মির্চা আজকাল রোজই বিকেলে ধুতি পাঞ্জাবী পরে—আর শুনছি ও আর্য হবে, হিন্দু হবে। ও তো হিন্দু শাস্ত্র পড়েছে, তাই বলেই ধর্ম ত্যাগ করবার দরকার কি? আমি জানি না ও কেন হিন্দু হতে চায়, এ বিষয়ে প্রধান উৎসাহী কাকা। এমন কি হতে পারে যে ও হিন্দু হলে আর কোন বাধা থাকবে না তাই ভাবছে? ভুল ভুল। ও আমাদের সমাজটাকে একেবারেই চেনে না। এখানে কৈানো কাজের যুক্তি নেইবাবা কি জানেন না যে তার ছাত্রদের মধ্যে মির্চা নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু তাতে কি? ও যে অন্য জাত—জাত কি এক রকম? একে ও অন্য দেশের মানুষ, তারপর খ্রীস্টান, তা যদি নাও হত—ও যদি। হিন্দু বাঙালীও হত, তাহলেও আমাদের জাত হওয়া চাই। তাতেই হবে না গোত্র পৃথক হওয়া চাই। হায় কত যে ‘ছোট বড় নিষেধের’ গ্রন্থি তা ও জানে না। জানে, সবই জানে, শুনছে তো অনবরত—আমাদের প্রথা সংস্কার সম্বন্ধে ওর জিজ্ঞাসার অন্ত নেই, কিন্তু ও জানে না এগুলো আমাদের বাড়িতেও কতটা মানা হয়। আর বাবা যিনি এত জানেন, যার অগাধ পাণ্ডিত্যের শেষ নেই তবুও তিনি জানেন না গোত্র বা জাত যাই হোক মানুষের সুখদুঃখ তার উপর নির্ভর করে না। আর আমি? আমি মানি না, এ-সব মানি না, মির্চার সঙ্গে আমার যদি বিয়ে নাও হয়—সারা জীবন দিয়ে প্রমাণ করব আমি মানি না। কোনো আচার বা প্রথা মানুষের চেয়ে কখনো বড় হবে না আমার কাছে। জাতের কথা দূরে থাক, আমি হিন্দু সমাজের কিছুই মানি না। পূজাই মানি না। দেশের বাড়িতে কি হয়েছিল পূজার সময়?
দুবছর আগে আমি দেশে গিয়েছিলাম, দেশ অর্থাৎ আমাদের পূর্ববঙ্গের গ্রামের বাড়ি। সে বাড়িতে সত্তর জন লোক একসঙ্গে বাস করেন। এরা সব জ্যাঠতুতো, খুড়তুতো ভাই ও তাদের ছেলেমেয়ে। এ-ছাড়া থাকে পনের কুড়ি জন ছাত্র, তারা এই কবিরাজ বাড়িতে টোলে পড়ে। একসঙ্গে সকলের রান্না হয়। এই বাড়ির কর্তা যিনি, তিনি সকলের বড় ভাই। তারই সবচেয়ে রোজগার বেশি। অন্যেরা তার অন্নেই মোটামুটি প্রতিপালিত। তিনি দোর্দণ্ডপ্রতাপ, তার দুটি স্ত্রী। বড়র ছেলে হয় নি, তাই তিনি আবার বিয়ে করেছেন। এই কাজটির জন্য মা, কাকা এঁরা তার প্রতি বিমুখ। কিন্তু বাড়িতে অনেকেই আছে যারা বিমুখ নয় বা হলেও বলবার সাহস নেই, কারণ তিনিই প্রতিপালক।
