সত্যি বলতে কি ‘মহুয়া’ও সবটা বুঝি না—মহুয়ার ‘মায়া’ কবিতাটির মধ্যে বাবা বলেন একটা গভীর দার্শনিক তত্ত্ব আছে, আমাকে বুঝিয়েও দিয়েছেন। কিন্তু আমি এখন দার্শনিক তত্ত্বে মন দিতে পারছি না। কবিতা এখন আমি অন্যভাবে বুঝছি। এত ভালো করে কোনদিনও বুঝি নি। প্রতিদিন নূতন করে বুঝছি কিন্তু মহুয়ার ঐ কবিতাটা, ‘এই ক্ষণটুকু হোক সেই চিরকাল’ আমি বুঝতে পারছি না। এই ক্ষণটুকু চিরকাল হতে যাবে কি দুঃখে? চিরকালই বা পাব না কেন? বরং এটা বুঝতে পারি আমরা দুজনা স্বর্গ খেলনা গড়িব না ধরণীতে’—সেদিন মির্চাকে শুনিয়েছি। ওর খুব ভালো লেগেছে।–
আমি ওর দিকে দেখছি—ওর মুখ চোখ কেমন যেন অন্যমনস্ক, কি ভাবছে কে জানে—আজ যদি ও আমাকে হুইটম্যান শোনাতে চায় শুনবই না। সেদিন তিনটে কবিতা শুনিয়েছে, কবিতা না চ্যালাকাঠ।
কিন্তু মির্চা আজ সাহিত্য ভাবছে না। বাংলা পড়বারও ইচ্ছে নেই। সিগারেটটা নিবিয়ে অ্যাশট্রেতে গুজে দিয়ে ও আমার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকাল। তারপর চশমাটা খুলে চশমা মুছল—আমি ওর চশমাবিহীন চোখ দেখতে পাচ্ছি। চশমা খুললে আমার ভারি ভয় করে, ওর দৃষ্টিটা বদলে যায়—অন্য লোক মনে হয়। “চশমা খুললে আমি সহ্য করতে পারি না কেন মির্চা?”
“আমার যে মাইওপিয়া।”
ওর চোখের জন্য আমার খুব ভয়, কি জানি অন্ধ হয়ে যাবে নাতো! ও বললে, “একটা কথা বলছি শোনো, তুমি আমায় বিয়ে করবে?”
আমার বেশ হাসি পাচ্ছে—একে প্রপোজ করা বলে–ইংরেজি গল্পের বইতে পড়েছি। অতদূরে বসে করে না মোটেই হাঁটু গেড়ে বসে হাত ধরে করতে হয়। যা কিছু হল না। সাত হাত দূরে বসে “তুমি আমায় বিয়ে করবে?” আহা রে!
এ-ঘরের সামনের দরজাটা তো বাড়িতে ঢুকবার পথের উপর খোলা। এখান দিয়ে সর্বদা লোক যাতায়াত করছে। পর্দা নামে একটা পদার্থ ঝুলছে বটে, তবে সেটা ন্যূনতম, সেটা থাকাও যা না থাকাও তাই কাজেই, নিরুপায়!
পিয়ানোর উপর ওর বোনের একটা ছবি আছে, সুন্দর মেয়ে—আমার ওর সঙ্গে ভাব করতে ইচ্ছে করছে। মির্চা ওর বোনকে সবচেয়ে ভালোবাসে। ও বললে, “আমি আমার মাকে বোনকে তোমার কথা সব লিখেছি—ওঁরা খুব খুশি হবেন। তোমার কোনো অসুবিধা হবে না আমার বাড়িতে।”
এইবারে আমার বুকের ভিতরটা কাঁপছে। একটা কাগজ আর পেনসিল পড়েছিল সেটা নিয়ে আমি হিজিবিজি লিখছি। আমি কি উত্তর দেব?
“বলো, বলো, আমায় বিয়ে করতে তোমার কোনো আপত্তি নেই তো? কথা বলছ না কেন?”
“আমার কথায় কিছুই হবে না মির্চা, বাবা কখনো রাজি হবেন না?”
ও বিষম আশ্চর্য হয়ে গেছে! “ওরা রাজি হবেন না? ওরা তো রাজি আছেনই।”
“কি করে জানলে?”
“ওরা আমাকে এত ভালোবাসেন, এত আপন করে নিয়েছেন কেন তবে?”
