কিন্তু শান্তি একজনকে ভালোবাসে—সে ওর মার বাড়ির কাছেই থাকে—তার পায়ের শব্দের জন্য শান্তি কান পেতে থাকে। কিন্তু সে এ বাড়িতে আসে না। মা কিছুতেই এটা বরদাস্ত করবেন না। তার স্ত্রী আছে, সে বিবাহিত। শান্তির জীবনের এ সমস্যার কোনো সমাধান নেই।
তাই আমি ভাবছি, শান্তির চোখে জল দেখলাম কেন? ও এত কষ্ট পেয়েছে যে ওর চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে। একটা শঙ্কা আমার বুকের ভিতর গুরগুর করে উঠল। আর তখুনি গুনগুন করল একটা গানের কলি—‘শঙ্কিত চিত্ত মোর, পাছে ভাঙ্গে বৃন্ত ডোর…আচ্ছা রবিঠাকুর এত জানলেন কি করে? তারও নিশ্চয় এরকম হয়েছিল—এরকম মানে—মির্চার মতো, আমার মতো নয়, আমি তো মেয়ে—! বাঃ! এ তো মেয়েদেরই, কথা, শরম রক্তরাগে, তার গোপন স্বপ্ন জাগে’—এ তো ছেলের কথা নয়, ‘শরম’ ‘ভরম’ এসব তো মেয়েদেরই ব্যাপার। তাহলে কোনো মেয়ে ওকে বলেছিল, কে সে হতে পারে? বইগুলো খুঁজে খুঁজে দেখতে হবে। ছিঃ, গুরুজন সম্বন্ধে বাজে কথা ভাবতে নেই।
আমি আয়নার সমানে দাঁড়িয়েছি, আমার আঁচল খসে গেছে—আমার নাচতে ইচ্ছে করছে। আমি হাততালি দিয়ে দিয়ে ঘুরছি—
যৌবন সরসী নীরে, মিলন শতদল,
কোন চঞ্চল বন্যায়, টলমল টলমল—
এই গানটা কিছুদিন আগে প্রেসিডেন্সী কলেজে সুশীল দে-কে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতে শুনেছিলাম। কী ভালো লেগেছিল! কতবার ভেবেছি ঐ ভদ্রলোকের কাছে আর একবার শুনলে হতো, তা কি করে হবে? বাবাকে কি বলা যায় তোমার ছাত্রের কাছে ঐ গানটা শুনতে চাই আমি। অবশ্য বললে কি হতো? কিছুই হতো না। বাবা বেশ গর্বভরেই বলতেন, “ও সুশীল, আমার মেয়ে তোমার কাছে একটা গান শুনতে চায় তুমি একবার আমাদের বাড়ি এস!” যা হোক আমি তা বলি নি। আর তাছাড়া গানটা তখন ভালো করে বুঝিই নি। এখন বুঝছি, প্রত্যেক দিন এক একটা গান বা কবিতা আমার মনে বা শরীরে অর্থবান হচ্ছে। শরীরেও? শরীর কি গানের অর্থ বোঝে? নিশ্চয়ই। এই গানটা তো আমার শরীরেই অর্থ পাচ্ছে। তাই তো আমার নাচতে ইচ্ছে করছে টলমল, টলমল, টলমল—আমি ঘুরছি, ঘুরছি, ঘুরছি। শান্তি ঘরে ঢুকে আয়নার সামনে টুলটায় বসল। ওর সুন্দর বাকা যুগল ভুরুর মাঝখানে সিঁদুরের টিপ জ্বল জ্বল করছে, আমার সিঁদুর পরতে ইচ্ছে করছে। আমি ওর মুখটা আমার দুহাতে ধরে গান করলাম—
“তারই গন্ধ কেশর মাঝে একবিন্দু নয়ন জল টলমল টলমল,—ও শান্তি যৌবন সরসী নীরে মিলন শতদল কি তা তুই জানিস?”
“ক্ষেপে গেলে নাকি?”
