যতীন লিখেছে যে সে পাগল হয়ে গেছে—তাই আরাধনার বাবা ছুটেছেন মেয়েকে ফিরিয়ে বা ছিনিয়ে আনতে এবং এনেছেনও। ঐ নির্বোধ কাণ্ডজ্ঞানহীন ছেলেমেয়ে দুটোকে যথোপযুক্ত সাজা দেবার ব্যবস্থাও হচ্ছে। আমার বাবা ওর বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি দেবেন, দিলেই সৌমেনের চাকরী চলে যাবে। এই সব ঘটনার মধ্যে ভয়ে কাঁপছি আমি। যদি কোনো রকমে বেরিয়ে পড়ে ঐ ঐতিহাসিক প্রেমপত্রটির রচয়িতা আমি, তাহলে কি হবে। মা তাহলে কি করতে পারেন আমি ভাবতেই পারি না। মা যে কতখানি দুঃখ পাবেন তার মাপই হয় না। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলবেন, “এ্যা, তুমি আমার মেয়ে হয়ে এতো জঘন্য কাজ করেছ? লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হচ্ছে, এই শিক্ষা দিয়েছি তোমায়?” মা, হয়তো দোতলা থেকে লাফ দিয়েও মরে যেতে পারেন। আর বাবা! বাবা যদি শোনেন তাহলে যে ধমকটা খেতে হবে সেটা ভেবে আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হচ্ছে, “এ্যাতো আঁচড়ে পেকেছ! পড়াশুনোয় তো অষ্টরম্ভা। কোথায়, ণিজন্ত প্রকরণ মুখস্থ হয়েছে? ষত্ব-ণত্ব জ্ঞান হয়নি, আটাশ পাতা প্রেমপত্র লিখেছ?” এমন চিৎকার করে ধমক দেবেন যে ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ় নাম শুনে ‘হ য ব র ল’তে যেমন বাড়িটা পড়ে গিয়েছিল সেই রকম এই বকুলবাগানের বাড়িটা পড়ে যাবে চুরমার হয়ে। দু’দিন ধরে আমি ভয়ে কাঁপছি, আমার একমাত্র ভরসা, আরাধনার নিশ্চয় এটুকু অহঙ্কার আছে যে বলে দেবে না তার প্রেমপত্রটা অন্য কেউ লিখে দিয়েছে।
এ কয়দিন ক্যাটালগও করা হয়নি। মির্চা কত কি মাথামুণ্ডু ভাবছে কে জানে। আমি বেশ বুঝতে পারি ও আমাকে একটুও বিশ্বাস করে না। এই যেমন ওকে আমি সেদিন বললাম—আমার ছাতিম গাছ’ কবিতাটা কল্লোল’-এ পাঠিয়েছিলাম, সেখান থেকে কবি–বাবু একটা খুব সুন্দর চিঠি লিখেছেন। কথাটা ওর ভালো লাগে নি। আচ্ছা একজন কবি কি করে একজন কবিকে একটা চিঠিও লিখতে পারে না? আমি জানি কেন মির্চা এত অনিশ্চিত—আমি তো ওকে একবারও বলি নি আমি ওকে ভালোবাসি কিনা যদিও ও বহুবার বলেছে। আমি কি করে বলব? আমি তো জানি না আমার যে এই কষ্ট মেশান আনন্দ হচ্ছে, আমার যে কেবল ওর কাছে যেতে ইচ্ছে করছে এটাই ভালোবাসা কিনা। আমাকে জানতে হবে এটা সত্যি কি। আমার এত যে বন্ধু মীলু তাকেও আমি বলি নি। বলব কি করে, আর বলে কোনো লাভ নেই, ও জানবেই বা কি করে, ও তো কাউকে ভালোবাসে নি। আমাকে খুশি করবার জন্য যা তোক একটা কিছু বলে দেবে।… একজনকেই শুধু আমি বলতে পারি, তাকেই আমি বলব। কারণ তিনিই আমার বন্ধু। বয়স দিয়ে কি আর বন্ধু হয়! বাবা বলেন বন্ধুর সংজ্ঞা হচ্ছে-অত্যাগসহনো বন্ধুঃ-যার ত্যাগ বা বিচ্ছেদ সহ্য করা যায় না। আমি তো তার সঙ্গে বিচ্ছেদ সহ্য করতে পারি না। তাই নাকি? এ কথাটা ঠিক নয়। কতদিন আমি তাঁকে দেখি নি, কই আমার তো যেতেও ইচ্ছে হয় নি, কেন? কেন? কেন? তা কি আর জানি না—মির্চাকে ছেড়ে একদিনও কোথাও যেতে চাই না তাই।।
হঠাৎ আমার তার জন্য খুব মন কেমন করতে লাগল—আমি কাঁদতে লাগলাম—চির পথের সঙ্গী আমার চির জনম হে।’…মীলু এসে ঘরে ঢুকল। “রু, ইউক্লিড জিজ্ঞাসা করছে আজ ক্যাটালগ করা হবে না?”
