আমাদের কবিও লিখেছেন—কোথায় আলো কোথায় ওরে আলো, বিরহানলে জ্বালোরে তারে জ্বালো’–বিরহানলে! বিরহানলে আলো জ্বালিয়ে লাভটা কি, মিলনে কি আলো জ্বলে না? সব কাব্যে, সব দেশের কাব্যে খালি বিরহের জয়গান! কেন? বিরহ কি? যদি মির্চা চলে যায়, তাহলে আমার যে কষ্টটা হবে সেটা বিরহ। কি ভয়ানক। ও যখন নিচে আছে, আমি উপরে—তখনই আমার কষ্ট হয়—আর একেবারে চলে গেলে? তাই নিয়ে আবার আলো জ্বালানো? সে গাঢ় অন্ধকার আমি কল্পনাও করতে পারি না। ঐ কষ্ট পেয়েই তো মেঘদূতের যক্ষ বেচারা বিরহের আলো নিবিয়ে দিয়ে মিলনের স্বর্গের কথা ভেবেছিল। স্বর্গ? সেই তো স্বর্গ যেখানে আনন্দে ছাড়া চোখের জল পড়ে না। যেখানে প্রণয়কলহ ছাড়া বিরহ হয় না। যৌবন ছাড়া বয়স নেই। মেঘদূত মনে পড়ে আমার মনটা প্রসন্ন হয়ে গেছে—আমি আবৃত্তি করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছি—
আনন্দোথং নয়নসলিলং যত্র নান্যৈনিমিত্তৈ
নান্যস্তাপঃ কুসুমশরজাদিষ্ট সংযোগসাধ্যাৎ
নাপ্যন্যস্মাৎ প্রণয়কলহাদ্বিয়োগোপপত্তি
বিশোনাং ন চ খলু বয়ো যৌবনাদন্যদস্তি!
বাবা বসবার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন–“মেঘদূত বলছি ভালো করে উচ্চারণ কর আমার সঙ্গেল ইয়ত্রনান্যৈনিমিত্তৈঃ-—“ইয়’ ‘ইয়’ ‘জ’ নয়, শূদ্রের জিহ্বা কেন?”
“তুমি শুনতে পেলে কি করে?”
“কোনোখানে একবিন্দু সংস্কৃত উচ্চারণ হবে আমার কানের আওতায় আর আমি শুনতে পাব না, তাই কি হয়?
সারিকে নিয়ে একটা ভারি মুশকিল হয়েছে। ও এক মিনিট আমাদের সঙ্গ ছাড়ে না। কিছুদিন থেকে ও বলছে ও মির্চাকে বাংলা পড়াবে। মির্চাও বলে তাই ভালো, তাহলে বরং বাংলাটা শেখা হবে। কারণ আমিও ওকে যত বাংলা শেখাচ্ছি সেও ততো আমায় ফ্রেঞ্চ শেখাচ্ছে। এই দুই ভাষায় আমরা যে পারদর্শী হয়ে উঠব তার সম্ভাবনা কম। সবচেয়ে মুশকিল এই যে, মির্চা মনে করে সাবি একেবারে ছোট্ট সরল মেয়ে, কিছু বোঝে না। ওর সামনে আমরা অল্পবিস্তর প্রেমালাপ করতে পারি, ও আমার হাত ধরতে পারে—ইত্যাদি। কিন্তু এটা ভুল। আমি সোল পূর্ণ হয়ে সতেরোয় পড়ব, ও এগার পূর্ণ হয়ে বারোতে। বারো বছরের মেয়ে এত কিছু ছোট নয়। তাছাড়া ও তখন যৌবনে প্রবেশ করেছে। কিন্তু ও খুব ছেলেমানুষি করে কথা বলে—ওর যখন মাত্র ছয় বছর বয়স তখন আমাদের এক ব্রাহ্ম আত্মীয়ার বিবাহ বিচ্ছেদ হল। সেই অভাবনীয় ঘটনায় সারা বাংলাদেশ তোলপাড় হচ্ছিল, মহিলারা একত্র হলে আর কোনো কথা নেই— স্বামীত্যাগ ভালো কি মন্দ, এই বিতর্ক। আমার মা মাসীরা তখন সে-সব আলোচনা করতেন—ওকে চলে যেতে বললে যাবে না, বলে, “বলো না, আমার সামনে বলো, আমি ছেলেমানুষ কিছু বুঝব না!” তবে তখন সত্যিই বুঝত না, এখন বোঝে, নিশ্চয় বোঝে। ওর খুব কৌতূহল। কৌতূহল ভালোই, সেটা জিজ্ঞাসা, জিজ্ঞাসা না থাকলে মানুষ জানবে কি করে?
