“ওমা কও কি খুকি? মার পূজায় বলি হইব না?”
তারপর ভাইবোনেরা সব জড়ো হল, আমি ওজস্বিনী বক্তৃতা দিতে লাগলাম। আমাদের বয়সীরা অনেকেই আমার মতানুবর্তী হল। আমরা সদলবলে মেজ জ্যাঠামশাইয়ের কাছে গেলাম। তিনি সাদাসিদে ভালো লোক এবং স্নেহপ্রবণ, আর যদি কোনো কারণ নাও থাকে, তবু আমার প্রতি স্নেহবশতও তিনি রাজি হতে পারেন। তাকে আমার খুব ভালো লাগে একটা বিশেষ কারণে ছাত্ররা যখন খেতে বসে তিনি হুঁকো হাতে করে তদারক করেন, তারা যাতে ভালো মাছটি পায়। ওরা পরের ছেলে, ওদের যত্ন করতে হবে—বৌরা হয়ত নিজেদের ছেলের জন্য ভালোটা রেখে দেবে এই তাঁর ভয়। এরকম আর কোনো কর্তা ব্যক্তি করবে না এ বাড়িতে।
মেজ জ্যাঠামশায় ধর্মতত্ত্বের আলোচনায় যেতে রাজি নন। তিনি স্পষ্ট বলে দিলেন যে তিনি তো বাড়ির কর্তা নন। বাড়ির কর্তা যিনি বড়, তার দ্বারস্থ হও। তিনি যা বলবেন তাই হবে। তার ঘরের কাছে পৌঁছে পিছন ফিরে দেখি ভাইবোনের দলটি অন্তর্হিত। তখন সেই ভয়ানক রণশিবিরে আমি একলাই প্রবেশ করলাম। দোর্দণ্ডপ্রতাপ কর্তা একটি রোগা ছোট্ট মানুষ। হুঁকো হাতে উবু হয়ে খাটের উপর বসেছিলেন। বয়স ষাটের কাছে, আর তাঁর তরুণী ভার্যা একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুকে দুগ্ধ পান করাচ্ছিলেন। আমি যথেষ্ট গুছিয়ে আমার বক্তব্য পেশ করলাম। প্রধান প্রার্থনা হচ্ছে ঐ মহিষ এবং ছাগলগুলোকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। যদি প্রবৃত্তিকে বলি দেওয়াই প্রয়োজন হয় তবে বৈষ্ণবদের মতো লাউ বা কুমড়ো বলি দেওয়া যেতে পারে। তিনি হুঁকো টানতেই লাগলেন। তারপর মুখটি তুলে সংক্ষেপে বললেন, “আমরা শাক্ত।”
আমি খুব তর্ক করতে পারতাম। সমস্ত যুক্তি প্রয়োগ করলাম, শেষ পর্যন্ত নিরীশ্বরদের বিতর্ক ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তাও বললাম, যারা যজ্ঞকারী ব্রাহ্মণদের বলেছিল, যজ্ঞে বলি দিলে পশুটা যদি স্বর্গে যায় তবে তোর বুড়ো বাপকে এনে বলি দে না, স্বর্গে যাবার এই তো সোজা উপায়।
কিন্তু বৃদ্ধ অনড়। কিছুতে রাজি হলেন না। পরে শুনেছি তিনি বলেছেন, নরেনের এই মাইয়াডা কুতার্কিক।
তখন আমি আমার অনুগত ভ্রাতাভগ্নীদের বললাম, এই পূজায় আমরা যোগ দেব। সপ্তমী অষ্টমী নবমী দশমী এই চার দিন আমরা বাড়িতেই থাকব না। আমরা সকালবেলা চিড়ে মুড়ি নাড় মুড়কী কলা ইত্যাদি নিয়ে নৌকায় নৌকায় বেড়াতাম খালে বিলে, সন্ধ্যায় ফিরে এক দৌড়ে বিছানায়। বড়দের সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ। বেশ পিনিক হচ্ছিল, আমাদের কিছু খারাপ লাগে নি। কিন্তু বাড়িতে জেঠিমাদের মন ভেঙ্গে গেছে। পূজার সময় ছেলেমেয়েগুলো বাড়ি রইল না। পূজা দেখল না। শেষটায় তাদের অনুরোধে পড়ে আমরা বাড়ি ফিরলাম বিসর্জনে যোগ দিতে। আমি মনে মনে বলেছিলাম সত্যিই যদি প্রতিমায় কোনো শক্তি এসে থাকে তাহলে এ বেচারা মহিষটাকে বলি দেবার সময় একটা কিছু যেন হয়, কোনো নিষেধের নিদর্শন। কিছুই হল না, বেচার মহিষের রক্তে হাড়িকাঠ ভাসতে লাগল।
এই ব্যাপারে বাবা আমাকে স্বাধীনতা দিলেন, বকলেন না। আমি যে নিজে নিজে একটা কিছু করতে পারছি, মনের জোর দেখাচ্ছি, তাতে উনি খুশি। সরোজিনী নাইডু হবার প্রথম পদক্ষেপ হয়ত!
