প্রফুল্ল ঘোষ ছিলেন ইংরেজির অধ্যাপক, তিনি ভালো শেক্সপীয়র পড়ান। বাবা মাঝে মাঝে তাকে ধরে আনতেন, এলেই তিনি শেক্সপীয়র শোনাতেন। একবার তাঁকে নিমন্ত্রণ করে এসেছেন রাত্রে খাবেন ও শেক্সপীয়র পড়বেন। তারপর আমরা বসে আছি আসেনই না, আসেনই না—যখন আমরা অধীর হয়ে উঠেছি, ঘুম পাচ্ছে, রাগ হচ্ছে তখন তিনি এলেন। খাওয়াদাওয়া হল। পুরো সব খেলেন—তারপর মুখ ধুতে ধুলে বললেন, “দেখুন, আজ প্রফেসরের উপযুক্ত কাজ করেছি—আমি নিমন্ত্রণের কথা একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম—খেয়েদেয়ে মুখ ধুতে ধুতে মনে পড়ল—’ওঃ আজ নেমন্তন্ন!’ এ যেন সেইরকম, ননদ-ভাজের গল্প—ননদ আর বৌ গেছে নদীতে বাসন ধুতেননদকে কুমীরে নিয়ে গেল—বৌ বাড়ি এসে সে কথা ভুলে গেল, কাউকে বলল না। খাওয়াদাওয়া করে আবার যখন ঘাটে গেছে তখন মনে পড়েছে, শাশুড়ীকে ডেকে বলে, ‘ভালো কথা মনে হল আঁচাতে আঁচাতে, ঠাকুরঝিকে নিয়ে গেল নাচাতে নাচাতে’—” ভদ্রলোক বিশাল বপু নিয়ে বেঁকে ঝেকে ছড়া বলছিলেন—“আমারও সেইরকম হল।” সেদিন উনি আমাদের মার্চেন্ট অব ভেনিস শুনিয়েছিলেন, সেখানে যে বর্ণনা আছে জেসিকো আর লরেন্সে পোর্শিয়ার বাড়ির বাগানে বেড়াচ্ছে—লরেন্সে বলছে—the moon shines bright in such a night as this sweet wind did gently kiss the trees’. ঘর ভরা লোক, আমরা শেক্সপীয়র শুনছি মির্চা আর আমি পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছি, একঘর লোকের মধ্যেও অবশ্য একলা হওয়া যায়। কিন্তু তার চেয়ে আরো ভালো সত্যি একলা হওয়া। আমি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঐ লাইনগুলো মনে করতাম—আমরা কি কোনোদিন একলা বেড়াতে পারব? হয়ত কোনো জ্যোৎস্না রাতে বা জোনাকিজ্বলা সন্ধ্যায় আমরা হেঁটে বেড়াতে একটু দূরে গিয়েছি সাবি সঙ্গ ছাড়বে না—in such a night as this পাশাপাশি থেকেও বিরহ হচ্ছে। আবার দূরে দূরে থেকেও মিলন হয়। একেক সময় ও যে ঐ সামনের সীটে বসে আছে তাতেই আমার মন ভরে যায় আনন্দে। পাঞ্জাবীর রেখার উপর ওর গলার লাইনটা দেখা যাচ্ছে। ঐদিকে তাকিয়ে আমার শরীর শিহরিত হয়—আমি ভাবি আর কিছু দরকার নেই—ও দূরে থাকুক, দূরে থাকুক, ওকে একটু দেখলেই আমার যথেষ্ট হবে। একেক দিন আমি মনে মনে প্রার্থনা করতাম ও যেন গাড়ি থেকে আগে না নামে। তাহলে আমি নামবার সময় ওর গলাটা একটু ছুঁয়ে দিতে পারি। কিন্তু তা কি হয়? ও তো গাড়ি থেকে সবার আগে নামবে তারপর হাত ধরে ধরে সকলকে নামাবে–এই তো ওদের নিয়ম। ওকে কিন্তু আমি এসব কথা কখনো বলিনি—আমি ওকে কতটা ভালোবাসি তাও বলি নি। কারণ এখনও আমি নিশ্চিত নয় এ ব্যাপারটা কি, এটাই ভালোবাসা কিনা। আর তাছাড়া তাহলে ও নিশ্চিন্ত হয়ে যাবে, ওর ঈর্ষাটা