কিছুদিন থেকে আমাদের বাড়িতে একটা বেশ বড় রকমের গোলমাল শুরু হয়েছে, আমাদের খুব নিকট আত্মীয়া একটি মেয়েকে নিয়ে দিদিমা এ বাড়িতে এসেছেন। মেয়েটির নাম আরাধনা। সে আমার চেয়ে ছয় বছরের বড়—তবু আমরা বন্ধুর মতো। আরাধনা অপূর্ব সুন্দরী। ওদের বাড়িতে থেকে যতীন বলে একটি দরিদ্র ছেলে পড়াশুনো করত। পড়াশুনোয় খুব ভালো, দেখতে সুন্দর এবং অনুগত ছিল বলে আরাধনার বাবা ঠিক করলেন যে তার সঙ্গে যতীনের বিয়ে দেবেন। আরাধনার যখন বার বছর বয়স, তখন থেকেই এই বিয়ে স্থির। বড় হলে বিয়ে হবে। ওরা এক বাড়িতেই থাকে, ওদের দেখা-শোনা হয়, কিন্তু আরাধনা যতীনকে দু চোখে দেখতে পারে না। যতীন যদি ঘরে ঢোকে তবে আরাধনা তৎক্ষণাৎ উঠে চলে যায়। যতীন যদি ওকে চিঠি লেখে ও ছিঁড়ে ফেলে দেয়, না পড়েই। সে সময়ে নিজের বিয়ে নিয়ে মা বাবার সঙ্গে কেউ কথা বলত না। তবুও ও বার বার ওর মাকে, বাবাকে, দিদিকে কেঁদে কেঁদে বলেছে, আমি ওকে বিয়ে করব না। ওকে আমার একটুও ভালো লাগে না। ওর মা বাবা-দিদিরা তো অবাক। এ আবার কি কথা, অমন সোনার চাঁদ ছেলে ভালো না লাগবে কেন? বেশি বেশি আহ্লাদীপনা! ওর দিদিরা বললেন, ‘ওর তোকে অত পছন্দ, তোর কেন নয়? তুই বা কি এমন রাজেন্দ্রাণী যে সাধা সম্বন্ধ ফিরিয়ে দেব আমরা?
অতএব আরাধনার যখন চৌদ্দ বছর বয়স তখন যতীনের সঙ্গে ওর বিয়ে হয়ে গেছে, ওদের একটি ছেলেও হয়েছে। এখন আরাধনার বয়স তেইশ, ওর স্বামী ওকে খুব খোশামোদ করে, সর্বক্ষণ ওর পায়ে পড়ে আছে বললেই হয়। কিন্তু আরাধনা বলে ওর জীবনটা বিরাট এক ডোজ কুইনাইন মিক্সচার। মুখ থেকে তেতো আর যাচ্ছেই না। “ভাই রু ঐ লোকটার সঙ্গে থাকতে যে আমার কি কষ্ট, কি বলব তোকে!”
“কেন ভাই যতীনমেসসা তো খুব ভালোবাসেন তোমায়!”
“রাখ, রাখ, ও সব ন্যাকামো।”
কিন্তু একদিন এই কুইনাইনের তেতো ওর মুখ থেকে চলে গেল—মুখে মধুর আস্বাদ পেল আরাধনা। ওদের পাশের বাড়িতে একটি তরুণ প্রফেসর, ওরই বয়সী, এলেন। ওদের সঙ্গে আলাপ হল। আরাধনা জানতে পারল কার প্রতীক্ষায় এতদিন তার শরীর-মন কুইনাইন মুখে নিয়েও বেঁচে ছিল।
কিন্তু ঐ তরুণ প্রফেসর, তার নাম সৌমেন, তিনিও তো ভারতীয় নারীর কোলে জন্মেছেন, আমার মায়ের মতন তারও মা তাকে ভালোমন্দ চিনতে শিখিয়েছেন, এদেশের যুগ-যুগের আদর্শ অনুসারে। যদিও সে আদর্শ পুরুষের জন্য ছিল না; কিন্তু সৌমেন তো শুধু ভারতীয় নয়, সে আবার আধুনিকও তাই নীতির ক্ষেত্রে সে স্ত্রী-পুরুষের তফাৎ করে না। সৌমেনের ভালোবাসা আরাধনার চেয়েও অনেক গভীর, সারাজীবন দিয়ে সে তার প্রমাণ দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু