আমরা বই সাজাচ্ছিনাম লেখা হচ্ছে কার্ডে-বাক্সে কার্ড ফেলা হচ্ছে। আমরা কাজ করে যাচ্ছি, নীরবে। আমি আড়চোখে ওকে দেখছি—ওর হাতটা একটু একটু কাঁপছে—ওর ভিতরে কি হচ্ছে কে জানে। তারপরে? তারপরেই কি? জানি না কোন দিন। কোথায়? কোন ঘরে আমি দেখতে পাচ্ছি না, আমি দেখছি একটা গরাদ দেওয়া বড় জানালা—আর তার সামনে আমরা—আমি হঠাৎ দেখলাম আমি ওর ভুজবন্ধনে আর ওর মুখ আমার মুখের উপর নেমে আসছে—আমি চেষ্টা করছি নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে; যুদ্ধ করছি, কেন যুদ্ধ করছি কে জানে? জানি না, পরাজিত হবার জন্যই নিশ্চয়। শুচিতা রক্ষা করবার জন্য নয়, কখনো নয়। আমি পরাজিত হলাম। মির্চা আমার মুখের উপর তার মুখ রাখল। নরম মধুর স্পর্শে আমার মুখটা খুলে গেল, আমি মুখের ভিতর তার মুখের স্পর্শ পেলাম। আমার সারা শরীর গান গেয়ে উঠেছে তবু আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে, আমার ঐ রকমই—কোনটা যে হৰ্ষ কোনটা বিষাদ বোঝা যায় না।
ও কোথা থেকে এত আনন্দ নিয়ে আসতে পারে? কি করে এরকম হয়? আমি যা শুনেছিলাম, আরাধনা আমায় যা বলেছিল, এ তার থেকে অনেক ভালো। অবশ্য শুনে কিছুই বোঝা যায় না। পড়েও না। এরকম সবাই জানে কি—এইসব প্রশ্ন আমার মনে আসছে, মন কানায় কানায় ভরে গেছে—একটুও পাপবোধ নেই—আর আমার পাপ হবেই বা কেন? আমি তো কিছু করিনি—আমি তো বাধা দিয়েছি—মির্চার পাপ হয় তোক। ওদের দেশে এতে পাপ হয় না। ও যে সব গল্প করেছে তাতে আমি বুঝতে পেরেছি। ও আমায় ছেড়ে দিয়েছে, আমি চুল ঠিক করে নিচ্ছি, বিস্রস্ত আঁচল গুছিয়ে নিচ্ছি। মনের ভিতর গুনগুন করছে—“আমার প্রাণের ভিতর সুধা আছে চাও কি?
“রু রু রু—”
“যাচ্ছি মা–”
আমার শরীর হালকা হয়ে গেছে, আমি হাঁটতে পারছি না, উড়ে যাচ্ছি—দুধারে আমার বিস্রস্ত কেশভার ডানার মতো হয়ে গেছে—মনের ময়ূর নাচছে। আমি সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছি—-“উল্লাস উতরোল বেণুবন কল্লোল, কম্পিত কিশলয়ে মলয়ের চুম্বন।’…
হঠাৎ তাকিয়ে দেখি, সিঁড়ির উপর শান্তি আমার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, সে চোখে ঈর্ষা নয়, না-না, নিন্দাও নয়, আছে শুধু সন্ প্রত্যয় জ্ঞা ধাতুর উত্তর জিজ্ঞাসা, জিজ্ঞাসা, জ্ঞানের ইচ্ছা। কিন্তু ভয়ে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা, ‘কম্পিত কিশলয়’ স্তম্ভিত হয়ে গেছে—‘মলয়ের চুম্বন’-ও মলয় বাতাসে কোন গর-ঠিকানায় চলে গেছে কে জানে। কিন্তু সাহস দরকার, ভয় পেলেই বিপদ। তাই নির্বিকার মুখে বললাম, “কি দেখছিস হাঁ করে?”
“হাঁ করে কি দেখছি? কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”
চোরের মার বড় গলা। আমি খুব দর্পিত ভঙ্গিতে বললাম, “তুমি জান না? ক্যাটালগ করছি না?”
শান্তি স্থির চেয়ে রইল—এবার আর জিজ্ঞাসা নয়, কেমন যেমন উদাস, ওর চোখে কি জল?
