শুধু এদেশে নয়, বিদেশেও বাবাকে অনেকেই মান্য করে, ভালোবাসে। সেবা উনি আদায় করতে জানেন। ওর অধ্যাপক ম্যাকটাগার্টের গল্প শুনেছি—অত বিরাট পণ্ডিত ব্যক্তি তার এই বিদেশী আহ্লাদে ছাত্রটির রীতিমত সেবা করতেন—ঘরে তার চেম্বার-পট পর্যন্ত রেখে যেতেন! এ কথাটা বাবা বেশ গর্বের সঙ্গেই বলতেন। তখনকার দিনের ছাত্র ও অধ্যাপকদের সম্পর্কের মাধুর্য তাদের সম্পর্কের মধ্যে ছিল। বাবা তার পক্ষে যতটা ভালোবাসা সম্ভব ভালোও বাসতেন অধ্যাপক ম্যাটাগার্টকে। দার্শনিক পণ্ডিত ম্যাকটাগার্টের একটা দুর্বলতা ছিল, তিনি খুব মদ্যপান করতেন। তাঁর একটা গল্প প্রায়ই বলতেন বাবা। কোনো বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেয়ে ফিরবেন, একটা মাঠ পেরিয়ে রাস্তায় পৌঁছতে হবে—বিরাট মাঠের মধ্যে কোথাও কিছু নেই, একটিমাত্র গাছ আছে। অধ্যাপক সোজা সেই গাছটির সামনে এসে দাঁড়ালেন কিন্তু সেটা কি করে পার হবেন ভেবে পেলেন না। তখন আবার বাড়িতে ফিরে গেলেন, ও আবার রওনা হয়ে ঠিক সেই অনতিক্রম্য গাছটির সামনে এসে পৌঁছলেন, এরকম অনেকবার করবার পর শ্রান্ত ক্লান্ত অধ্যাপক গাছতলাতে বসে পড়লেন—“I am lost in a dense forest.”
এই গল্পটা খুব উপভোগ্য ছিল। কিন্তু আমার মনে সব সময় একটা খটকা লেগে থাকত যে, বাবা যাকে এত শ্রদ্ধা করেন, এমন শ্রদ্ধনীয় বিদ্বান ব্যক্তি কি করে মদ্যপ হতে পারেন। মদ খাওয়া তো খারাপ, পাপই, তাহলে? আমরা কখনো একথা ভাবতে শিখি নি যে একজন মানুষের চরিত্রে দোষগুণ পাশাপাশি বাস করলেও সে শ্রদ্ধনীয় থাকতে পারে। সমাজের বিবিধ তিরস্কারে অভিভূত আমাদের দৃষ্টি মানুষের দুর্বলতা ও ত্রুটিবিচ্যুতিগুলিকে যথাযথ ‘পারসপেকটিভে’ দেখতে জানত না। যেমন আমার বাবার যে কোনো ত্রুটি থাকতে পারে, তা কখনো আমরা চিন্তাও করতে পারতাম না। তিনি সম্পূর্ণ দোষশূন্য দেবতাতুল্য—এই রকম একটা ধারণা গড়ে তোেলবার মূল হচ্ছেন মা। এর বিপদ কতখানি তা মা বুঝতেন না। শুধু আমার মা নয়, এই রকমই তখন রেওয়াজ ছিল। তারা মনে করতেন পিতামাতার, গুরুজনের কোনো বিচার করবার চেষ্টাই ক্ষতিকর। পিতা স্বর্গঃ, পিতা ধর্মঃ, পিতা হি পরমং তপঃ—সে যুগেই কোনো কোনো বাড়িতে এ মন্ত্রের প্রভাব শিথিল হচ্ছিল বটে, কিন্তু আমাদের বাড়িতে আমার পিতার অসামান্য প্রতিভার জন্যই তা হতে পারে নি। তবু সেই সময়ে আমার মনে একটু একটু সমালোচনার ভাব দেখা দিচ্ছিল, তার জন্য আমি লজ্জিত হলেও সেই ভাব সম্পূর্ণ দমন করতে পারছিলাম না। প্রথম আমার বাবার সঙ্গে মুখে মুখে উত্তর করবার স্পর্ধা হয়েছিল তার অসুখের সময়তেই–।
