“মা, মা, দেখ দিদি ইউক্লিডদার সঙ্গে মারামারি করছে।” মা রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন—ও তৎক্ষণাৎ আমার পা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। মা স্তম্ভিত, চিত্রার্পিত। এমন একটা কাণ্ড ঐ শান্ত ছেলেটা করল?
“একি ইউক্লিড, কাচা লঙ্কা চিবিয়ে খাচ্ছ কেন?”
কাকীমা বললে, “ঐ রু কথা শোনে নি বলে?”
“রু কথা শোনে নি বলে! সে কি! সে কি!”
সেই প্রথম আমি মার চোখে সন্দেহের ছায়া দেখলাম। মা ওর দিকে এক চামচ মাখন এগিয়ে দিলেন। বাটিটা ওর হাতে দিয়ে বললেন, “মাখন খাও”। মির্চা বাটিটা নিয়ে মাথা নীচু করে ওর ঘরে চলে গেল।
মা এইবার খুবই রেগেছেন—“কখন খাওয়াদাওয়া হয়ে গেছে এখানে বসে বসে আড্ডা হচ্ছে কেন? তোমাদের কি কারু কোনো কাজ নেই?”
আমি খুব ভয় পেয়ে গেছি কিন্তু তৎক্ষণাৎ যেন কিছুই হয় নি এমন ভাব করে বললাম-“না মা আমি শুধু বলেছিলাম ঝাল খেতে সাহস লাগে। তাই বীরত্ব দেখাচ্ছিল, তাই না কাকীমা? আহাম্মক আর কাকে বলে? লঙ্কা কখনো শুধু শুধু খায়!”
আমার গলা নিরুত্তাপ—যেন কিছুই না। মা বিশ্বাস করে নিলেন, সন্দেহের মেঘ উড়ে গেল, কারণ মা উড়িয়ে দিতে চান, যাদের ভালোবাসেন তাদের সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ মনে স্থান দিতে চান না। অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হবার সাহস মা’র নেই। অর্থাৎ তখন ছিল না শুধু নয়, কোনও দিনও হয়নি। যখন তার আঁচল থেকে তার স্বামীকে খুলে নিয়ে যাচ্ছিল অন্য কেউ, তখন মা ভাবছিলেন ও কিছু নয়-দশ বছর ধরে সেই খোলার প্রক্রিয়া চলছিল। মা ভালোমত খেয়ালই করলেন না। যখন তাঁর সর্বনাশ হয়ে গেছে, তখন হঠাৎ চমকে উঠলেন। তার ধারণা, আমি বিশ্বাস করেছি বলেই কি আমাকে ঠকাতে হবে? বিশ্বাস করা কি অন্যায়। সেই সোল বছরের মেয়েটাও সেদিন মাকে ঠকিয়ে দিল। ভয়ে। অবশ্য অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমার বুক দুরদুর করেছে। বেশ চালাকী করতে পারি তো আমি! মির্চার জন্যই এরকম মিথ্যাবাদী হয়ে যাচ্ছি। মোটেই না, মোটেই না, দুষ্মন্ত কি বলেছেন–? “স্ত্রীণাম্ অশিক্ষিত পটুত্বম্–”
মা উপরে যাচ্ছেন—খাবার টেবিল থেকে সিঁড়িটা দেখা যায়—আমি ভাবছি মার মনে যদি একটুও সন্দেহ লেগে থাকে সেটা কাটিয়ে দিতে হবে। উঠে গিয়ে মার গলা জড়িয়ে শুয়ে থাকব।
“কাকীমা, আমি উপরে মার কাছে শুতে যাচ্ছি, তুমি একটু মির্চাকে দেখ না ভাই—ওর কি হল।”
কাকীমা চোখ মটকে বললে, “আমার বয়ে গেছে।”
