মা হাসছিলেন—“না এটা অত্যুক্তি নয়–”
“অতুক্তি নয়!”
“কি করে বোঝাই তোকে—যা কিছুতে শেষ হতে চায় না, যে আনন্দ বা বেদনা ফুরায় —যাকে সময় দিয়ে মাপা যায় না, এ হচ্ছে তারই বর্ণনা।” আমি ঠিক বুঝতে পারলাম। অনেক ভাবতে লাগলাম-রবীন্দ্রনাথের গানে বা কবিতায় ঠিক এই কথাটা কোথায় আছে তা আমার মনে পড়ল না। লাখ লাখ যুগ অর্থাৎ অনন্তকাল। যে সুখ কোনো দিন তৃপ্ত হয় না তা ভালো কি মন্দ কে জানে? এই চির অতৃপ্তির কথাটা ভেবে আমার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল–
সাবির অসুখ খুব বেড়েছে। কবিরাজকাকা ওর চিকিৎসা করছেন। ও নানা রকম অদ্ভুত কথা বলে। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখিয়ে কি সব বিড়বিড় করেছে। আর ভজন গান করছে। আর মির্চাকে এক মুহূর্ত ছাড়বে না। তাকে ওর বিছানার পাশে বসে থাকতে হবে। ওর হাত ধরে থাকতে হবে। মাথা ঠাণ্ডা করার জন্য ওর মাথায় তেল লাগানো হচ্ছে চুল, মাঝখান থেকে কেটে ফেলে সে তেলও মির্চাকে লাগিয়ে দিতে হবে। ভালোই হয়েছে। কারণ এজন্য মির্চা অনেক সময়ে ওপরে আমার ঘরে থাকছে, ঐ ঘরেই তো সাবির বোগশয্যা। ঘরে অনেক লোকজন ঘোরাফেরা করে, সাবির কাছে বসে থাকে। যদি আমার অসুখ করত তাহলে পারত না। সাবি কিনা ছোট তাই এটা সহজ। কিন্তু এতে আমার মন কানায় কানায় ভরে গেছে— ও যে এত আপন হয়ে গেছে, আমাদের আত্মীয়ের মত—এতে একটা অদ্ভুত সুখ পাই আমি! একদিনের কথা আমার মনে আছে, কবিরাজকাকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মাকে ওষুধের বিষয় বিস্তারিত বলছেন মির্চা সাবির কথা শুনছে—আমি বেশ অনেকটা দূরে আমার খাটের কাছে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ ও একবার আমার দিকে চেয়ে একটু হাসল—আর সেই মুহূর্তে ঠিক সেই মুহূর্তে আমার সমস্ত শরীরে একটা অদ্ভুত অনুভূতির ঢেউ খেলে গেল। আমার মেরুদণ্ড ঝিঝিন্ করতে লাগল, আমি খাটের উপর বসে পড়লাম। আমি তো জ্যেষ্ঠতাত’ তাই সব বিষয় বিশ্লেষণ করা আমার স্বভাব। এই অদ্ভুত অনুভূতিটা আমাকে প্রশ্নে প্রশ্নে ভরিয়ে ফেলল—এটা হল কি? এটা হলই বা কি করে? এটা তো শরীরের ব্যাপার, সম্পূর্ণ শরীরের ব্যাপার, কোনো সন্দেহ নেই—আত্মা-টাত্মা কিছু নেই এর মধ্যে কিন্তু সেই শরীরও তো স্পর্শিত নয়। শুধু দৃষ্টিপাতমাত্র এরকম কি হতে পারে? কাকেই বা জিজ্ঞাসা করা যায়? ওকে জিজ্ঞাসা করা ঠিক হবে না, বেড়ে উঠবে, তাছাড়া ও জানবেই বা কি করে? ও তো ডাক্তার নয়। শরীরের ব্যাপার ডাক্তার কবিরাজরাই জানতে পারে, তবে তাদের তো আর জিজ্ঞাসা করা যায় না! ধর, যদি কবিরাজকাকাকে জিজ্ঞাসা করি, কাকা মির্চাকে দেখলে এ রকম লাগে কেন মাঝে মাঝে তাহলে কি হয়? হাঃ হাঃ হাঃ—তাহলে আর একটা খাটে শুইয়ে মাথায় মধ্যমনারায়ণ তেল দেওয়া হয়। নয়ত সোজা বহরমপুর পাগলের ফাটক।
