১৯২৬ কিংবা ১৯২৮ সালে শিলং গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেখানে মণিপুরী লোকনৃত্য দেখে রবীন্দ্রনাথই প্রথম রঙ্গমঞ্চে দর্শকদের সামনে ভদ্রঘরের ছেলেমেয়েদের নৃত্য প্রবর্তন করলেন। দর্শকেরা টিকিট করে সে নাচ দেখতে গেল। বাঙালীর ঘরের মেয়ে সহস্র লোকের চোখের সামনে অঙ্গসঞ্চালন করবে একথা চিন্তা করে অনেকেরই রাত্রির নিদ্রা চলে গিয়েছিল। এ একরকম বিদ্রোহ-ঘোষণা। হয়ত রাজনৈতিক বিপ্লবের চেয়েও কঠিনতর। রবীন্দ্রনাথকে তাই সাবধানে চলতে হয়েছিল। প্রথম যে নাটকে এই নৃত্যযোজনা হল সে ‘নটীর পূজা’—কথা ও কাহিনীর ‘শ্রীমতী’ কবিতাটিকেই ঐ নাটকে রূপান্তরিত করা হয়েছে। নটীর পূজা অর্থাৎ নৃত্যটাও নৃত্যশিল্পীর পক্ষে পূজাই এই বিশেষ ব্যঞ্জনার দ্বারা নটীর কলঙ্কমোচন করা হয়েছিল খুব সূক্ষ্মভাবে। যে গানটির সঙ্গে নৃত্য করলে ‘শ্রীমতী’ নামে সে দাসী’ সে হচ্ছে, ‘আমায় ক্ষম হে ক্ষম’…নর্তকী ভগবান বুদ্ধকে বলছে ‘তোমার বন্দনা মোর ভঙ্গীতে আজ সঙ্গীতে বিরাজে’ কিংবা আমার সব চেতনা সব বেদনা রচিল এ যে কি আরাধনা’… সেই আরাধনার ভাবমূর্তি দেখে নিন্দুকেরা কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। আমি ‘নটীর পূজা’ দেখি নি। কারণ নাচ দেখবার তখন আমার বয়স হয় নি। সেই একই কারণে উদয়শঙ্করের নাচ দেখতে সাবিকেও নেওয়া হল না। দিদি গেল বলেই ও দুঃখ পেল, কারণ ওরও তখন বড় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা হচ্ছে, ও যৌবনে প্রবেশ করছে।
বাবা কলেজ থেকে ফোন করে জানালেন একটিও সীট নেই, খালি বক্স আছে। বক্সের দাম অনেক বেশি, তাই মির্চাও কিছুটা দেবে, আমরা চারজন যাব। মা সেদিন রূপার পাতের চুমকি বসান ঈজিপশিয়ান চাদর পরেছিলেন, মাকে রানীর মত দেখাচ্ছিল। মির্চা ধুতি পাঞ্জাবী পরেছিল। কলকাতার সমগ্র বিদগ্ধসমাজ সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিল। কলকাতার এই বিদগ্ধসমাজের মধ্যে উচ্চমন্যতা রোগে ভোগেন ব্রাহ্মসমাজভুক্ত বিরাট এক গোষ্ঠী। সকলেই নয় অবশ্য, কিন্তু অনেকে। তারা আমাদের কোনোদিনই যথেষ্ট সভ্য বলে মনে করেন না—আমরা ক’পুরুষই বা কলকাতার এই উচ্চসমাজে মিশছি, তাছাড়া আমরা তো হিন্দু। খুব পরিচিত হলেও তাঁরা সব সময়ে আমাদের চিনতে পারেন না। এই শ্রেণীভুক্ত বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট এলিট সেদিন তাদের স্বাভাবিক তাচ্ছিল্যভাব তো কাটিয়ে ফেললেনই, দলে দলে আমাদের বক্সের নিচে এসে দাঁড়িয়ে, ডেকে ডেকে গল্প করতে লাগলেন। বাবার ভঙ্গীও কম দৃপ্ত নয়, পরমাসুন্দরী পত্নী, যথেষ্ট সুন্দরী (মির্চা যাই বলুক) কবিকন্যা ও বিদেশী ছাত্র এবং বক্স—সব নিয়ে যা কাণ্ডটা হয়েছিল তাতে ব্রাহ্ম-ব্রাহ্মিকাদের দর্প চূর্ণ-বিচূর্ণ।