মার কাছে শুয়ে শুয়ে আমি যা ভাবতে লাগলুম মা তো তা শুনতে পেলেন না—যত কাছেরই মানুষ তোক, যত ভালোবাসাই থাক একজন আর একজনকে কত সহজে ঠকিয়ে দিতে পারে। কারণ মুখে না বললে তো কেউ কারু মনের কথা বুঝতে পারে না। যদি পারত? তাহলে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ইত্যাদি মহামূল্যবান জিনিসগুলো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যেত।…মির্চা হঠাৎ এরকম একটা অদ্ভুত কাণ্ড করল কেন, আমি কিছুই ভেবে পেলাম না—শুধুই কি আমি ওর কথা শুনি নি বলে বা বীরত্ব দেখাবার জন্য, না অন্য কোনো কারণ আছে, ওর মনে এতটা আঘাত লাগল কেন? নাকি প্রতিশোধ নেবার জন্য? যে কারণেই হোক, আমি এরকম করতে পারতাম না।
নিজেকে এত কষ্ট দেওয়া যায়? অনেকে পারে। যেমন ঠাকুরমা মৃত্যুর মুখেও তৃষ্ণা সংবরণ করতে পারতেন—দু’দিন তিনদিন তিনি উপবাস করতে পারতেন, আমি কি পারি? কিন্তু তার তো কোন কারণ থাকত, কোনো ব্রতপালন বা ঐ জাতীয় কিছু। এরকম শুধু শুধু করতেন না! হয়তো ওরও কারণ ছিল, ও আমার জন্য কতটা সহ্য করতে পারে তার পরীক্ষা দিচ্ছিল। ওর আত্মনিপীড়নের ক্ষমতা দেখে আমার নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল। ও আমার চেয়ে অনেক শক্তি রাখে। আমি আর কখনো ওর সঙ্গে ওরকম করব না। এবার আমি বলব আমিও যে ওকে চাই সে কথা বলব। ও যে রকম করে বলছে সে রকম করে নয়, ওর খুব কাছে বসে ওর শঙ্খচিলের মত সাদা পায়ের উপর হাত রেখে বলব; পা রেখে নয়, পায় হাত দিলে কি হয়? ও তো আমার চেয়ে বড়ই। বয়সে, বিদ্যায় আর মনের জোরে অনেক বড়। আমি নিজেকে পরাজিত মনে করছিলাম—তাতে আমার কষ্ট নেই। আমি সুখী। আত্মপীড়নের শক্তি দেখিয়ে ও অনেক বড় হয়ে গেছে—দেহি পদপল্লবমুদার!
বাবার খুব ব্লাডপ্রেসার, তাই নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে কারণ তার চোখে রক্ত জমেছে এটা কঠিন অসুখ। কিন্তু কঠিন অসুখ হলেও বাবার একটু অসুখ হলেই তা কঠিন বলে মনে হয়। শুধু আমাদের নয় সব বাড়িতেই, বাড়ির কর্তা যে পুরুষ তিনিই পনের আনা, অন্য আর সকলে একত্র হয়ে এক আনা। অর্থাৎ তার সুখ-সুবিধে ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপরই সবকিছু নির্ভর করছে, অন্য লোকের সুখ-সুবিধা ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো দাম নেই। এ ভাবটা আমাদের বাড়িতে খুব বেশি, কারণ এখানে তো তিনি বাড়ির কর্তা মাত্র নয়—অধিষ্ঠাত্ দেবতা। কাজেই তার অসুখ হওয়া মানে, বাড়ির সকলের অসুখ হওয়া অর্থাৎ আর কারু অন্য চিন্তা নেইমার তো নেইই। মা রাতের পর রাত জাগতে পারেন হাসিমুখে—এই অতন্দ্র সেবা অবশ্য বাবা গ্রহণ করেন প্রাপ্য হিসাবে। এটা সব বাড়ির কর্তাদেরই মনোভাব। স্ত্রীর দিকে এই সেবার মূল্য তার