আমরা ছাদে বসে কিম্বা বারান্দায় বসে প্রায়ই ছোট ছোট নাটিকাগুলি পড়ি ও আবৃত্তি করি। আমরা পড়ি অর্থ, আমি পড়ি, অন্যের। শোনে। ছোট নাটিকা অর্থাৎ ‘গান্ধারীর আবেদন’, ‘কর্ণকুন্তী-সংবাদ’ বা ‘বিদায়-অভিশাপ। বিদায়-অভিশাপটা আমার ভালো লাগে বেশি, কিজানি কেন? এই সভায় থাকে মীলু, গোপাল, খোকা, কাকীমা। শান্তিও থাকে, তবে সে এ সব বেশি বোঝে না। মির্চাও বোঝে না, তবু সেও মাঝে মাঝে থাকে। ছাদে বসতে সকলেরই ভালো লাগে, এটুকুই প্রকৃতিকে পাই আমরা। পড়তে পড়তে অন্ধকার হয়ে আসে, আকাশে তারাগুলো একে একে ফুটে ওঠে, তারপর গুটিগুটি একদিক থেকে অন্য দিকে চলতে থাকে। বাতাস ঠাণ্ডা হয়ে আসে। পাশের বাড়ির কামিনীর ঝাড়টা থেকে সুগন্ধ পাওয়া যায়। অন্ধকার হয়ে গেলেও আমার থামবার দরকার নেই, আমার তো মুখস্থ। একদিন গোপাল আমায় বললে, “তুমি এতবার করে বিদায় অভিশাপ’ পড়ছ—ভাগ্যে না ঐ রকমই ঘটে যায়।”
“অর্থাৎ? আমি ভ্রূকুটি করলাম।”
“যা হয় অর্থ বুঝে নাও।”
“তোমার ভারি আস্পর্ধা হয়েছে—যা খুশি আমায় বলতে শুরু করেছ।”
“রাগ করলে আমি নাচার। আমি তোমায় সাবধান করছিলাম রু।”
এই উপমাটা আমি আরও দু-একবার আত্মীয়স্বজনের মুখে আভাসে শুনেছি। আমার রাগ হয়েছে, ভয় হয় নি। ভয় হবে কেন? ওটা তো কাব্য এটা তো জীবন। দুটো দুই জগতের ব্যাপার। মির্চা কখনো কচের মত করবে না। দেবযানীকে কচ স্বর্গে নিয়েই বা গেল না কেন? নিতে ঠিকই পারত, শুধু তাতে গল্প হত না।
একদিন মির্চা আমায় বললে, “তোমাদের দেশে নতুন বিবাহিতাদের জীবন কেমন আমার জানতে ইচ্ছে করে।”
“বুঝতে পারলাম না–”
“এই যেমন তোমার কাকা ও তার পত্নী, তাদের মধ্যে তো কোন উচ্ছ্বাস দেখতে পাইনা।”
“তাদের উচ্ছ্বাস তোমাকে দেখাতে যাবে কেন?”
“আমাদের দেশে দেখা যায়—তাছাড়া আমি তো তোমার কাকীমার মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি।”
“সে সি!” আমার খুব রাগ হয়েছে, “কাকীমার মুখের দিকে তোমার দেখবার দরকার কি! খুব বিশ্রী কথা।”
“না, না, সে কথা নয়—ওদের নতুন বিয়ে হয়েছে, কিন্তু মুখে তো কোনো দাগ দেখতে পাই না।”
আমি তো অবাক–“বিয়ে হওয়া তো আর জলবসন্ত হওয়া নয়, মুখে দাগ হবে কেন?”
ও হাসছে। মুখ টিপে টিপে হাসছে—
“আমাদের দেশে হয়। কি রকম দাগ হয় তুমি দেখতে চাও?”
“হ্যাঁ—”।
ও দু হাত বাড়িয়ে আমায় ধরল। আমার মুখের উপর উষ্ণ চাপ অনুভব করলাম— তীক্ষ এবং মধুর-একটু পরে ও আমায় ছেড়ে দিল, “আয়নায় দেখ–”
আমি উঠে দেওয়ালে টাঙান ওর আয়নাটায় মুখ দেখে চমকে উঠলাম।
