“সে কি কথা মির্চা, সূর্যকে কি কেউ ভুলতে পারে?”
“সূর্য! মানুষ কি করে সূর্য হবে?”
“তুমি যখন বাংলা ভাষাটা শিখবে তখন তুমিও বুঝবে মানুষ সূর্য হয় কিনা।”
আমি মনে মনে বলছি, তোমাকে আমি সূর্য দেখাবই—যদি তা পারি তবে আমরা দুজনে এক সঙ্গেই সূর্যোপাসক হব।
এখন দুটো কাজ নিয়ে আমরা খুব ব্যস্ত, কাকার বিয়ে হবে আর আমার বই ছাপা হবে। কাকা নিজেও খুব বিয়ের জন্য উদগ্রীব, মেয়ে দেখেই তার পছন্দ হয়েছে—যদিও মার হয়নি। তবু যাইহোক বিয়ে ওখানেই হচ্ছে। এই সময় থেকে মির্চা নিয়মিত ধুতি পাঞ্জাবী পরতে শুরু করেছে। ধুতী পাঞ্জাবী পরলে ওকে যে কি সুন্দর দেখায়। সে কথা অবশ্য আমি ওকে বলি নি। কেন বলব? সে যে বলে আমি সুন্দর কিনা তা বোঝে না। এটা একদম বাজে কথা নিশ্চয়ই, কারণ আমার হাতে যথেষ্ট প্রমাণ আছে। এই যেমন মির্চা আসবার কিছুদিন আগে আমার মাসতুতো দিদি সীতার বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল এক জমিদার-নন্দনের সঙ্গে। আমাদের বাড়ি থেকে মেয়ে দেখান হল। ছেলের আত্মীয়স্বজন এসে মেয়ের চুল খুলে, রঙ পরীক্ষা করে দেখল, গানও শোনাতে হল। যদিও তার হারমনিয়াম পিটিয়ে গান শুনে তাদের পালানই উচিত ছিল, তা পালায় নি—তাদের পছন্দ হল। তারা বললে, সব যখন ঠিকই হয়ে গেছে এবার ছেলে এসে মেয়ে দেখুক। ছেলে আধুনিক, মেয়ের সঙ্গে আলাপ করতে চায়। মেয়ের মাও আধুনিক। তিনি বললেন, ছেলে আসুক, সকলের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হোক। আমাদের কি রকম কালচার্ড পরিবার তার পরিচয় পাক। ছেলে এল, তার নাম মৃগাঙ্ক। খুব ফর্সা, জমিদারপুত্রের উপযুক্ত নধর চিক্কণ চেহারা। সাধারণভাবে সুন্দর বলা চলে। মার ইচ্ছা ছিল না আমি তার সামনে বের হই— কিন্তু কনের মা বললেন তাতে কি হয়েছে, বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে এখন শালী সম্পর্কিত মেয়েরা না বেরুলে জমবে কেন?
মা তো আর বলতে পারেন না তোমার মেয়ের চেয়ে আমার মেয়ে দেখতে ভালো, যদিই গোলমাল হয়ে যায়। কাজেই মৃগাঙ্ক এল! দুদিন খাওয়াদাওয়া সিনেমা দেখা হল। খুব হৈচৈ করলাম আমরা। আমি তো ধরেই নিয়েছি দিদির সঙ্গে তার বিবাহ হবে, তাই শ্যালীকাজনোচিত ব্যবহার করেছি, হেসেছি ও হাসিয়েছি। তারপর মৃগাঙ্ক উধাও হয়ে গেল। তার হোস্টেলে খোঁজ নিয়ে জানা গেল দেশে চলে গেছে। দেশ থেকে তার বাবা জানালেন মৃগাঙ্ক বিলেত যাচ্ছে ব্যারিস্টারী পড়তে, এখন কিছুতেই বিয়ে করতে রাজী হচ্ছে না। অনেক জল্পনা-কল্পনা চলেছিল যে হঠাৎ এরকম মত পরিবর্তনের কারণ কি হতে পারে। যাহোক মাসীমা বলেছিলেন, এরকম চঞ্চলমতি ছেলের সঙ্গে বিয়ে না হয়ে ভালোই হয়েছে। আর এখন শুনছি, কয়েকদিন আগে বাবার কাছে বিলেত থেকে সে প্রস্তাব পাঠিয়েছে আমায় বিয়ে করতে চায়। বাবা মা সকলেই অসন্তুষ্ট, তখনই দিদিকে বলেছিলাম—রু’কে বের করব না। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে এরকম কখনো ভালো! বাবা বললেন, বেশী ফরওয়ার্ড হতে গেলে এমনি দশা হয়। আর দিদিমা বললেন, একজনকে দেখতে এসে আর একজনের দিকে অন্য দৃষ্টিতে যে দেখে সে চরিত্রহীন। তার সঙ্গে বিয়ে হতেই পারে না। চুকে গেল।
কিন্তু এই গল্পটা আজ যদি ওকে বলি তাহলে কি হয়?
হাঃ হাঃ, হাঃ হাঃ তাহলে কি হয়? ভীষণ মজা হয়। আমি খুব গম্ভীরভাবে ওকে বলতে পারি, “দ্যাখো তুমি তো দেখতে পাওনা আমি সুন্দর কিনা।” তখুনি ও কাতরভাবে তাকাবে, আমি লক্ষ্য করেছি কিছুদিন থেকে কথাটা ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা করছে তা আমি হতেই দেব না, বলেছে একবার যখন হয়ে গেছে ব্যাস! তারপর আমি বলব “দেখ মৃগাঙ্ক দেখতে পায়!” গল্পটা শুনলে ওর কি হবে তা আমি জানি।
“কৈ তুমি কোন দিনও এর কথা আমায় বলনি?”
