“আমি বলছি তোমায়, অমৃতা, কোনো পাপ নেই—এ তো ভালোবাসা পাপ কেন হবে? ভালোবাসা দিয়েছে কে আমাদের? ঈশ্বর—ভালোবাসাই ঈশ্বর।”
ঝড় উঠানে নেমে এসেছে, রান্নাঘরে ঢুকছে। কিছু দেখতে পায় নি, আমরা এখন অন্তত এক হাত দূরে আছি। আমি নির্বিকার, ওকে ডেকে বললাম—“ঝড় চা কর–” আচ্ছা এই যে আমি মিথ্যা আচরণ করলাম, এটা অন্যায়?—যদি দণ্ড সহিত হয় তবু মিথ্যা বাক্য নয়—’এ তো মিথ্যা আচরণ, নয় কি? কিন্তু একথা মির্চাকে বলে তো লাভই নেই। ভালোই তো যে ও পাপ মনে করে না। ও যদি পাপ মনে করে দূরে চলে যেত লাভটা কি হত আমার? তাহলে তো ওকে আর পেতামই না। আমি ওকে চাই।।
ওর দিকে তাকিয়ে দেখছি ও ঠোঁট চেপে আছে—ওর হাত একটু কাঁপছে। ওকে অধীর মনে হচ্ছে। ও ধৈর্য হারিয়েছে কেন? আমি পাপের কথা বলেছি বলে ও রাগ করল নাকি? আমার ইচ্ছে হচ্ছে ওর কাছে গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু সে তো। অসম্ভব, ঝডু উঠে পড়েছে না? আমার অন্য মন যেন ভূকুটি করছে, সে বলছে–না, না, না, এখানে আর এক মুহূর্তও থেকো না—পালাও, পালাও, পালাও। এখনই ওর কাছ থেকে চলে যাও। আমি উঠে পড়লাম—ওর দিকে আর তাকালামই না। অস্থির পায়ে দ্রুত উপরে চলে গেলাম।
সেদিন রাত্রে আর ঘুমই আসে না। অনেকক্ষণ পর্যন্ত ওর স্পর্শটা আমার গায়ে লেগে রইল। এরকম একটা অভিজ্ঞতা চেপে রেখে সুস্থ থাকা মুশকিল। আমি কিছু গোপন করতে অভ্যস্ত নই। তাই কি ভিতরটা এত অধীর? না অন্য কোন প্রত্যাশা আছে। কি প্রত্যাশা থাকতে পারে? আমার নিজের চোখ নিজের দিকে তাকিয়ে আছে। যেখানে এক অজ্ঞাত গুহার অন্ধকার সেই দিকে ফেরান সে চোখ বিরক্ত ও অনুসন্ধিৎসু।
আমি আজ মাটিতে মাদুরে শুয়ে আছি—ঠাণ্ডা পাথরের মাটিতে গড়িয়ে গড়িয়ে ভাবছি—আচ্ছা, এ-অভিজ্ঞতাটা আমি কবিতায় লিখতে পারি? ওরে বাবা, কি হয় তাহলে?
মা বাবার চেয়েও আর একজনকে বেশি ভয়—সজনীকান্ত দাস–সেই ব্যক্তিকে আমি দেখি নি। কিন্তু তাঁর শনিবারের চিঠি! ওরে বাবা! ছেলেদের কলেজে কবিতা পড়ি বলেই আমাকে বকুল বনের পাখী’ বলে ইঙ্গিত করে কত কি সব লিখেছে— এই ঘটনার আভাস পেলে আমাকে শায়েস্তা করে দেবে! নিশ্চয়ই অনেক লোকই এসব বিষয় লিখেছে—এমন তো হতে পারে না শুধু আমারই মন এত বিস্ময়ে ভরে গেছে। তবে আমার আর লেখার দরকার কি। কড়ি ও কোমলে একটা কবিতা আছে,ওটা ভালো নয়, আমি ওটা পড়ি না, চাপা দিয়ে রাখি। এমন একটা কবিতা যে কেন মহাকবি লিখতে গেলেন? আমার সেই দুতিন মিনিট সময়টা ভাবতে ভালো লাগছে—আবার ভয়ও করছে। আমি আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছি, আমি জানি না—এই অনুভূতির উৎস কোথায় শরীরে না মনে—আর একজন আমার প্রিয় কবির কবিতা মনে পড়ছে— “words are but loads of chain in my flight of fire.I pant, I sink, I expire!” আমি ভাবছি ‘flight of fire, flight of fire আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে এই কথাটা—আমি ডুবে যাচ্ছি, ডুবে যাচ্ছি, আমার মাদুরটা পালকের বিছানা হয়ে গেছে।
