আমার ভালো লাগছে, কি আশ্চর্য সুখে আমার দেহ মন ভরে রয়েছে—‘আনন্দসাগরে ভাসা’ কথাটা শুনেছিলাম, এই প্রথম বুঝলাম তার ঠিক অর্থটা কি। আমার মন ঐ জ্যোৎস্নার মতো হয়ে গেছে—সোমপায়ীদের মতো আমি জ্যোৎস্না পান করে আকাশগঙ্গায় ভাসছি-আমার হাতে তারার প্রদীপ, গলায় তারার মালা, উপরে লাল রঙের ব্রহ্মহৃদয়। জ্বলছে, ঐ তো আমার টিপ—আমার পায়ে তারার ঘুঙুর বাজছে— রুমুক ঝুমুক রিমি ঝিম্-ওটা ঘুঙুর নয়, নিচে মির্চা পিয়ানো বাজাচ্ছে-ও নিশ্চয় অনেক রাত অবধি বাজাবে। ও ঘুমোতে পারবে না, আমিও যেমন পারছি না, আমি জানি ও কি চায়। অজ্ঞাত রহস্যলোকের পর্দাটা সরে যাচ্ছে—আমি বুঝতে পারছি তার ওপাশে কি আছে, আমার মার কথায় আমার অচল বিশ্বাস ছিল কিন্তু সে বিশ্বাস কমে যাচ্ছে—এখানে পাপ কিছু নেই, তাহলে তো আমি চিনতে পারতাম যেমন বহুবার চিনেছি উদ্যত সর্পকে, কিন্তু এ তো জ্যোৎস্নার বাগান, এ তো পদ্মের সরোবর কিংবা কবি যে লিখেছেন রূপসাগর—এই কি সে রূপসাগর? কোনো কিছু ভাবতে গেলেই আমার কবিতা মনে আসে, কবিতা মনে এলেই কবিকেও মনে পড়ে। কতদিন আমি তাকে দেখি নি, কিন্তু সেজন্য আমার কষ্ট হচ্ছে না, এটা কি অন্যায়? এটা কি সত্যভঙ্গ? আমি কি কোনো প্রত্যুষে প্রথম সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম—ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা প্রভু তোমার পানে, তোমার পানে’,—আমি আর কিছুকে আর কাউকে তোমার চেয়ে বড় হতে দেব না—আমি কি সে সত্যচ্যুত? কয়েকদিন থেকে এই কথাটা আমার মনে যাওয়া আসা করছে, আমি উত্তর পাইনি—আজ আমি উত্তর পাচ্ছি—আজ উত্তর আনন্দের সিঁড়ি বেয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সত্য থেকে কি কেউ চ্যুত হতে পারে? সত্য সবাইকে ধারণ করে রাখে। আমার মনের সমস্ত তারগুলি তো তারই সুরে বাধা, তিনিই বাজাচ্ছেন এই গান—আমার দেহ-মন জুড়ে সুরের তরঙ্গ তুলেছেন তিনিই তো তার গানের ভিতর দিয়েই আমার মন এই আশ্চর্য রহস্যলোকের ভিতর ঢুকছে—ঠিক যেমন লিখেছেন—তোমার গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি, তখন তারে চিনি আমি তখন তারে জানি উনি ঈশ্বর সম্বন্ধে লিখেছেন আমি মানুষ সম্বন্ধে ভাবছি, আমি একটা ছোট্ট মেয়ে, মানুষই যথেষ্ট আমার পক্ষেঈশ্বরের দরকার নেই।
শান্তি আধঘুমে অপেক্ষা করে আছে ঘরের মধ্যে, এবার সে ডাকল—“রু, শুতে আসবে ভাই।”
“যাচ্ছি ভাই যাচ্ছি।”
আমার ঘরে আমার এগার বছরের বোন সাবি আর শান্তি শোয়। শান্তি মাটিতে শুয়ে আছে—আমি আর সাবি খাটে শোব। কোনো কোনো দিন আমি মাটিতে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে থাকি, আমার ভালো লাগে। সাবি ঘুমোচ্ছে। আমি ওর পাশে বসে ওর গায়ের চাদরটা ঠিক করে দিলাম। কোকড়া কোকড়া চুলে ঘেরা ওর সুন্দর মুখের ওপর জ্যোৎস্না এসে পড়েছে। কি সরল নিস্পাপ ওর আলোয় ধোয়া মুখ। কিন্তু মানুষ কি সত্যই কখনো সরল থাকে? আজ সকালে