তবু সে ওকে বলেছে তাদের দেখাশোনা না হওয়াই ভালো। স্বামীর প্রতি আরাধনার কর্তব্যচ্যুতি সে চায় না। হিন্দুরা তো বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারে না, তবে? তবে কি হবে এর পরিণাম? কাজেই দেখাশোনা আর সে করবে না। আরাধনার কিন্তু অত নীতিজ্ঞান নেই, বলে—দেখাশোনা হবে না কেন? দ্রৌপদীর যদি পঞ্চপতি থাকতে পারে আমার না হয় দুটোই রইল! কিন্তু এটা ঠাট্টা। সৌমেন নিজের মন নিয়ে। অস্থির হয়ে গেছে—ছটফট করছে, ঠিক করতে পারছে না কর্তব্য। শেষ পর্যন্ত আরাধনাকে একটি চিঠি লিখে পতিব্রতা হতে অনুরোধ জানিয়ে সে ক্রিশ্চানদের পেনিটেনশিয়ারীতে বন্ধ হয়ে আছে। নিজেই নিজেকে বন্ধ করেছে। কিন্তু আরাধনার প্রতিজ্ঞা ওর ব্রতভঙ্গ করবেই। একদিন আরাধনা আমায় বলল, “ভাই রু, তুই তো খুব ভালো লিখতে পারিস, আমায় একটা চিঠি লিখে দে না, বেশ কবিতা-টবিতা দিয়ে।”
“কি করে পাঠাবে ঐ মঠে?”
“সে আমার উপায় আছে। তুই লেখ, যেমন বলি লেখ, সৌমেন আবার খুব বিদ্বান কিনা বানান ভুল হলে ওর খারাপ লাগবে, তাই তোকে বলছি; নৈলে আমি কি আর লিখতে পারি না।
আমি তো বেশ গর্বিত। জীবনে প্রেমপত্র লেখার সুযোেগ এই প্রথম। প্রেমপত্র লেখবার জন্য আরাধনা চয়নিকা নামিয়েছে; মহা মুশকিল, রবিবাবুর প্রেমের কবিতা আর ঈশ্বরের কবিতার তফাৎ বোঝা যায় না। যা হোক ‘গুপ্তপ্রেম’ ও ‘ব্যক্তপ্রেম’ এ দুটো খুব স্পষ্ট। আরাধনা খুঁজে বের করেছে—পরাণে ভালোবাসা কেন গো দিলে রূপ না দিলে যদি বিধি হে—এই লাইনটা নাকি ঢোকাতেই হবে। আমি বললাম, “তুমি এত সুন্দর দেখতে এ কবিতা তোমার পক্ষে খাটবে না তো।” আরাধনা চিন্তিত, সে খুঁত খুঁত করতে লাগল, “তাই তো কি হবে, কবিতাটা খুব ভালো ছিল কিন্তু।”
যা হোক, শেষ পর্যন্ত আটাশ পাতা প্রেমপত্র লেখা হল এবং অব্যর্থভাবে তা লক্ষ্যসন্ধান করল। সেই শব্দভেদী বাণ যথাস্থানে পৌঁছতে বাণবিদ্ধ সৌমেন স্বরচিত কারাগার ছেড়ে এসে উপস্থিত হল। সম্ভবত সেটা আমার পত্রের গুণে নয়–সে নিজেই একটা ছুতোর অপেক্ষায় ছিল। এর পরে সে একদিন সপুত্ৰক আরাধনাকে নিয়ে আগ্রায় পালিয়ে গেল। তারপরের ব্যাপারটাই হচ্ছে আমার বর্তমান উদ্বেগের কারণ। আরাধনাকে নিয়ে যে সৌমেন চলে গেল এই ঘটনার একটা পরিভাষা আছে, সেটা না বললে বোঝা যায় না কাজটা কত খারাপ। ঘরের বৌকে বের করে নিয়ে যাওয়া। এই ভয়ানক পাপ সৌমেন করেছে রোজ শুনছি। যেন আরাধনা করে নি। আমি তো জানি আরাধনাই সৌমেনকে মঠের কারাগার থেকে বের করে এনেছে, এবং আমি তাকে সাহায্য করেছি কিন্তু আমি সত্যিই জানতাম না যে এর ফলে এতবড় পাপ ঘটবে।