পূজার সময় আমরা দু’চার দিনের জন্য বেড়াতে গিয়েছি—আমরা কলকাতায় থাকি, আমার বাবা খ্যাতিমান, বিত্তবান্ তাই আমাদের খুব আদর। পূর্ববঙ্গের এই রকম বর্ধিষ্ণুগৃহস্থ পরিবারে পূজার আয়োজন বিরাট-কতদিন থেকে প্রতিমা তৈরি হচ্ছে চণ্ডীমণ্ডপেনাড় বানানো হচ্ছে, খৈ ভাজা হচ্ছে, তিল কোটা হচ্ছে। গ্রামের জীবন বেশি দেখি নি, তাই আমি খুব উৎসাহিত এবং আমাদের সম্পর্কিত ভাই-বোনেরাও গর্বিত ও আনন্দিত, সিল্কের শাড়ি আর মখমলের চটিপরা একটি শহুরে ভগ্নী পেয়ে। যদিও দ্বিতীয় দিনই মখমলের চটি খুলে ফেলে আমি ওদের দলে ভিড়ে গিয়েছি। আমাদের বিরাট দল হয়েছে—আমরা ঘুরে ঘুরে বেড়াই। নৌকার দুধারে বাশবন, কোথাও বা বড় বড় বট অশ্বথের নিচু ডালগুলো লম্বা লম্বা জটার আঙ্গুল দিয়ে জল ছুয়ে থাকে—আমি যদিও এই প্রথম বড়িতে পূজা দেখছি এবং পূজা সম্বন্ধে কিছুই জানি না, তবু পূজার আয়োজন আমার খুব ভালো লাগছে। দিনগুলিকে যেন অলঙ্কার পরান হচ্ছে। কত রকম খুঁটিনাটি উৎসবের আয়োজন—“আনন্দময়ীর আগমনে আনন্দে গিয়েছে দেশ ছেয়ে” সত্যি বলতে কি পূর্ববঙ্গের ঐ গ্রামের পূজামণ্ডপের সামনে আমি কোনো কাঙালিনী মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি নি। সকলেই খুশীতে ভরপুর।
প্রথম দিন যে-ঘটনার তাল কাটল সেটা এই–টোলের বারান্দায় অনেকে বসেছিলেন। আমি একে একে সকলকে প্রণাম করছি, একজন শ্বেতশ্মশ্রু সৌম্যদর্শন বৃদ্ধকে দেখে আমি তাঁকে প্রণাম করতে যেতে তিনি প্রায় লাফিয়ে উঠলেন, এবং বাধা দিলেন তো বটেই, অন্যেরাও বললেন, “ওঁকে প্রণাম করতে হবে না, উনি মুসলমান।” আমি তো স্তম্ভিত, এত অভদ্রতা কেউ করতে পারে! জ্যাঠামশায় যেন আমার অপরাধের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী, “ছেলেমানুষ কিনা, কিছু জানে না।” আমার সবচেয়ে দুঃখ হল যে বাবাও কিছু বললেন না। পরে একলা পেয়ে যখন বললাম—একি অভদ্রতাবাবা বললেন, “তুই ঠিকই করেছিলি, বয়োজ্যেষ্ঠকে প্রণাম করবি, জাত দিয়ে কি হবে?”
“তবে তুমি চুপ করে রইলে কেন?”
“বড়দাদা রয়েছেন–উনি বলছেন, তাই কি বলা যায়।”
এখন মির্চার কথা যত ভাবছি এসব মনে পড়ছে। বাবা যদি বুঝতেও পারেন কোন্ কাজটা ঠিক, বাবা পারবেন না করতে, এইসব আত্মীয়স্বজন যাদের সঙ্গে আমাদের কোন মনের যোগ নেই, যারা আমাদের অর্ধেক কথা বুঝতেই পারে না, তারাও প্রবল বাধা হয়ে উঠবে। মেজ জ্যাঠামশায় দেশ থেকে চলে আসবেন—“ও নরেন, এ মহাপাতক করিস ‘না, চৌদ্দ পুরুষ নরকস্থ করিস না, করিস না।”
প্রতিমার পিছনে চালচিত্র আঁকে নসু, একদিন দেখি, সে একটা মাঝারি গোছের মহিষ এনে গাছতলায় স্বাধছে।
“এটা কি হবে?” আমি যদিও বুঝতে পেরেছি, ভালোমতই বুঝতে পেরেছি কি হবে।
তবু জিজ্ঞাসা করছি, আমার কষ্ট হচ্ছে, বুকের ভিতরটা মোচড় দিচ্ছে।
“অষ্টমীর দিন মার কাছে বলি হবে, আটটা পঁঠা আর একটা মহিষ।”
“কে বলি দেবে?”
“আমি। আমি ছাড়া আর কে এক কোপে কাটতে পারবে?”
“নসু, তোমার লজ্জা করছে না একটা অসহায় জীবকে এক কোপে কাটবে, তার বড়াই করছ—এটা কখনো ধর্ম হতে পারে?”