এছাড়াও একটা নূতন ব্যাপার ওর মধ্যে লক্ষ্য করছি। আমাকে নিয়ে বাবা যে এত বাড়াবাড়ি করেন, আমাকে রবিঠাকুর এত ভালোবাসেন কিম্বা আমিই তাকে বাসি ও সেখানে যাবার সুযোগ পাই, অতবড় একজন ব্যক্তি আমার এত আপন কিন্তু ও সেখানে পৌঁছতে পারছে না, এতে সে কষ্ট পাচ্ছে। এ কষ্টটা তীক্ষ্ণ এবং তীব্র কিন্তু এটাতে ওর দোষ নেই। কেউ যদি চোখের সামনে আর একজনকে অতটা পেতে দেখে, তাহলে তার কষ্ট হতে পারে। ওর যে এখনও সময় হয়নি, হলেই পাবে, তাতে ওর বোঝার বয়স হয়নি। ও ঠোঁট ফোলাচ্ছে, কাঁদছে, ‘দিদিকে সবাই ভালোবাসে, আমাকে কেউ ভালোবাসে না। ছোট্ট মেয়ের এই মিষ্টি কথায় সবাই হাসে কিন্তু তাতে ওর দুঃখটা তো যায় না।
আমি যখন দিল্লী গিয়েছিলাম, তখন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে ও একবার বলেছে—“দিদি না থাকলে তো এ বাড়িতে আসেনই না আপনি।” এখন ও মির্চাকে ধরেছে—ও বুঝতে পারছে মির্চার সঙ্গেও আমার একটা বিশেষ ভাব হয়েছে যেখানে সে নেই—আমার মনে হয় ও অনেকটাই বুঝতে পেরেছে এবং ওর মনে হচ্ছে আবার এই লোকটিও দিদিকে ভালোবাসবে। একথাটা নিয়ে আমি কারুর সঙ্গে আলোচনা করতে পারছি না। কার সঙ্গে করব? আমার বিশেষ ভয় মির্চা কিছু বুঝতে পারছে না বলে। কি জানি কখন ওর সামনে কি প্রকাশ করে ফেলে। একদিন সাবি বলেছেও, “তোমরা চোখে চোখে কি কথা বলেছ।” আমি মির্চাকে যখন বললাম, ও এর মধ্যে সাহিত্যরস খুঁজে পেল—খুব হাসছে—“চোখে চোখে কথা বলা, a good expression. Let us try it again.” আমি যত সাবিকে লক্ষ্য করছি একটা অজানা আশঙ্কায় বুকের ভিতরটা কাঁপছে এই সুখের স্বর্গ ও ভেঙ্গে দেবে না তো? ইচ্ছে করে না হলেও ওর ভিতরের জমা উত্তাপে? না না, ও ছেলেমানুষ কি করবে? কিন্তু রোজ এই দুশ্চিন্তা আমি ভোগ করছি। আমি জানি শান্তি সব জানে। খোকা জানে। ওদের অনুমোদন আছে। ওরা কখনো বলবে না। সম্ভবত কাকীমাও জানে, বলবে না। আমার ভয় শুধু ঐ পুঁচকে মেয়েটাকে। মাঝে মাঝে হাসিও পায়! ও কিছু নয়। ভয় তো থাকবেই। ভয় নিত্য জেগে আছে। প্রেমের শিয়র কাছে মিলন সুখের বক্ষ মাঝে। আনন্দের হৃদস্পন্দনে কাঁপিতেছে ক্ষণে ক্ষণে বেদনার রুদ্র দেবতা যে।
কবিতাটি ভয়ানক—গা ছম ছম করে।
আমরা রোজ শেলে গাড়ি করে বেড়াতে যাই–কখনো যশোর রোড দিয়ে, কখনো বারাকপুর রোড দিয়ে, কখনো টালিগঞ্জের নালার পাশ দিয়ে অর্থাৎ টালিগঞ্জ সার্কুলার রোড দিয়ে। গাড়িতে বাবা মা আমি মির্চা সাবি ও ছোট দুই ভাই। মির্চা সামনে বসে ভাইদের নিয়ে। এই বেড়ানর সময়টুকুই আমরা একটু গাছপালা দেখতে পাই। আমার খুব ইচ্ছা করে ওর সঙ্গে একলা বেড়াই। গাছপালার মধ্যে, জ্যোৎস্নায় বা অন্ধকারে তারার আলোতে বইতে তো কত পড়েছি—সে রকম আমাদের কখনো হবে না, কি করে হবে?