“হবে, নিশ্চয় হবে।” আমি নিচে যাবার জন্য তৈরী হলাম। চুল ঠিক করলাম, টিপ পরলাম। আর তো আমাদের সাজসরঞ্জাম নেই। সেন্ট মাখাও হচ্ছে না, সে তো বিলাতী জিনিস তাই আমরা গোলাপজল, কেওড়া, কখনো কখনো আতর ব্যবহার করি। মা বলেন। আমার ও সব দরকার নেই, আমি পদ্মিনী কন্যা, আমার জামায় অমনি সুগন্ধ হয়। তবে কেন আমি সুগন্ধ মাখছি? তা কি আর জানি না! আমি ওকে ধোকা দিচ্ছি। বেচারা ভাবছে আমি ওকে ঠেলে দিচ্ছি কিন্তু সেটা ঠিক নয়। আমি ওকে কাছেই চাই।
সিঁড়ি দিয়ে নামছি আর আমার শরীর শির শির করছে—এটা ঘটল ঠিক সেই দিন কিনা আমি বলতে পারব না। কারণ আমার তো কোনো জার্নাল নেই। বেয়াল্লিশ বছর আগের কথা আমি লিখছি, ডায়রী থেকেও নয়, স্মৃতি থেকেও নয়। ঘটনাগুলো তাই পরপর লেখা হচ্ছে কিনা তা আমি জানি না।
‘পর পর অর্থাৎ তখন যা পর পর মনে হয়েছিল, এখন এর আগেও নেই পরেও নেই—এখন ঐ দিনগুলো একই সময়ে বর্তমান, কথাটা আমি বোঝাতে পারছি না। বোঝান শক্তই বা কি? শ্রীকৃষ্ণের ব্যাদিত আস্যের মধ্যে অর্জুন তো একই সঙ্গে জগৎ দেখেছিলেন। আমিও আজ তাই দেখছি। পার্বতী ও গৌতমী, তোমাদের বিশ্বাস করতে হবে—এটা স্মৃতি নয়, বর্তমান, আমি ক্ষণে ক্ষণে ১৯৩০ সালে প্রবিষ্ট হচ্ছি। আমাকে স্পর্শ করে আছে ১৯৩০ সাল। তাই আমি লিখেছি—
সময়ের সমুদ্র পারায়ে
যে জীবন গিয়েছে হারায়ে
যদি সে ফিরেই ফের আসে
আলো হয়ে মনের আকাশে
চন্দ্রতারকার সাথে
বসে একাসনে
সে সূর্যস্বরূপ–
আমাকে দেখাবে বিশ্বরূপ—
তখন আর অন্য পন্থা নাই
প্রণিধায় কায়ং প্রসন্নতা চাই।…
আমি তাই তোমাদের বলেছি—প্রসীদ, প্রসীদ, প্রসন্ন হও–আমার সমস্ত জীবন— ভুল-ভ্রান্তি অপরাধ ও ত্রুটি সব নিয়ে তোমাদের কাছে, মানুষের কাছে, নিবেদন করছি—অন্য ঈশ্বর আমি জানি না।
কিন্তু আমি অর্জুনের মতো এই রূপ সংহরণ করতে বলব না। আমি দেখতে চাই। আমি আবার দেখতে চাই। আমি দুই হাতে ওকে ধরতে চাই।…অলৌকিক প্রত্যাশা এসে আমার বুদ্ধির কেন্দ্রটা শিথিল করে দিয়েছে, আমি প্রার্থনা করছি, যদি সত্যই কোথাও কেউ থাক আমাদের ভাগ্যনিয়ন্তা, তবে এই চল্লিশটা বছর পার করে নিয়ে যাও। ওর মুখের রেখাগুলো আমার চোখে পড়ছে না, শুধু ওর চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা ছাড়া মুখের আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না এখন—কেবল সব সময়ে ওর ফর্সা গলাটা দেখি আর শার্টের ফাক দিয়ে মুখ বের করে থাকা বুকের একটু অংশ। আমি ঐখানে কাত পেতে শুনতে চাই—গভীরে খুব গভীরে জন্মান্তরের মতো বিচ্ছিন্ন অথচ যুক্ত সেই আশ্চর্য সুরটা এখনো কোথাও বাজছে কিনা। সেই প্রথম আলোর চরণধ্বনি’, সেই প্রথম প্রেমের কল্লোল।
