহিলা কবি হঠাৎ বলে বসলেন যে তাঁরা পুরানো হয়ে গেছেন, এখনকার যুগে তাদের লেখা গ্রহণযোগ্য নয়। কামিনী রায় অন্তরের জ্যোতিতে জ্যোতিষ্মতী, ও অপমানে একটু বিচলিত হলেন না—স্নিগ্ধ মুখে চুপ করে রইলেন। আমার মার খুব খারাপ লেগেছিল এই দাম্ভিকতা। মা বললেন, “কামিনী রায় পুরনো হয়ে গেছেন, ইনি যেন আর কোনদিনও পুরনো হবেন না। পুরনো হলেই কি দাম কমে গেল নাকি! রবিবাবু যা বলেন, “নূতন গোফ গজালে যেমন বার বার আয়নায় মুখ দেখে, এরা তেমনি সর্বক্ষণ অদৃশ্য গোফে তা দিচ্ছে!” এই পুরনো হয়ে যাওয়া কথাটা আমারও কোনো দিন ভালো লাগে না…কি পুরনো হয়? মানুষ? না তার ভাব? সত্তার যে অংশ অমর সেইখানেই তো সাহিত্যের জন্ম। কাজেই একদিন যা ভালো ছিল, যদি সত্যিই ভালো হয়ে থাকে অন্য দিনে কি তা নষ্ট হয়? আর বিচারই বা করে কে? বিচারকও তো কোন অপরিবর্তনীয় মানদণ্ড হতে করে বসে নেই। শরৎচন্দ্রকে সেই আমি প্রথম দেখলাম…প্রথম ও শেষ কারণ তাকে আর আমি দেখি নি। যদিও তার প্রায় সমস্ত রচনাই আমি তখন সাগ্রহে গিলে ফেলেছি। “বিপ্রদাস আমাকে তার প্রতি বিমুখ করেছে। বিচিত্রাতে ‘বিপ্রদাস’ বেরুচ্ছে। আমি সেই অল্প বয়সেই ভেবেছি যিনি ‘পল্লীসমাজ’ লিখেছেন তিনি ‘বিপ্রদাস’ লিখছেন কেন? বিপ্রদাস যে খাওয়া ছোঁয়া নিয়ে হিন্দু কুসংস্কার মানছেন, লেখক তো তার সমর্থন করেছেন। বিপ্রদাস যদিও যোগাযোগের বিপ্রদাসের মত করেই কথা বলে তবু তার কথাগুলি নিরর্থক। যদি তা গোরার অনুরূপ হয়ও তবু গোরার লেখক গোরাকে দিয়ে গোড়ামীর সমর্থনে যত কথাই বলুন তিনি নিজে তো তা সমর্থন করেন না…গোরাকে সাহেব বানিয়ে তিনি সমস্ত হিন্দুয়ানী ও গোড়ামীর মূলোচ্ছেদ করেছেন। আর শরৎচন্দ্রের বিপ্রদাস, এর হাতে খাব না, ও ছুঁয়ে দিলে হবে না–ইত্যাদি করে কোন্ সত্যে উত্তীর্ণ হচ্ছেন? কিন্তু তাকে এ কথা জিজ্ঞাসা করার সাহস আমার সেদিন হয় নি।