দানের আনন্দে, তৃপ্তিতে, হয়ত বা পুণ্যে, স্বামীর দিক থেকে কৃতজ্ঞতার কোনো প্রয়োজনও নেই। সে কথা কেউ মনে করে না। অসুখ না হলেও বাড়িতে যেটা শ্রেষ্ঠ খাদ্য সেটা কর্তার জন্য। তাঁর নিদ্রার সময় সমস্ত বাড়ির নীরবতা, কিন্তু অন্যের নিদ্রার সময় তিনি চীৎকার করতে পারেন! সেটা কেউ অন্যায় মনে করে না। বাড়ির কর্তাদের এমনও দেখেছি, ট্রেনে কোথাও যাবার সময় ফার্স্ট ক্লাসে গেলেন, বুড়ো মা ছেলেমেয়েদের ইন্টারে তুলে দিয়ে। খুব ভালো লোকেরাও এরকম করতেন, এতে কেউ তাদের নিন্দা করত না বা তাদের আত্মগ্লানি হত না। বাড়ির কর্তা অর্থাৎ যার রোজগারে বাড়ির অন্য সকলে প্রতিপালিত, তার অপ্রতিহত অধিকার অন্যের সুখ-দুঃখ ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে দলিত পিষ্ট করে সকলকে নিজের মতে চালনা করবার। এতে একটা বৃহৎ পরিবারের শৃঙ্খলা রক্ষা করবার হয়ত সুবিধা হয়, কিন্তু ঐ কর্তা ব্যক্তিটি একান্ত স্বার্থপর ও দাম্ভিক হয়ে ওঠবার সুযোগ পান। তার নিজের ধারণা জন্মায় যে এই বাড়িতে তিনি একজন ঈশ্বর। অথচ তিনি তো ঈশ্বর নন, ঐ বাড়ির দুঃস্থতম তুচ্ছতম আত্মীয়টির মতই তিনিও একজন ভুলভ্রান্তিযুক্ত সুখদুঃখকাতর সাধারণ মানুষ। একটি দেশের পক্ষে রাজা যেমন সে দেশের ভাগ্যনিয়ন্তা, সংসারের কর্তাও তাই। তারপর কর্তাটি যদি বিশেষ অনেক গুণের অধিকারী হন, তবে তো কথাই নেই। বাবার গুণের বোধহয় পরিমাপ হয় না—বিশেষত বিদ্যার দিক থেকে। এমন কোনো বিষয় নেই যে বিষয়ে তিনি কিছু না কিছু জানেন–অমেয় তার জিজ্ঞাসা নিরন্তর বহুদিকে ধাবিত। দুরূহ সংস্কৃতে লেখা দর্শনশাস্ত্রের অর্থবোধ করবার জন্য কোনো দিন তার সাহায্য দরকার হয় নি। তার স্মৃতিশক্তি প্রখর। কেউ কেউ মনে করতেন, তিনি জাতিস্মর। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীও মনে করতেন যখন বাবার সাত বছর বয়স, তখন তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, তাঁরা যে দুজনে গত জন্মে একত্র তপস্যা করেছিলেন কোনো এক নদীর তীরে সে কথা বাবার মনে আছে কিনা। বাবার অবশ্য মনে ছিল না। তখন বিজয়কৃষ্ণ বলেন যে, তোমার সেবারেও পতন হয়েছিল এবারও হবে–তোমায় আবার আসতে হবে। বাবা তাতে ভীত নন, এই উপভোগ্যা পৃথিবীতে আবার যদি আসতেই হয় তাতে তিনি কাতর হবেন কেন? দ্রুতপঠন ক্ষমতাও তার বিস্ময়কর! সাত-আট হাজার বইয়ের লাইব্রেরীর সমস্ত বই তার পড়া। তাছাড়া তার ব্যক্তিত্ব অসাধারণ, সেই ব্যক্তিত্বের আকর্ষণী শক্তিও প্রবল। বড় বড় পণ্ডিতরাও তার সমকক্ষ নন, তিনি তাদের প্রশ্নে প্রশ্নে ঠকিয়ে প্রমাণ করে দেন যে তাদের যত্ব-ণত্ব জ্ঞান নেই।
