ও বললে, “কৈ দেখি?” আমি বইটা এগিয়ে দিতে গেলে ও আমার কটি বেষ্টন করে কাছে টেনে নিল আর আমি বোধ হয় যুগান্তরের সংস্কারের তাড়নায় বাহাতে ওকে ধরে থেকেও ডানহাত দিয়ে ওর ফর্সা গালের উপর—ছি ছি এখনও ভাবতে আমার লজ্জা হয়—একটা চড় মারলাম—বেশ জোরেই। ওর গালটা লাল হল। ও অবাক হয়ে চেয়ে আছে। আমার ডান হাতের কর্জিটা জোর করে ধরে ও আস্তে আস্তে বলল, “তুমি আমায় মারলে!”
“কী করব।”
“জানো তুমি, আমাদের দেশে কোনো মেয়ে যদি এরকম করে তাহলে সেটা অসম্ভব অপমান? ওকে জিল্ট করা বলে।”
“এটা তো তোমাদের দেশ না।”
“বেশ আমি কালকেই চলে যাব, আর কোনো দিনও আসব না।”
ভয়ে আমার অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেছে, কি হবে, যদি সত্যি সত্যি চলে যায়।
“ক্ষমা কর মির্চা, ক্ষমা কর। আমি ইচ্ছে করে করি নি।”
“ইচ্ছে করে কর নি?” ও বিস্মিত।
“সত্যি বলছি তোমায় কি করে যে কি হল জানি না। হাতটাই অসভ্যতা করেছে আমি করি নি।”
অবস্থাটা স্বাভাবিক হতে বেশিক্ষণ লাগল না। আমি অনুতপ্ত, খুবই নরম। মনের ভাবটা, আর একবার করে দেখ, কিছু বলব না। ও কিন্তু সাবধানে আছে, খুব সাবধানে।
আমাদের ঝগড়া মিটে গেছে, আমি অনেক ভেবে দেখেছি ও যখন আমাকে এত চায়, তখন একটা কিছু করতেই হবে। স্ত্রীপুরুষের সম্পর্ক সম্বন্ধে আমার ধারণাটা খুবই অস্পষ্ট, কিন্তু কুয়াশার ভিতর থেকে একটু একটু স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমি বুঝতে পারছি বুদ্ধি দিয়ে নয়, অনুভূতি দিয়ে। ফুলের উপর আলো পড়ে, তার পাপড়িগুলি যখন খোলে তখন ফুল তো জানে না ফল ফলাবার নির্দেশ আসছে কোন অলক্ষ্য থেকে। তেমনি প্রেম, সূর্যের আলোর মতোই উজ্জ্বল উত্তপ্ত প্রেম আমার শরীরে প্রবিষ্ট হয়ে তাকে উন্মুখ করে তুলেছে। আমি জানি না তার নির্দেশ কিসের দিকে। শারীরিক শুচিতা সম্বন্ধে ভারতীয় মেয়েদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া নানা বদ্ধমূল ধারণা আছে, আমিও তা থেকে মুক্ত নই। স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষকে তারা ভালোবাসে নাবাসতে পারে না, ছুঁতে তো পারেই না। অন্য পুরুষ হচ্ছে পরপুরুষ। কোনো কোনো মেয়ে সে রকম করে, তারা হচ্ছে স্বৈরিণী। এই পরিভাষাগুলো আমি শুনেছি। যেমন ‘চোখের বালি’র বিনোদিনী হচ্ছে। স্বৈরিণী। ইতিমধ্যে চরিত্রহীন’ও আমি ‘নৌকাডুবি’র মলাটের মধ্যে রেখে পড়ে ফেলেছি। ‘চরিত্রহীন’-এর ঐ দুষ্টু বৌটার সঙ্গে ‘হাঙ্গার’ বইয়ের লোকটার বেশ মিল আছে—ঐ তরুণী বিধবা বৌটা বলছে, “যে তৃষ্ণায় মানুষ নর্দমার কালো জল অঞ্জলি ভরে পান করে আমার ছিল সেই পিপাসা।’ এ তৃষ্ণাটা কি? সত্যি তো আর জলের নয়। কারণ ওরা যতই গরীব হোক ওদের বাড়িতে কল ছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু এই বইগুলি বিশ্রী। আমার মনে গুনগুনিয়ে গান আসছে—
‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা,
তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে।‘
রবিঠাকুরের মতো সুন্দর করে আর কোথাও কোনো লেখক মনের কথা বলতে পারে না।
ভালোমন্দের দ্বন্দ্বে আমার বুকের ভিতরটা কাঁপছে। তবু আমি কতকগুলি ধারণা নিজেই তৈরী করে নিয়েছি, শরীরের কোন্ কোন্ অংশ স্পৃষ্ট হলে পাপ স্পর্শ হতে পারে। যেমন খাবার টেবিলে বসে ও যে ক্রমাগত আমার পায়ের উপর পা রাখে সেটা কখনো পাপ নয়। পাদস্পর্শ করলে পাপ হবে কি করে? এই হচ্ছে অকাট্য যুক্তি। হাতেও নিশ্চয় পাপ হবে না, হতেই পারে না, সর্বদা হ্যাণ্ডশেক করা হয়। তাই একদিন আমি লাইব্রেরীতে ওকে বললাম, “মির্চা তুমি আমার হাতটা নিতে পার।” এই বলে আমি আমার হাতটা তুলে ধরে ওর দিকে মেলে ধরলাম। ও দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমার হাতটা ধরল। আমার হঠাৎ মনে হল এইবারে বুঝলাম কেন হাতকে মৃণালের সঙ্গে তুলনা করা হয়। বৃন্তের উপর করপল্লব পদ্মের মতো দেখায়করকমল— আমার হাতের উপর ওর হাতটা কত ফর্সাঈষৎ ঈর্ষামিশ্রিত চোখে তাকিয়ে আছি, ও দুই লুব্ধ হাতে আমার হাতটা টেনে নিল-হাতের উপর মাথা রাখল, মুখ রাখল কাঁধের উপরে। সমস্ত হাতে ও পল্লবে আমি ক্ষণে ক্ষণে ওর অধরের স্পর্শ পেতে লাগলাম—ক্রমে ক্রমে আমার হাতটা আমার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল—কিংবা হাতটাই আমি হয়ে গেলাম। আমার সমস্ত অনুভূতি ঐখানে একত্র হয়েছে—আমার একাগ্র সত্তা ঐখানে স্পন্দিত। কতক্ষণ জানি না, কতক্ষণ ও আমার হাতের পল্লব ওর বুকের উপর রেখেছে, ওর শরীর ওর গলা আমার কনুই-এর উপরে, কাঁধের কাছে ওর মুখ। ও স্থির থাকছে না, ক্রমাগত নড়ছে। ক্রমে ক্রমে আমার হাত আর যেন রক্তমাংসের পদার্থ রইল না—ওর থেকে স্কুল বস্তু উধাও হয়ে গেল। আকাশজোড়া বিদ্যুৎ লেখার মতো চমকিত হতে লাগল—ওর ভিতরের অণু পরমাণু বিশ্লিষ্ট হয়ে গেছে—তারা ঘূর্ণমান, নৰ্তিত গ্রহ নক্ষত্রের মতো ঘুরছে তারা—‘গ্রহতারকা চন্দ্র তপন ব্যাকুল দ্রুত বেগে’—আমি চোখ বুজে আছি—আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে—“মির্চা—একি, একি, একি!”
চোখের জলে আমার বালিশ ভিজে গেছে—আমি তো ভবানীপুরের লাইব্রেরীতে নেই—আমি বালিগঞ্জের বাড়িতে আমার খাটে শুয়ে আছি, কিন্তু কি আশ্চর্য আমার হাতটা এখনও আমি হয়ে আছে। আমার শরীর অসাড়—আমি পাশ ফিরতে চেষ্টা করছি, দেখি আমার স্বামী কনুই-এর উপর ভর করে ঈষৎ উত্থিত হয়ে আমার দিকে চেয়ে আছেন-“তোমার কি হয়েছে আমায় বলবে না।”
আমার আটত্রিশ বছর বিয়ে হয়েছে। আমি খুব নিপুণ সংসার করেছি, কোনো ত্রুটি নেই। আমি হাত বাড়িয়ে আমার স্বামীর হাতটা ধরবার চেষ্টা করলাম। ছি, ছি, এতদিন পরে কেন এসব চিন্তা, কোথায় বা মির্চা! তখনই এক বুকভাঙ্গা নিঃশ্বাস পড়ল—সে যেন বলল—এই তো আমি! তোমার জীবনবায়ুতে প্রবিষ্ট। এতদিন ভুলেছিল কেন, কেন, কেন?