কাকার বিয়ের জিনিসপত্র কিনে ঢুকছি ওর ঘরের দরজার সামনে, আমায় দেখে ও আমার হাত থেকে জিনিসগুলো নিয়ে নিল। আমার ভার লাঘব হল। এইগুলো ওদের দেশের নিয়ম। এ নিয়ম ভালো। আর কাকাকে দেখ না, আমার ঘাড়ে সব জিনিস চাপিয়ে তরতর করে চলে গেল সিঁড়ি বেয়ে। আর খোকা? আমি যদি ইটও বয়ে নিয়ে যাই, এগিয়ে আসবে না সাহায্য করতে। মেয়েরা ঘরে ঢুকলে ও উঠে পাঁড়ায়, না বসা পর্যন্ত বসে না, পর্দা তুলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে—এ সব ইয়োরোপেরু আদবকায়দা—আমাদের বাড়ির মেয়েরা এসব খুব পছন্দ করে—এমন কি যে মাসী আমায় বকেছিলেন সাহেব হেঁড়াটার সঙ্গে হি-হি করছি বলে তিনিও সেদিন মাকে বলছেন, “মেজদি এই সাহেব ছেলেটি কিন্তু খুব ভালো। কি সুন্দর ডাল-ভাত হাত দিয়ে চেটেপুটে খেয়ে গেল। কে বলবে সাহেব! ঠিক যেন আমাদের ঘরের ছেলে।” আমার খুব হাসি পাচ্ছে-আমার সঙ্গে হাসছিল বলে ‘ছোড়াটা ছিল আর হাত দিয়ে ভাত খেল বলেই ‘ছেলেটি’ হয়ে গেল।
আমার মা বলেন, “অমন ছেলে হয়! যেমন পড়াশুনোয় ভালো, তেমনি ভদ্র। ‘মা’ বলে যখন ডাকে এত মিষ্টি লাগে।”
শান্তি বলল, “আর ধুতি পাঞ্জাবী পরলে গৌরাঙ্গ মনে হয়।”
কাকার বিয়েতে ও দেশ থেকে অনেক সুন্দর সুন্দর জিনিস এনে দিয়েছে কাকীমার জন্য, নানা রকম খেলনা, কাঠের উপর পোকারের কাজ করা আর জর্জেটের উপর এমব্রয়ডারি করা ড্রেসিং টেবিল সেট, রুমাল, কত কি জিনিসগুলো কি সুন্দর। আমার মন বেশ খারাপ হয়ে গেছে, ওদের বিয়ে হচ্ছে, দেবেই তো! তা আমাকেও কিছু দিতে পারত। একটা রুমালও দিল না। আমাকে ও কিছু দেয় না। না, না, বই দেয়। আমাকে দু’ভলম গ্যেটের জীবনী দিয়েছে। যেদিন ভূমিকম্প হল তার পরের দিন। মির্চার এখানে আসার স্থান-কাল ও অস্তিত্বের একমাত্র নিদর্শন—এই অসীম কালসমুদ্রে একটি ক্ষুদ্র দিকদর্শন ঐ বই দুখানি আমার কাছে এখনও অর্থাৎ ১৯৭২ সালেও আছে।
ভূমিকম্পের রাতটা ভারি সুন্দর। গভীর রাতে ভূমিকম্প হল, আমরা সবাই নিচে নেমে এলাম। কিছুক্ষণ বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিতরের উঠোনে সিঁড়ির উপরে বসলাম। মির্চা কফি বানাল। কি আশ্চর্য সুন্দর সেই তারা ভরা রাত। অত রাতে আমি আর কোনোদিন ওকে দেখি নি, আগেও না পরেও না। তাই সেই রাতটা দীর্ঘদিন পর্যন্ত একটা মৃদু সুগন্ধের মত মন ছেয়ে ছিল। রাতের একটা নিজস্ব রূপ আছে—আর মানুষের চোখেও তা একটা বিশেষ দৃষ্টি দেয় নিশ্চয়। এত রাতে আমি যে ওকে দেখলাম সেই সুখটা ও স্থায়ী করে দিল, পরের দিন ঐ বইখানা দিয়ে। তাতে আমার নাম লিখে ও লিখল, as a token of friendship after the earthquake of 28th July 1930-ও বললে ওদের দেশের নিয়ম ভূমিকম্পের পরে বন্ধুকে কিছু উপহার দিতে হয়। মির্চা আমার কাছে গ্যেটের জীবন সম্বন্ধে অনেক কথা বলেছিল বইটা থেকেও শুনিয়েছিল সেই যে কবি যিনি আলো চেয়েছিলেন—“আলো আরো আলো। আমি বুঝতে পেরেছিলাম এ সত্যিকারের আলোর আর মানুষের পরের দিন ঐ বই, এত রাতে আমি যে কথা নয় অর্থাৎ তার মৃত্যুআচ্ছন্ন চোখে সূর্যের আলোর প্রত্যাশা এ নয়। এ হচ্ছে প্রতীক দিয়ে বলা, যেমন জ্ঞানের আলো, বুদ্ধির আলো।