কিন্তু মির্চার ব্যাপারে এ-সমর্থন পাব? না, না, কখনো নয়। আর আমিই কি এত জোর দেখাতে পারব? তাও নয়। অন্যের জন্য কিছু করা আলাদা কথা, সে মহিষই হোক বা মানুষই হোক কিন্তু নিজের একথাটা আমি বলতে পারব না। লজ্জা সংকোচ অপরাধবোেধ
আমার মুখ চেপে ধরবে।
এ-বিষয়ে কিছু বলা যায় না। আমি বন্দী, আমি বন্দী, আমি বন্দী। কে আমাকে শক্তি দেবে? আমি মনে মনে বললাম তুমি হিন্দু হয়ো না, দ্যাখো হিন্দু হয়ে আমার কি লাভ হয়েছে? হিন্দুত্ব তোমায় কোনো শক্তি দেবে নাবন্দীই করবে।
“অয়ি প্রথম প্রণয়ভীতে, মন নন্দনঅটবীতে
পিক মুহু মুহু উঠে ডাকি—”
কি আশ্চর্য এই গানটা! ভয়ই তো, সত্যিই ভয়! আমি ওর ঘরে দাঁড়িয়ে আছি—গানটা গুন গুন করছে মনে, একটা কিছুর প্রত্যাশায় আমি বেপথুমতীও আমার পিছনে খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর একটা হাত আমার কটি বেষ্টন করে আছে, আর একটা হাত গলার উপর থেকে অসম্পূর্ণ হারের মত ঝুলছে। ওর মুখ আমার কানের কাছে, গালের উপরে ও আমার কানে ফিস্ ফিস্ করে কি বলছে, বোধহয় ওদের ভাষায়, আমি তার অর্থ বুঝতে পারছি না।
“মির্চা, আমার ভয় করছে বড় ভয় করছে।”
“কিসের ভয়, তোমার কিসের ভয়?”
আমি কাঁপছি—আমি জানি এখন কি হবে—হাঙ্গার বইটাতে যা আছে তাই হবে। ও আমাকে চেয়ারটাতে বসিয়ে দিয়েছে—আমার শরীর নিস্পন্দ্য—এখন দুপুরবেলা সারাবাড়ি আলস্যজড়িত হয়ে পড়ে আছে—আমি নীচে এসেছিলাম চিঠির বাক্সে চিঠি খুঁজতে। আমি মনে মনে ভাবছি উঠে চলে যাই কিন্তু ওর গলা বেষ্টন করে আছি, হাতটা সরিয়ে নেবার শক্তি নেই—আর আমার অনাবৃত বুকের উপর ও তার মুখ রাখছে। আমার শরীর শিথিল, আমার কিছু করবার ক্ষমতা নেই, ওর চুলের সুগন্ধে আমার নিঃশ্বাস ভরে গেছে। ও কি যেন বলছে অর্ধস্ফুটভাবে, বোধহয় গডেস্ গডেস্’—আমি বলছি আমাদের পাপ হচ্ছে মির্চা, পাপ হচ্ছে কয়েকটি মুহূর্ত মাত্র, একটা শব্দ, কে দরজা খুলল, ও আমার ছেড়ে দিয়ে সরে গেছে। আমি সোজা হয়ে বসেছি—আমার বিস্রস্ত আঁচল ঠিক করে নিয়েছি, তিন-চার মিনিট সময়ও হবে না, এর মধ্যে যেন পৃথিবীটা আমার কাছে বদলে গেছে। আমার জীবনে যে এমন একটা ঘটনা ঘটতে পারে তা ভাবতেই পারি না। আমি মুখে বলছি পাপ হবে, কিন্তু পাপবোধ তো নেই—কোনো অনুশোচনাই নেই—ও আমার চুলগুলো কানের উপর দিয়ে উঠিয়ে দিল–