“বাঃ তাতে কি হয়েছে, তাই বলে তোমার সঙ্গে বিয়ে দেবেন এমন কথা নেই।”
“অমৃতা, তোমার নিজের কথা বলো, ওদের কথা পরে হবে, তোমার বাধা কোথায় আমি শুনতে চাই।”
এই দ্যাখো আবার আমায় অবিশ্বাস করছে—আমি মনে মনে বলছি অবিশ্বাস করো না তুমি, এই মুহূর্তে নয়—“ত্বমসি মম জীবনং, ত্বমসি মম ভূষণং, ত্বমসি মম ভবজলধিরত্নং’-মুখে বলতে পারছি না, কিছু বলতে পারছি না, না। আমি মাথা নিচু করে কাগজে লিখে যাচ্ছি হিজিবিজি—“শোনো অমৃতা, আমি তোমায় বলছি আমি তোমাকে তোমার প্রিয়জনের কাছ থেকে নিয়ে যাব না, আমি এখানেই থাকব। ইউনির্ভাসিটিতে একটা দেড়শ টাকা মাইনের লেকচারার-শিপ নেব—আর কিছুই চাই না—ওতেই বেশ চলে যাবে।”
“মির্চা আমার বাবা কখনো রাজি হবেন না, কখনো নয়।”
“কেন আমি ক্রিশ্চান বলে? আমার গায়ের রঙ সাদা বলে?”
“কেন তা জানি না, তবে তুমি বিদেশী বলেই নিশ্চয়।”
“তুমি কি বলতে চাও, প্রফেসর জাত মানেন? দার্শনিকের কাছে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খৃস্টান আছে?”
“খুব আছে।” আমি কাগজে লিখছি—তুমি আমর এত কাছে এলে কেন, কেন, কেন? কোথা থেকে এলে, কেন এলে?
ও বলছে, “তাই যদি হবে তাহলে ওরা তোমাকে আমার সঙ্গে এরকম ছেড়ে দিলেন কেন? সব সময় একসঙ্গে আছি—”
“তাতে কি হয়েছে? ভাইবোনের মত কি মেশা যায় না–? আমরা যে পারলাম না সে তো আমাদেরই দোষ।”
“সে কি!” ও বিস্মিত, মর্মাহত। যেন এমন কথা জন্মে শোনে নি। আমার রাগ হচ্ছে, ক্যাটালগ করতে দেওয়া মানেই কি বাগদান নাকি? ওঁর সঙ্গে মিশতে দেওয়ায় অন্যায়টা কি হল? ও বার বার আমায় জিজ্ঞাসা করছে আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি কিনা এবং কাকে প্রথম ভালোবেসেছিলাম।
“গাছকে, গাছকে একটা ছাতিমগাছকে।” এ আবার কি কথা! যদিও আগেও বলেছি তবু এরকম অদ্ভুত কবিত্ব ও বুঝতে পারে না। ও খুব গম্ভীর হয়ে গেছে। আমার হাতের কাগজটা হিজিবিজি লেখায় ভরে গিয়েছে। মহুয়ার মলাটে শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামটা লেখা ছিল—আমাদের তখন অভ্যাস ছিল ওর হাতের লেখা নকল করা। সবাই করত, আমিও করছি—ও উঠে দাঁড়িয়ে দেখল।
“তুমি এখানে এঁর নাম লিখছ কেন? এর কাছ থেকে মত আনতে হবে, তুমি আমায় ভালোবাসবে কিনা তার জন্য অন্যের অনুমতি চাই?”
“দেশসুদ্ধ লোক ওর হাতের লেখা নকল করে, তার মানে ও নয়।”
“দেশসুদ্ধ তোক একজন লোকের হাতের লেখা নকল করে? দেশসুদ্ধ লোক কি পাগল হয়ে গেছে!”
আমি উঠে পড়েছি, চলে যাই। আমার খুব ওর কাছে যেতে ইচ্ছে করছে ওর কাধে মাথা রাখতে ইচ্ছে করছে, তা যদি পারতাম তাহলে এই মুহূর্তে ওর মনে যে দুঃখটা হয়েছে তা চলে যেত। কিন্তু তা সম্ভব নয়। আমি চৌকাঠে পা দিয়েছি ও বললে, “অমৃতা আমার একটা কথা শোনো, একটা কথা, রবিঠাকুরকে ভুলে যাও।”