শান্তি আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়, আমি যোল পূর্ণ হয়ে সতরতে পড়ব, ও তাহলে একুশ পূর্ণ হয়ে বাইশে। ও দেখতে ওর দাদা খোকারই মতো, ওর’মুখ চওড়া—নাকও তাই, বিশেষ কিছু সুন্দর নয়—শুধু ওর দুটি উজ্জ্বল চোখের উপরে বাকা ধনুকের মতো দুখানি ভুরুর রেখা ছাড়া। ও খুব কথা বলে, হাসি খুশি মেয়ে। ওরা বরাবর গরীব। খুবই গরীব। ওর দাদা আর ও দুজনেই আমাদের বাড়িতেই থাকে। লেখাপড়া সামান্যই জানে—শেখবার সুযোগ পেল কোথায়? নয় বছর বয়সে তো বিয়েই হয়ে গেল পূর্ববঙ্গের কোনো গ্রামের একটি উনিশ বছরের ছেলের সঙ্গে। ছেলেটির নাম রমেন। উনিশ বছরের ছেলে এক বছর পরেই কুড়ি হল, আর এক বছর পরেই একুশ, তখন তার পূর্ণ যৌবন। কিন্তু শান্তি তো দু বছরে মাত্র এগার বছরের হয়েছে। তাও খুব ছোটখাট ছেলেমানুষ ছিল। কাকা বলেন, রমেন ভেবেছিল ঘুম ভেঙেই দেখবে তার বৌ একটি প্রমাণ সাইজের মেয়ে হয়ে গেছে—তা যখন সে হতে পারে নি তখন সেটা তার বৌয়েরই দোষ! সেই মহা অপরাধের সাজা দেবার জন্য রমেন একটি প্রমাণ সাইজের মেয়ে বিয়ে করে আনল। এ মেয়েটি শুধু বড় নয়, সুন্দরীও। কাজেই শান্তি তার স্বামীর বাড়িতে দাসী হয়ে গেল। ওর কাজ ছিল শুধু ঐ দুজনের সেবা করা। ওর স্বামীর খাট থেকে নেমে ওকে মাটিতে শুতে হল। ওরা দুজনে মশারী ফেলে শুয়ে থাকবে আর শান্তি বেচারা বসে তাদের পা টিপে দেবে। একটু এদিক ওদিক হলে ওরা লাথি মারবে। শান্তি বলে, “পা টিপতে তত আপত্তি ছিল না, না হয় স্বামীর পা টিপলুমই কিন্তু ভাই ফরিদপুরের গ্রামের মশার কামড়!” এরকম আর কতদিন চলে, কতই বা মানুষ সহ্য করতে পারে। অবশেষে শান্তি একদিন বিষ খেল, অবশ্য মরল না। ওদের প্রতিবেশীরা খবর দিতে থোকা ওকে গিয়ে নিয়ে এসেছে। শান্তির মা, যিনি আঠারটি সন্তানের জননী, তিনি শান্তিকে তাঁর সেই দুবৃত্ত স্বামীর ঘরেই ফেরৎ পাঠাতে চান। বলেন, শত হোক স্বামীর ঘরই মেয়েমানুষের ঘর। আমার মা এই শুনে তাড়াতাড়ি ওকে নিয়ে এসেছেন। শান্তির মা বলেন, “বৌঠান তুমি যে ওকে স্বামীর ঘরে যেতে দিচ্ছ না, যুবতী মেয়ে একলা থাকবে কোথায়? সারাজীবন ওর ভরণপোষণই বা করবে কে?” মা বলেছেন, “চিন্তার কোনো কারণ নেই, ও আমাদের বাড়িতে থেকে নার্সিং পড়বে। ওকে আমি নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে দেবই।”
পরের বিপদে সাহায্য করার ব্যাপারে মা একলাই একটা ইনস্টিট্যুশন। কত লোককে সাহায্য করেছেন তার কোন হিসেব নেই। খোকাও এ বাড়িতে থেকে টাইপিং শিখছে কিন্তু শান্তি আর খোকা এক নয়। শান্তি উদয়-অস্ত পরিশ্রম করে তার অন্নের ঋণ শোধ করে। সকলেই ওর উপর হুকুম করে, আমিও। “শান্তি এক গ্লাস জল দে তো” বলতে কারু লাগে কি কোনো বাধা? কিন্তু খোকা? ও হাসাতে পারে। তাছাড়া কোন কাজ ওকে দিয়ে হবার জো নেই। বাবা ওকে দুচোখে দেখতে পারেন না। ও পারতপক্ষে বাবার সামনে আসে না। বাবা যদি পারেন তবে ওকে বাড়ি থেকে এখনই বের করে দেন কিন্তু মার জন্য পারেন না। মা কাউকে তাড়াবেন না। আর এ সংসারে নিঃসন্দেহে তিনিই কী। শান্তি বেচারীকে স্বামী থেকেও বিধবার জীবন যাপন করতে হবে। সেজন্য মার খুব দুঃখ। তবে পুরোপুরি বিধবা নয়, ও সিঁদুর পরতে পারে, পাড়ওয়ালা কাপড় পরতে পারে, দুবেলা ভাত তো খেতে পারেই, মাছও খেতে পারে। কিন্তু বিয়ে আর ওর হবে না। হিন্দুর মেয়ের স্বামী মরলেই বিধবা হয় না। তো স্বামী থাকতে। কিন্তু মা যদি পারেন তবে ওর বিয়ে দেন। মা বলেন, “যদি কোনো উপায় থাকত তবে আমি শান্তির বিয়ে দিতাম-“ও তো কুমারীই—কিন্তু উপায় তো নেই।” বে-আইনি কাজ করলে রমেন এখানে এসে ধুন্ধুমার লাগিয়ে দেবে, অর্থাৎ ধুন্ধু দানবকে হত্যা করবার সময় যে রকম কোলাহল হয়েছিল সেইরকম কোলাহল করবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। লোক জড়ো করবে, থানায় যাবে, এসব সে পারে—এবং দু একবার সামান্য কারণে করেছে।
