আমরা নীচের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি—আমি রেলিঙে ঠেশ দিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে। পিছনে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুলে ভরা মাধবীলতাটা দুলছে, মাঝে মাঝে আমার মাথায়, গালে ছুঁয়ে যাচ্ছে। ও আমার সামনে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে, হঠাৎ আস্তে আস্তে বললে, “তোমাকে দেখতে মন্দিরের গায়ে মূর্তির মত।”
এই প্রথম ও আমার চেহারা সম্বন্ধে একটা প্রশংসার কথা বলল। তা এটা প্রশংসা কিনা তাই-ই জানি না। মূর্তির মত দেখতে হওয়া ভালো কি খারাপ কে জানে! আমি আরো অনেক মিষ্টি মিষ্টি রূপ বর্ণনা শুনতে চাই, কিন্তু অন্য লোকেরা যা এত বলে ও তা বলে না। ওদের দেশে বোধ হয় রূপ বর্ণনা করতেই জানে না আমাদের মত–
“তিল ফুল জিনি নাসা, সুধার সদৃশ ভাষা
মৃগপতি জিনি মধ্যদেশ
রাম রম্ভা জিনি উরু কামধনু নিন্দি ভুরু
মেঘসম ঘন কালো কেশ।”
তা নয়, মূর্তির মত দেখতে! যা কিছু হল না।
কিছুদিন থেকে আমার বই ছাপা হচ্ছে, কবিতার বই, বাবা অনেক আশা করে বইয়ের নাম দিয়েছেন ‘ভাসিতা। বইটা প্রেসে যাবার আগে বেশির ভাগ মীলু কপি করেছে। মীলুর বানান সম্বন্ধে ধারণা বেশ নূতন রকম। “এ কি? যদি-তে ‘দ’-এ ঈকার দিয়েছিস কেন?”
“কি হয়েছে তাতে? নদীর পাশে তো ভালই দেখাচ্ছে।”
যত্ব-ত্বর তো কথাই নেই। আমারও যে বানান নির্ভুল তা নয়। বিশেষ ভুল বানানের সম্মুখীন হলে আমি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে যাই। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় দেশবিশ্রুত সম্পাদক বলতেন, একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়া তিনি আর কোনো কবি দেখেন নি যার বানান সম্পূর্ণ নির্ভুল।
প্রুফ দেখতে শিখে আমি রীতিমত বড় হয়ে গেছি। গম্ভীরভাবে প্রুফসংশোধন করতে করতে নিজেকে বেশ উন্নত মনে হয়। কিন্তু বানানের জন্য আমি ডিকশনারী দেখি না। আমি ‘চয়নিকা’, ‘বলাকা’ বা ‘মহুয়া’ থেকে বানানটা দেখে নিই—অর্থাৎ কোন শব্দটা কোন কবিতায় কোন পাতায় রয়েছে এটা বের করে নেওয়া আমার পক্ষে সহজ এবং আনন্দজনক। সেই সময়ে যদি রবীন্দ্রনাথের কবিতার উপর কনকরডেন্স করতে দেওয়া হত আমি বোধ হয় পারতাম।
বাবা ঠিক করেছেন আমার জন্মদিনের দিন ‘ভাসিতা’ উদ্ভাসিত হবে, সেই দিনের জন্মোৎসবে বাংলাদেশের সমস্ত কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীদের নিমন্ত্রণ করবেন, একটা বিরাট আয়োজন করবেন। এ যেন বিলেতে যেমন মেয়ে বড় হলে তাকে রাজসভায় পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় তেমনি নূতন করিকে বিদ্বৎসমাজে পরিচয় করিয়ে দেবেন। এই যে একটা আয়োজন চলেছে আমাকে কেন্দ্র করে, বাবা মা দুজনেই তাদের প্রথমা কন্যাকে নিয়ে মেতে আছেন, এতে অন্যরা অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে। অবশ্য ভাই দুটি তো ছোট, কিন্তু সাবি? সে তো ছোট নয়। সে অনাদৃত বোধ করছে এবং ঠোঁট ফোলাচ্ছে। তার শরীরও খারাপ হয়েছে, মনও। এই মনের অসুখটা আরো বেড়ে গেল যেদিন তাকে ফেলে আমরা উদয়শঙ্করের নাচ দেখতে গেলাম।