আমাদের বাড়িতে আমার ঠাকুমার আমল থেকে একটি মহিলা থাকতেন। আমার বাবার চেয়ে কিছু বড়—তাকে আমরা আত্মীয় বলেই জানতাম। আসলে তিনি পরিচারিকার কাজ করতেই এসেছিলেন কিন্তু ক্রমে বাড়ির লোকের মত হয়ে গিয়েছিলেন। তাকে আমরা অর্থাৎ ছেলেমেয়েরা সবাই খুব ভালোবাসতাম। তার খুব হাঁপানি হত, একজিমায় কষ্ট পেতেন। আমি দেখতাম, তার জন্য ডাক্তার ডাকা, ওষুধ আনায় বাবার একেবারে গরজ নেই-মা যতদূর পারেন চেষ্টা করেন কিন্তু টাকা তো বাবারই। একদিন দেখলাম, তিনি যন্ত্রণায় কাঁদছেন—আমি সোজা গিয়ে বাবাকে বললাম—“তোমার জন্য সব সময় এত ওষুধ আসছে, ডাক্তার আসছে, চাপাপিসির জন্য কেন আসবে না?” বাবা বিস্ময়বিমূঢ়—“আমার জন্য ডাক্তার আসছে, চাপার জন্য কেন আসছে না?” এত বিস্ময় ছিল তার প্রতিপ্রশ্নে যেন তিনি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না, তিনি আর ঐ দাসী এক হল আমার কাছে!’
আমি চুপ করে চলে গেলাম। আমার নিজেরই লজ্জা করতে লাগল। এমন একটা কথা আমি যে কি করে বলে ফেললাম। কিন্তু আমি জানি, আমার মনে ক্রমে ক্রমে বিদ্রোহ জমা হচ্ছে। বাবার মতের বিরুদ্ধে এতটুকু কাজ করবার আমাদের ক্ষমতা নেই। এই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ তার অনিচ্ছায় একেবারে কিছু করতে পারবে না। তাহলে আমার ইচ্ছার দাম কি? কিছু না, কিছু না। সম্রাট যেমন ইচ্ছে করলে কাউকে হাতীর পায়ের তলায় ফেলতে পারেন, করুর মুণ্ডচ্ছেদ করতে পারেন, উনি সেরকম শরীরে মেরে ফেলতে পারেন না বটে কিন্তু মনে মনের উপর তার অধিকার সম্পূর্ণ। উনি যদি আমাদের কথা জানতে পারেন, এই মুহূর্তে আকবর যা করেছিলেন তাই করবেন—শরীরে নয়, কিন্তু মনে, মনে, মনে। প্রেমের এই আনারকলির উপর পাথর গড়িয়ে ফেলবেন। কেউ বাধা দিতে পারবে না! আর রবিঠাকুর? তিনি যদি আমার পিতা হতেন, তিনিও কি এরকম করতেন? যিনি লিখেছেন—দোলে প্রেমের দোলনচাপা হৃদয় আকাশে’–তিনি কি সেই চাপার কলি থেতলে দিতে পারেন? কখনই না। বলব তাঁকে? কি হবে বলে, তার তো আমার উপর কোনো অধিকার নেই। তিনি তো আমার কেউ নয়। কেউই নয়! কেউই নয়! কি অদ্ভুত কথা।
একদিন ও আমাকে জিজ্ঞাসা করল—“তুমি কোনারকের মূর্তি দেখেছ?”
“আমি কোনারক যাইই নি। কেন?”
“আমি আগে ভাবতুম মানুষ ওরকম দেখতে হতে পারে না।”
আমি ভাবছি মনে মনে ও কোনারক যেতে পারে কারণ সেটা পোড়ো মন্দির—’পুণ্যলোভীর নাই হল ভীড় শূন্য তোমার অঙ্গনে জীর্ণ হে তুমি দীৰ্ণ দেবতালয়’—কিন্তু পুরীর মন্দিরে বা ভুবনেশ্বরের মন্দিরে ওকে ঢুকতে দেবে না। ও ম্লেচ্ছ। ওরা রবীন্দ্রনাথকেও পুরীর মন্দিরে ঢুকতে দেয় নি। কী দুর্ভাগা এই দেশ! তাই তো অমন একটা কবিতা লিখেছিলেন, যা অভিশাপের মত শোনায়।