চলে যাবে। যেমন আমার ঈর্ষা নেই—ওর ঈর্ষাটাই আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। তাই আমি ইচ্ছে করেই এমন সব কাণ্ড করি যাতে ওর ঈর্ষা হয়। যেমন সেদিন লেখক ‘অ’বাবু ওর ঘরে বসেছিলেন, আমি তার সঙ্গে খুব গল্প জুড়ে দিলাম—দু’চারটে ইংরেজি কথা বলে বাংলাতেই গল্প করলাম—কেন, আমরা বাঙালী না? উনি আছেন বলে সব সময় ইংরেজি বলতে হবে নাকি? আমি একবার ওর দিকে তাকাইনি পর্যন্ত। সেদিন ওর মুখের ভাবটা, ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে’র মত মেঘাচ্ছন্ন। ঈর্ষা হলে ও একটু নিষ্ঠুরও হয়—সেটাই সবচেয়ে ভালো লাগে। আমার এই মনের ভাবটা কি? ককেট্রি! ডিশেনারী দেখতে হবে।
কিছুদিন থেকে ওর সর্দারিটা খুব বেড়ে গেছে আমাকে ধরেই নিয়েছে যেন ওর সম্পত্তি। ওর ধারণা মা, বাবা এবং বাড়ির সকলেই এটা জানে এবং অনুমোদন করে। তবে আর কি? হয়েই গেল সব। আমার বেরিবেরি হয়েছিল তাই পা ফুলে থাকে সেজন্য পায়ে কবিরাজী তেল মালিশ করি—কিন্তু তার মানে এ নয় যে কখনো খালি পায়ে চলতে পারব, পাথরের ঠাণ্ডা মেঝের উপর পা রাখতে ভালো লাগে—ও তা দেবে না—চটি পরো। লঙ্কা খাবার সঙ্গে বেরিবেরির কোনো সম্পর্ক নেই—সর্ষের তেলে বেরিবেরি হয়—তা ও বুঝবে না—রোজ একবার করে বলবে লঙ্কা খাবে না।
সেদিন খাবার পরে আমি, কাকীমা ও মির্চা খাবার টেবিলেই বসে গল্প করছি। ও আমার উপর রেগে আছে, লঙ্কা খেয়েছি, ওর কথা শুনি নি বলে। ও কাকীমাকে বলছে, “কাকীমা, তোমার নূতন বিয়ে হয়েছে তোমার মাধুর্য প্রয়োজন, তুমি লঙ্কা খেয়ে না–ঝাঁঝাঁলো যে সব মেয়ে তারা যা খুশী করুক”—
আমি বললাম, “যে সব ছেলেরা বেশি মিষ্টি, যাদের সবাই বলে কি ভালো ছেলে, আসলে তাদের কোনো পৌরুষ নেই।”
“তার মানে? তার মানে আমি লঙ্কা খেতে পারি না ঝাল বলে? আমার সাহস নেই?”
এই বলে ও কাচা লঙ্কা ও লেবুসুষ্ঠু প্লেটটা এগিয়ে নিয়ে একটার পর একটা লঙ্কা তুলে চিবিয়ে খেতে লাগল শুধু মুখেই। কি সর্বনাশ! ডাকাত একেবারে!
“ফেলে দাও! ফেলে দাও!” বলে আমি উঠে পড়তে যাচ্ছি ও টেবিলের নিচে দুই পা বাড়িয়ে দিয়ে আমার পা দুটা বন্দী করে ফেলল—গায়ে কি জোর! বেশি টানাটানিও করতে পারি না, কাকীমা বুঝে ফেলবে আমি বন্দী।
ও পর পর দুটো তিনটে লঙ্কা খেয়ে ফেলেছে—ওর ঠোঁট ইতিমধ্যে ফুলে গেছে, থুতনী পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে। ফর্সা মুখের এখানে-ওখানে লাল-ও কিন্তু অবিচলিত—আমি হাত বাড়িয়ে প্লেটটা কেড়ে নেবার চেষ্টা করছি। কাকীমা নির্বিকার, হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। কাকীমা কিছু বুঝতে পারছে না, একটা লোক সামনে বসে আত্মহত্যা করছে। সাবি বুঝতে পেরেছে, ওর মন আর আমার মন তো একই ধাতুতে গড়া।