উদয়শঙ্কর সেদিন অদ্ভুত নাচ দেখালেন—আমার মনে আছে তার ছায়াটা আমাকে যেন এক অলৌকিক জগতে নিয়ে গিয়েছিল তাঁর স্পন্দিত বাহু যেন জলের ঢেউ–সমস্ত শরীর তরল। পার্বতীরূপিনী সিমকী মনোহারিণী হলেও উদয়শঙ্কর যেন দেবলোক থেকে নেমে এসেছেন—মানুষের দেহের এমন ছন্দিত রূপ আমি তো দেখিই নি, সেদিন ওখানে উপস্থিত আর কেউ দেখেছেন কিনা সন্দেহ। মির্চার অবস্থা সুদাস মালীর মত-মুখে আর বাক্য নাহি সরে, ওর হাতে যদি সুদাসের মত পদ্ম থাকত তাহলে ও তখনি ‘পদ্মটি রাখিত ধরে’ উদয়শঙ্করের ‘চরণপদ্ম পরে’। সারারাত সে. পিয়ানো বাজাল, ঘুমাতে পারল না—আমাকেও ঘুমাতে দিল না, আমার ঘর ঠিক ওর ঘরের উপরেই। এর পর বহু দেশে বহুসময়ে নাচ দেখেছি কিন্তু সেদিনের অনুভূতি আর কখনো হয় নি। আমাদের দুজনেরই মন ছিল অনুকূল—সৃষ্টির বেদনা তাই তারা সমস্ত সত্তা দিয়ে অনুভব করেছিল। বেশ কয়েকদিন পর্যন্ত আমাদের আর কোনো কথা ছিল না! মির্চা বলতে লাগল—“This is India! This is India!”
আমায় যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে ও আমাদের বাড়িতে কতদিন ছিল, ক’দিন ক’মাস বা ক’বছর—আমি বলতে পারব না। আমার এই ষাট বছরের জীবনে সবসুদ্ধ জাগতিক হিসাবে হয়ত ছয় সাত বছর আমি সত্যকারের বেঁচে আছি বাদ বাকি দিনগুলি পুনরাবৃত্তি মাত্র। মির্চার সঙ্গের দিনগুলি তার মধ্যে যদি এক বছর হয়ে থাকে তবে তা তিনশ’ পঁয়ষট্টি দিন মাত্র নয়, তার পরিমাপ করার কোনো যন্ত্রই আমার হাতে নেই। পৃথিবীর আবর্তনে তা ঘুরছে না, তা সূর্যের মত স্থির আছে। আমি তার মধ্যে এতদিন প্রবেশ করি নি, এখন করছি—যখন ইচ্ছা করছি প্রবেশ করছি সেই সময়ে, সেই আনন্দে, সেই বেদনায়। সেখানে আমি কাকে পাচ্ছি? শুধু কি ও আর আমি? তার মধ্যে সবাই আছে, শান্তি আছে, থোকা আছে, ঐ গোপাল আছে যে ওর দিকে ঈর্ষাভরে চায়, কারণ সে আমায় খুব ভালোবাসে। তারা সবাই উপস্থিত। আছে ঐ লাইব্রেরীর বইগুলো, এমন কি ক্যাটালগ করার বাক্স পর্যন্ত। আমার সত্তার চৈতন্যে মিশে সেই কালটি তার সমস্ত রূপসম্ভার নিয়ে অব্যয়।
১.৫ আমার মা
আমার মা বরাবর বৈষ্ণবসাহিত্য পড়তে ভালোবাসেন, এ বিষয়ে তিনি যথেষ্ট বিদূষী। বৈষ্ণবসাহিত্য পড়বার জন্য তিনি ওড়িয়াভাষাও শিখেছেন। কাকা যখন এম এ পরীক্ষা দেন তখন মা তার সঙ্গে বাংলায় এম, এর বই সব পড়েছেন। চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য এসব মার আয়ত্ত। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতি। আমি মাকে একদিন জিজ্ঞাসা করলাম—“এই লাইনটার অর্থ কি—“জনম অবধি হাম রূপ নেহারিনু, নয়ন না তিরপতি ভেল, লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়া রাখনু, তবু হিয়া জুড়ন না গেল’—এই কবিতাটির বক্তব্য কি? এ তো সত্যিই লাখ লাখ যুগ হতে পারে না, কারণ অতদিন কেউই বঁচে না। তাহলে এটা অত্যুক্তি—অত্যুক্তি কি কাব্যবিচারে দোষ নয়? তাহলে তোমরা এটা এত ভালো বল কেন?”
