নিচের ঠোঁটের ঠিক মাঝখানে গোল ছোট্ট কালো একটা দাগ–স্পষ্ট এবং উগ্র। আমি তাকিয়ে আছি—ভয়ে আমার চোখ বিস্ফারিত—“কি হবে মির্চা, কি হবে?”
ও নির্বিকার মুখে একটা বই খুলে পাতা ওল্টাচ্ছে।
“মা তো বুঝতে পারবেন। পারবেন না? বল, বল মির্চা।”
“পারাই তো সম্ভব।”
“ও বাবা, তবে কি বলব মাকে, শিখিয়ে দাও!”
“তোমার মাকে তুমি কি বলবে আমি কি জানি!”
“তুমি এ রকম করলে কেন, এ্যা করলে কেন?”
নিরুপায় আমি ক্রন্দনের উপক্রম করলাম। ও একটা বই হাতে নিয়ে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আমার দিকে চেয়েই বললে—“যদি কান্নাকাটি কর তাহলে আর একটা দাগ করে দেব।”
আমি সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছি, আমার হাত পা কাঁপছে। ভয়, ভীষণ ভয়। মৃত্যুভয়ও বোধহয় এরকম হয় না। জানি না মৃত্যুভয় কি রকম কিন্তু সেই মুহূর্তে যদি ঈশ্বর আবির্ভূত হয়ে বলতেন, তুমি এখুনি মরে যেতে চাও, না দোতলায় তোমার মার সামনে যেতে চাও, তাহলে আমি প্রথমটাই সহস্রগুণে শ্রেয় মনে করতাম। কিন্তু তা হল না। ঈশ্বর কোথায় ছিলেন জানি না, তিনি ভয়ার্ত বালিকার ডাক শুনতে পেলেন না। কিছুক্ষণ পরই মার। সামনে পড়লাম। মা তো আমায় দেখে চমকে উঠলেন। তারপর আমার দিকে স্থির তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “রু, তোমার ঠোঁটের উপর ঐ বিশ্রী দাগটা কি করে হল?”
“কোথায় দাগ?” গলা অত্যন্ত সহজ এবং নিরুত্তাপ।
“আয়নায় দেখ না–”
“ও বুঝেছি, দরজায় ধাক্কা লেগেছে।”
“কোন্ দরজায়! ওঃ কি জানি…হয়ত…হয়ত—লাইব্রেরীর দরজায়।–”
“হয়ত লাইব্রেরীর দরজায়! অতটা ব্যথা পেলে আর জানো না কোথায় ধাক্কা লাগল। রু, সত্যি কথা বল।”
“না, না, ব্যথা তো লাগে নি। ওঃ মনে পড়েছে, আমি নিজেই দাত দিয়ে চেপে ফেলেছি।”
“তাই বল। দরজার ধাক্কায় কখনো ও রকম হয়। যাও একটু ক্রিম লাগিয়ে ওটা ঢেকে রাখ।”
সরল ভালোমানুষ বিশ্বাসপরায়ণ মা নিশ্চিন্ত মনে বিশ্বাস করতে পেরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
আমার জন্মদিন এগিয়ে আসছে। উৎসবের আয়োজনে বাড়ি মুখর। উৎসব হবে প্রাচীন ভারতে যেভাবে জন্মতিথি পালন হত সেই নিয়ম অনুসারে। সমস্ত সাহিত্যিকরা আসবেন। বয়োবৃদ্ধ জলধর সেন সাদা পায়রা উড়িয়ে দেবেন—পায়রা উড়বে, বদ্ধ জীব মুক্ত হবে। উৎসবের আয়োজন চলছে। এদিকে সাবির অসুখ বাড়ছে। আবোল-তাবোল কথা বলে, ওর অশান্ত মনের পক্ষে সেগুলো হয়ত আবোল-তাবোল নয় কিন্তু সে কথা মেলাচ্ছে কে? অভিভাবকরা নিজেদের খুশিমতো কাজ করেন, ছেলেমেয়েদের মনের খবরও যে রাখতে হবে, সে দিকে খেয়ালই নেই তাদের। তারা মনে করেন, যেমনটি হওয়া উচিত অর্থাৎ যা হলে সব নিরুপদ্রব হয় তেমনটি আপনিই হয়ে যাবে। সাবি এত অসুস্থ তা সত্ত্বেও উৎসবের আয়োজন পুরোদমে চলছে। ওর প্রতি অবহেলা হচ্ছে নিশ্চয়ই তাই ও অধীর কিন্তু অধৈর্য ও আপত্তি আর কি করে প্রকাশ করে বেচারা! এই রোগের মূল বীজাণু একটি ছোট্ট তীক্ষ্ণমুখ বিষাক্ত আশঙ্কা, ‘দিদিকে সবাই ভালোবাসে আমাকে কেউ বাসে না।
আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও মৃদু গুঞ্জন, নরেনবাবু মেয়েকে নিয়ে বড় বাড়াবাড়ি শুরু করেছেন। এতে ওর মাথা ঘুরে যাবে। আমার বন্ধুরাও আশঙ্কিত যে আমি তাদের থেকে যেন পৃথক হয়ে যাচ্ছি। এমন কি মির্চাও, যে ধরেই নিয়েছে আমার মা-বাবা ওর সঙ্গে আমার বিয়ে দেবার জন্য উৎসুক এবং সময়মতো ওরাই ওকে বলবেন, সেও আমাকে সেদিন হঠাৎ বললে, যদি তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে নাও হয় আমি তোমায় তিনবার দেখতে চাই। একবার তুমি মা হবার পর, একবার যখন তুমি খুব বৃদ্ধা আর একবার তোমার মৃত্যুশয্যায়। খুবই রাগ হয়েছে আমার একথা শুনে। আমি জানি এটা কবিত্ব করে বলা, আমিও তো অনেক কবিত্ব করে কথা বলি, শব্দার্থেই যার অর্থ নেই। কিন্তু এর মর্মার্থই বা কি? বুদ্ধদেব যে রকম জরা মৃত্যু দেখেছিলেন উনিও সেই রকম দেখবেন। মজা মন্দ নয়।
জন্মদিনের দিন বাংলাদেশের সমস্ত খ্যাতনামা সাহিত্যিকরা এসেছিলেন। শুধু রবীন্দ্রনাথ আসেন নি, কেন আসেন নি তা আমার মনে নেই—সম্ভবতঃ এখানে ছিলেন না। কিন্তু তিনি আমাদের বাড়িতে যে কখনো আসেন নি, তা নয়। বেশ কয়েকবার এসেছেন, এই বাড়িতেই এসেছিলেন কিছুদিন আগে, হঠাৎ একটা দুপুরবেলায় খবর না দিয়ে। আমি তখন উঠোনের সিঁড়িতে বসে উচ্চৈঃস্বরে কবিতা আবৃত্তি করছি, দুঃখের বিষয় সেটা রবীন্দ্রনাথের কবিতা নয়—সম্ভবতঃ অচিন্ত্য সেনগুপ্তের ‘অমাবস্যা বলে একটা কবিতার বই বেরিয়েছিল তাই থেকে বলছি, এমন সময় একজন লোক গলির দিকের আধখানা দোলান দরজা ফাক করে বললে “রবিবাবু এসেছেন?” তখন তাকে সবাই রবিবাবু বলত, যদিও আমি এ বইতে তাকে সে নামে উল্লেখ করি নি—আমি কিয়ৎক্ষণ তার কথাটাই বুঝতে পারি নি। এত অপ্রত্যাশিত এ ঘটনা। তারপর সামলে নিয়ে দরজা খুলে দেখি মির্চার ঘরের সামনে গলির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন—“নিরঞ্জন আনন্দ মূরতি সোজা দীর্ঘদেহ, চশমা থেকে কালো ফিতে ঝুলছে, ঐ চশমার নাম প্যানে-কানের উপর উঁটি নেই। কেঁাচান ধুতি মাটি ছুঁয়ে আছে। এ যেন স্বর্গ থেকে সহসা কোনো দেবতা আমাদের এই বাড়ির মাঝখানে আবির্ভূত হয়েছেন। আমার অবস্থা দেখে তিনি হেসে বললেন, “বিশু ডাকাতের মতো খবর দিয়ে আসা উচিত ছিল নাকি?” আমি ভাবছি ভাগ্যিস আমরা সব বাড়ি আছি। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে উনি বললেন—“এসেছিলুম রামানন্দবাবুর বাড়িতে, উনি বললেন তোমরা কাছেই থাক তাই ভাবলুম, তোমায় একবার দেখে যাই। তারই লোক পথ দেখিয়ে এনেছে।”