“ওমা, বলবার আবার কি আছে!”
“কি সিনেমা দেখতে গিয়েছিলে?”
খুব উদাসভাবে বলব—“কি জানি অত মনে নেই।”
হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ খুব মজা লাগছে। ওর ঈর্ষাটা আমার এতো ভালো লাগে। ঈর্ষা আবার ভালো নাকি! খুব খারাপ। ঈর্ষার কারণে তার বর্ণ হলো কালো কিংবা ‘ঈর্ষা বিষময়ী ভুজঙ্গিনী। আরে দুর এ সে রকম ঈর্ষা নয়। এটা প্রেম এটা ভালোবাসা। ঈর্ষার ছোট্ট পাখীটাই তো আমার ঘুম ভাঙ্গিয়েছে। সেই পাখীটা এক ডাল থেকে আর এক ডালে, একদিন থেকে অন্যদিনে ফুরুৎ ফুরুৎ করে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে আর আমায় ডাকছে, ‘সখী জাগো, সখী জাগো—মম যৌবন নিকুঞ্জে গাহে পাখী।’….
আচ্ছা আমার ঈর্ষা হয় না কেন? ওতো কত কিছু বলে—সেই যে রিপণ স্ত্রীটে ও থাকত, সেখানকার মেয়েরা ওকে কি রকম পছন্দ করে—ওর পিছনে লেগেই ছিল, ওকে একদিন বালিশ ছুঁড়ে মেরেছিল—কত কি, ও সব আমার এক কান দিয়ে ঢেকে অন্য কান দিয়ে বেরিয়ে যায়। শুনতেই ইচ্ছা হয় না—অবশ্য ঈর্ষা হবে কি করে, ওতো ওদের ঘৃণা করে, সেই জন্যই তো পালিয়ে এসেছে, কাজেই আমার এমন কিছু মহত্ব নেই! ও অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ানদের কথা যা বলে শুনে তো অবাক হয়ে যাই। ওদের সকলেরই ধারণা তারা ইংরেজ, আমাদের প্রভু এবং বাঙালীরা অত্যন্ত নিম্নস্তরের জীব। পশু বললেই হয়। গ্যাণ্ডির উপর ওদের ঘৃণা এবং রাগ খুবই। ওরা নিজেরা অত্যন্ত অশ্লীল এবং অসভ্য, কিন্তু ওরা বাঙালীদের অসভ্য মনে করে। মির্চার ওখানে থাকতে রীতিমত কষ্ট হয়েছিল। সন্ত বম্ হয়েছিল ‘বিবমিষা’।
কি আশ্চর্য আমরা তো এই জাতটাকে চিনিই না। ওরা কোথায় থাকে কি করে, কেমন ওদের রীতিনীতি কিছুই জানি না। এক দেশে থাকি আমরা অথচ কেউ কাউকে জানি না। ওরা আমাদের সঙ্গে এক দেশে বাস করছে এবং চিরকাল আমরা একসঙ্গে থাকব তবু কেউ কাউকে চিনতেই পারব না। ওরা আমাদের সম্বন্ধে কত কুৎসিত কথা ভেবে রেখেছে, আর আমরা? আমি তো ওদের অস্তিত্বই খেয়াল করি নি। ওরা যে আছে, আমাদের সম্বন্ধে কিছু ভাবছে, এই বা কে লক্ষ্য করেছে? মির্চা না বললে কোনো দিনও আমার মনে পড়ত না যে অ্যাংলোইণ্ডিয়ান বলে একটা জাত আছে। ওদের সঙ্গে দেখা হয় ট্রেনে যাতায়াত করবার সময়, আর দূর থেকে রেলওয়ে কোয়ার্টারে ওদের দেখি। আমার কিন্তু ওদের খারাপ লাগে না—ওদের জানালায় পর্দা কেমন টান টান করে টাঙ্গায় বাঙ্গালীরা পর্দা টান করে টাঙ্গাতে পারে না। ওরা জানালায় টবে ফুল রাখে, বাগান করে—বাঙ্গালীরা করতে পারে না তবে ওরা আমাদের ঘৃণা করে খুবই ঘৃণা করে, মির্চা বললেও জানি ওরা আমাদের সঙ্গে ট্রেনে এক কামরাতেও চড়বে না। আর আমরা কি ওদের ঘৃণা করি না? খুব করি! বর্ণসঙ্কর কথাটা কি ভালো? ওরা আমাদের জানে না, তাই যদি জানত তাহলে ঘৃণা করত না। আমি যদি ঐ মেয়েদের সঙ্গে মিশতে পারতাম, তাহলে কখনো আমাকে ঘৃণা করত না। আজ পর্যন্ত আমায় কেউ ঘৃণা করে নি। ঐ যে ছেলেটা মাঝে মাঝে মির্চার কাছে আসে, একবার ওর সঙ্গে ভাব করে দেখি কেমন ঘৃণা করে। ইস্—ঘৃণা করলেই হল। আমি যদি বলি, মির্চা ওর সঙ্গে একটু আলাপ করিয়ে দাও তো, ও আমায় ঘৃণা করে কি না পরীক্ষা করে দেখব। তাহলে কি হয়? হাঃ হাঃ হাঃ পাখী ডাকবে আবার—‘মম যৌবন নিকুঞ্জে গাহে পাখী।’…