বেশ কিছুদিন আগে অ্যানা প্যাবলোভা এসেছিলেন কলকাতায়। মা আর বাবা তার নাচ দেখতে গিয়েছিলেন। প্যাবলোভার নৃত্য নিয়ে কলকাতার ‘এলিটরা মুখর হয়ে উঠেছিল। মা জীবনে সেই প্রথম এরকম নাচ দেখলেন। আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়নি কারণ আমি তখনও যথেষ্ট বড় নয়। এ সম্বন্ধে মা যখন অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করেন তখন আমি শুনেছি। নৃত্য সম্বন্ধে মা বিশেষজ্ঞ নন মোটেই। কিন্তু তাঁর শিল্পরুচি ও সৌন্দর্যবোধ বাবার চেয়ে অনেক বেশি। তাই মরালীর মৃত্যুর নৃত্যটি তাকে অভিভূত করেছিল। বেশ অনেকদিন পর্যন্ত একটা আবেশ লেগেছিল তার মনে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দ্বিধাও ছিল কম নয়। প্যাবলোভা তো মরালীনৃত্য করার সময় আপাদলম্বিত গাউন পরে ছিলেন না। তার পরনে কাপড়চোপড় মার চোখে ছিল না বললেই হয়। তাঁর ঊরু অনাবৃত ছিল, ঘাগরাও ঘুরছিল নিম্নাঙ্গের অনেকখানিই অনাবৃত করে। মার মতে এটা শিল্পের প্রয়োজনে মেনে নিলেও সমাজের পক্ষে তো ক্ষতিকর বটেই। নিউ এম্পায়ার থেকে বেরিয়ে আসবার সময় দূরে তার বোনপো তাকে দেখে সুরুৎ করে পালিয়ে গেল। বোনপোর বয়স কিছু কম নয়, এম, এ. পড়ে। কিন্তু তাকে ওখানে দেখে মা খুব চিন্তিত। দেবুও এ নাচ দেখল। আর দেবুও কম চিন্তিত নয় যে মাসী তাকে এমন একটা ‘নিষিদ্ধ’ জায়গায় দেখে ফেললেন।
যা হোক উনিশ’শ ত্রিশ সালে উদয়শঙ্কর কলকাতায় এলেন নিউ এম্পায়ার-এ নাচ দেখাতে। প্যাবলোভার শিষ্য, ভারতীয় নৃত্য দেখাবেন। এ দেশের চোখ তখন নাচ দেখতে অভ্যস্ত নয়। কখনো সখনো বিশেষ সমাজের দু-একজন বিশেষ ব্যক্তি দুচারটে ‘ব্যালে’ দেখে থাকবেন। স্বদেশী নাচ দেখা যায় শুধু মন্দিরে। আমরা পুরীতে ও ভুবনেশ্বরের মন্দিরে দেবদাসীর নাচ দেখেছি। সে নাচ অসংস্কৃত। আর বাইজীরা কোথায় নাচে সে আমরা সভ্য সমাজের লোকেরা জানিই না। আমাদের ধারণা দুশ্চরিত্র জমিদারেরা বাগানবাড়িতে তাদের কোনো রহস্যলোক থেকে নাচাতে নিয়ে আসে! কোন বিদগ্ধ ব্যক্তি সে নাচ দেখবার জন্য ব্যগ্র নয়। আর নাচে উপজাতিরা। সাঁওতাল, মুণ্ডা, গোণ্ড, এরা নানা উৎসবে নাচে। আমি খোঁপায় জবা ফুল গোজা সাঁওতাল মেয়েদের নাচ দেখেছি। লোকনৃত্যের মধ্যে মণিপুরী, গরবা ইত্যাদি সেই দেশের পালাপার্বণে হয়ে থাকে। বৃহত্তর শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দুসমাজে কোনো রকম নাচের কথা আগে তো শুনি নি এক ব্রতচারী ছাড়া। আর শুনেছি ঠান্দিরা বাসরঘরে বরকে উত্যক্ত করার জন্য নাচে। ভদ্রলোকের ছেলে কিংবা মেয়ে স্টেজে নাচবে এ তো কল্পানাতীত ব্যাপার।