লাইব্রেরী থেকে যখন বেরিয়ে এলাম ও সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়েছিল, তখন আমি ওর উজ্জ্বল চোখে একটা তীক্ষ্ণতা দেখেছিলাম। সেটা কি? কথাটা মনে করে আমার গায়ে কাটা দিল। একটা অজ্ঞাত অশুভ আশঙ্কা আমার আনন্দসাগরকে চঞ্চল করে তুলল। আমি হাত জোড় করে প্রার্থনা করতে চাইলাম। কার কাছে প্রার্থনা করব জানি না। মানুষের কান শব্দের তরঙ্গ ছাড়া শুনতে পায় না। একটু দূরেই তা পৌঁছয় না। কিন্তু এমন কি কোনো কান আছে যা দূরেও থাকে কাছেও থাকে? যেখানে সব পৌঁছয়? কে তুমি আমার গুরুর হাতে পরশপাথর দিয়েছ আমাকে জাগাবে বলে? কে তুমি এই আনন্দ সাগরকে বইয়ে এনেছ? যদি তেমন কেউ থাকো তবে দিও, আমার হাতে অরূপরতন দিও—আমায় শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিও না। আমার ঘুম আসছে—মির্চা আমার হাতের উপর ছোট্ট একটা ক্ষত করে দিয়েছিল, আমি তাতে হাত বুলাচ্ছি আর সেটা আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে, আমার বুকের উপর ছড়িয়ে পড়ছে—আমি দেখছি আমি পড়ে আছি আহত—সে চলে গেছে।
বাবা বলেছেন, “মির্চা যদি কিছুটা সময় করতে পারে তাহলে সে আর তুমি বইয়ের ক্যাটালগ কর নূতন করে।” অনেক বই বাবার লাইব্রেরীতে। কয়েক হাজার, কত কে জানে—সাত-আট হাজার হবে। একটা বড় চৌকো কাঠের বাক্সে খোপ খোপ করা আছে, আর কার্ড তৈরী করা হয়েছে-“আমরা প্রত্যেক দিন চার-পাঁচ ঘন্টা এক সঙ্গে কাজ করি। তারপর বিকেলে সবাই একসঙ্গে গাড়ি করে বেড়াতে যাই। মোটের উপর সাত-আট ঘণ্টা আমরা একসঙ্গে থাকি দিনের মধ্যে। তবু দুপুরে যেটুকু সময় উপরে যাই আমার অস্থির লাগে ওর কাছে আসবার জন্য। যেন একটা অদৃশ্য দড়ি দিয়ে ওর সঙ্গে কে আমায় বঁধছে। এ বাধন কি ছিড়তে পারে? তাহলে আমি বাঁচবই না। কিন্তু এ কথাটা ঘুণাক্ষরেও কাউকে বলি নি। মীলুকেও না। ও বুঝতে পারবে না। ও আমাকে খারাপ ভাববে। কিন্তু আমি জানি আমি খারাপ নয়, কখনই নয়।
আমি মির্চাকেও বলিনি আমার মনের অবস্থাটা কি, ও তো সন্দেহে ভরপুর। আমার উপর ওর একেবারে আস্থা নেই বলেই মনে হয়।
যখনই আমরা একসঙ্গে থাকি–কোনো বইয়ের গল্প হয় কিংবা কবিতার। ‘হাঙ্গার’ বইটা পড়েছি, আমার ভালো লাগে নি। একটা বিশেষ কারণে ভালো লাগে নি। সে আমি ওকে বলতে পারব না। ওখানে একটা দৃশ্যের বর্ণনা আছে সেটা সম্বন্ধে জুগুপ্সা মিশ্রিত কৌতূহল আমার ভালো না লাগার কারণ। তাছাড়া ‘হাঙ্গার’ অর্থাৎ একটা লোক দিনের পর দিন অনাহারে আছে এ কষ্টটা আমি বুঝব কি করে? আমি কোনো দিন হাঙ্গারের পীড়ন জানি না। একদিনও অনাহারে থাকিনি। সর্বদা ভালো ভালো খাবার নিয়ে মা সাধাসাধি করছেন, দেহের অন্য হাঙ্গারের কথাও ওখানে আছে—আমি এখনও তার কোনো পীড়নে পীড়িত নয়। ঐ জগন্টা অপরিচিত আমার। আর মনের হাঙ্গার তো জানিই নারূপে রসে বর্ণে গন্ধে তো তা পূর্ণ করবার আয়োজন রয়েছে। আমি ওকে বললাম, “আমি হাঙ্গার বইটা বুঝতে পারি নি।”