“আমার নাচ শিখতে ইচ্ছে করছে। শান্তিনিকেতনে রবিঠাকুর মেয়েদের নাচ শেখাচ্ছেন।”
“যাও না শেখ।”
“তাহলেই হয়েছে।” বাবা আমাকে ছাড়বেন? বাবা আমাকে কোথাও যেতে দেবেন। আমি এখানে বন্দী, অবশ্য স্নেহে বন্দী কিন্তু কোনো বন্দীদশাই সুখের নয়। একবার রবীন্দ্রনাথ আমাকে বলেছিলেন, “তোমার বাবার কাছ থেকে তোমাকে আমি কয়েক মাসের জন্য ধার নেব। আমি মালিনী নাটকের জন্য কাউকে খুঁজছি। তুমি পারবে। মালিনীর মতো তোমার মনের আকাশ আছে।”
“মনের আকাশ” এমন একটা কথা এই প্রথম শুনলাম, এর আগে আকাশ আকাশেই ছিল, ঐ কথাটা শোনা মাত্র তা মনে নেমে এল, তার সমস্ত নীল রঙ নিয়ে ছড়িয়ে গেল। কি যে এক অনির্বচনীয় আনন্দে মন ভরে গেল। উনি কথার যাদুকর, কথা দিয়েই উনি আকাশে মেঘ জড়ো করে অলকানন্দা নামাতে পারেন, মল্লারের দরকারই হয় না। কিন্তু বাবা আমাকে ছাড়লেন? তিনি বললেন, “নাটক থিয়েটার করেই জীবনটা কাটাও আর কি। ছাত্ৰানাম্ অধ্যয়নং তপঃ।”
“দেখ শান্তি, আমার যখন বিয়ে হবে, আমি যখন স্বাধীন হব তখন আমি সাবিকে আমার বাড়ি নিয়ে নাচ শেখাব। কেউ আটকাতে পারবে না।”
আমার ধারণা বিয়ে হলেই সবাই স্বাধীন হয়। অবশ্য শান্তির মত বিয়ে হলে নয়। কিন্তু কে স্বাধীন? আমার মা কি স্বাধীন? একটুও নয়। আচ্ছা আমার কি রকম বিয়ে হবে? মির্চা! মির্চা! না, না, কখনো হবে না। বৃন্তডোর ভাঙ্গবেই। আমি শান্তির গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম। ও খুব অবাক হয়ে গেছে, “কাদছ কেন ভাই, নাচ শিখে কি হবে? নাই বা শিখলে?”
“সে জন্য নয়, আমার মন কেমন করছে। ভীষণ মন কেমন করছে।”
১.৪ বড় টেবিলল্যাম্পটা জ্বলছে
বড় টেবিলল্যাম্পটা জ্বলছে, তার ঘেরাটা সাদা গোল একটা বড় পাত্রের মত। এক পাশে বেতের সোফাটার উপরে আমি হেলান দিয়ে বসেছি। অন্য পাশে খাটের উপর মির্চা বসেছে। ওর পাটা ছড়িয়ে দিয়েছে। এই ভঙ্গীতে ওর পাটাই আমার বার বার মনে পড়ে। আমার ওর পাটা একটু ছুঁতে ইচ্ছে করছে—পা দিয়ে নয় হাত দিয়ে। ইস্ ওর পায়ে আমি হাত দিতে যাব কেন? অত কিছু বড় নয়। আর তাছাড়া ওই তো আমার পায়ে ধরবে—আমি যদি রাধার মত মুখভার করে ঘাড় বঁকিয়ে বসি তাহলে ও আমার পায়ে ধরবে, ‘দেহি পদপল্লব-মুদার—এটা হলে বেশ হত! সত্যি সত্যি রাগ তো আর হচ্ছে না, ঐ কবিতাটার জন্যই ভাবছি। গীতগোবিন্দ পড়ে এই রকম একটা ছবি ভেসে ওঠে। রাধা ঘাড় ফিরিয়ে বসে আছে আর কৃষ্ণ পায়ের কাছে নত। কৃষ্ণের রঙ কালো নয়, সাদা। আমাদের বামুনঠাকুরণ গান করছেন—‘মান করে থাকা আর কি সাজে! এখন জয়দেব পড়ছি। নীল রঙের মলাটে পূর্ণ চক্রবর্তীর আঁকা ছবি দেওয়া বাংলা অনুবাদসহ একটা বই উপহার পেয়েছি। বাংলা অনুবাদটা পড়ি না অবশ্য, দরকার কি এমন কবিতা পড়ে? গীতগোবিন্দ অমনিই বোঝা যায়। যদিও সবটা বুঝি না। যেমন ‘স্মরগরলখণ্ডনং,—গরল কি? গরল আবার কোথায় প্রেমের মধ্যে?
