এই স্বপ্ন দেখে তোর ধারণা হলো তুই আর ছমাস বাঁচবি?
হুঁ।
তুই তো দেখছি বিরাট গাধা। তোকে আমি খাবনামা বই দিয়ে যাব। পড়ে দেখিসপরিষ্কার লেখা আছে— স্বপ্নে নিজের মৃত্যু দেখলে দীর্ঘায়ু হয়। তুই বাঁচবি অনেক দিন।
বাঁচলে তো ভালোই। তুমি কি এখন যাবে; না বসবে। আরো খানিকক্ষণ?
বসি কিছুক্ষণ। আমার তো আর অফিস না যে ঘড়ির কাটা ধরে যেতে হবে। আমার হলো স্বাধীন ব্যবসা। ইচ্ছা হলে যাব, ইচ্ছা না হলে যাব না। সারাদিন তোর সঙ্গে বসে থাকতে পারি। কোনো সমস্যা না।
মনজুর আঁতকে উঠে বলল, তুমি কি সারাদিন থাকার প্ল্যান করছ?
বদরুল আলম বললেন, কোন প্ল্যান-ট্যান নেই। এককাপ চা খেতে পারলে হত।
তোমার চায়ের ব্যবস্থা করছি। দয়া করে চা খাও। চা খেয়ে বিদেয় হও।
মনজুর বিছানা থেকে নামল। শরীর বেশ ভালো লাগছে। মাথা ঘুরছে না বা দুর্বলদুর্বল লাগছে না। বাসায় চলে গেলে কেমন হয়? গরম পানিতে ভালো করে গোসল করে একটা লম্বা ঘুম দিলে শরীর অনেকখানি ঠিক হয়ে যাবে বলে মনে হয়।
মনজুর গেল চায়ের খোঁজে।
আর তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঢুকল জাহানারা। অবিকল স্বপ্নদৃশ্যের মতো একটা ব্যাপার হল। সে চোখ বড় বড় করে বলল, স্যার কোথায়? স্যার?
বদরুল আলম মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটা সুন্দর। শুধু সুন্দর না, বেশ সুন্দর। সবচে’ সুন্দর তার গলার স্বর। কানে এসে গানের মতো বাজে।
জাহানারা আবার বলল, স্যার কোথায়? স্যার?
বদরুল আলম বললেন, তোমার নাম কি জাহানারা?
জাহানারা সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে প্রায় কাঁদোকাদো গলায় পাশের বেডের রোগীকে বলল, স্যার কোথায়?
জাহানারা আজ অফিসে যায় নি। বাসা থেকে সরাসরি চলে এসেছে। ঘর থেকে বের হবার সময় ধাক্কা লেগে পানির একটা গ্লাস ভেঙেছে। তখনই তার বুক ছ্যাৎ করে উঠেছে। নিশ্চয়ই কোনো দুঃসংবাদ আছে।
যে বাসে আসছিল মাঝপথে সেই বাসের চাকা বসে গেল। খারাপ সংবাদ, খারাপ সংবাদ, নিশ্চয়ই কোনো খারাপ সংবাদ। কখনো বাসের চাকা বসে না–আজ বসল কেন?
বদরুল আলম আবার বললেন, মা, তোমার নাম কি জাহানারা?
জাহানারা বলল, এই বিছানায় যে রোগী ছিলেন উনি কোথায়?
মনজুর আমার জন্যে চা আনতে গেছে। তুমি বস এখানে। আমি মনজুরের মামা হই। জাহানারা তোমার নাম তাই না?
জ্বি।
কী করে বললাম বল তো?
জাহানারা তাকিয়ে রইল। সে সত্যি বুঝতে পারছে না।
কলা খাবে? খেয়ে দেখ। মনজুর খাবে বলে মনে হয় না। নাও একটা খাও। প্রচুর আয়রন আছে।
ফরিদও জাহানারার সঙ্গে এসেছে। সে দরজার ওপাশ থেকে ভীত চোখে তাকিয়ে আছে। তার হাতে টিফিন ক্যারিয়ার।
মনজুর চা নিয়ে ফিরে এল। তার হাতে ছোট্ট একটা ফ্লাঙ্ক, সঙ্গে দশ-বার বছরের একটি ছেলে যার এক হাতে দুটা খালি কাপ, অন্য হাতে কয়েকটা নোনতা বিস্কিট। সে বিস্কিটগুলো বদরুল আলমের দিকে বাড়িয়ে ধরল।
তিনি বললেন, মারব এক থাপ্নড়, হাতে করে বিস্কিট নিয়ে আসছে!
ছেলেটি নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ইচ্ছা হইলে খাইবেন, ইচ্ছা না হইলে নাই। থাপ্পড় মারমারি ক্যান?
মনজুর বলল, খেয়ে ফেলেন মামা। হাত যেমন নোংরা প্লেটও সেরকম নোংরা। বরং হাতে দেয়ার মধ্যে এক ধরনের আন্তরিকতা আছে।
জাহানারা হাসছে। তার খুব ভালো লাগছে। যে মানুষটা মর-মর হয়ে বিছানায় পড়ে ছিল তাকে এমন সুস্থ স্বাভাবিক দেখবে সে ভাবেই নি। চোখের নিচের কালিও অনেক কম। গালের খোচা খোঁচা দাড়িগুলো কেটে ফেললেই কেউ বুঝবে না। এই মানুষটা বড় ধরনের অসুখে ভুগছে।
জাহানারা, কখন এসেছ?
কিছুক্ষণ আগে।
চা-বিস্কিট কিছু খাবে?
জ্বি না।
কলা খেতে পাের। প্রচুর আয়রন আছে। আমার কথা বিশ্বাস না হলে মামাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পার।
বদরুল আলম চা খাচ্ছেন। নোনতা বিস্কিটও খাচ্ছেন। দোকানের ছেলেটি কাপ ফেরত নিয়ে যাবার জন্যে অপেক্ষা করছে। তার হাতে এখনো দুটা বিস্কিট ধরা আছে।
জাহানারা বলল, আপনার শরীর তো সেরে গেছে বলে মনে হয়।
মনজুর বলল, আমারও তাই মনে হচ্ছে। দশটার দিকে ডাক্তার এসে দেখবে। তাকে বলব, আমাকে রিলিজ করে দিতে। আবার যখন শরীর খারাপ হবে, ভর্তি হব। ইতিমধ্যে কিডনি জোগাড়ের চেষ্টা চালাব। পাওয়া গেল তো ভালোই। না পাওয়া গেলে নাই।
জাহানারা বলল, স্যার আমার কেন জানি মনে হচ্ছে। আপনার কিছুই লাগবে না।
না লাগলে তোই ভালোই।
বদরুল আলম বললেন, আমি তোকে একজন পীর সাহেবের কাছে নিয়ে যাব। অত্যন্ত পাওয়ারফুল পীর। ক্ষমতা অসাধারণ। পান-বিড়ির একটা দোকান চালায়। বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নাই। গভীর রাতে, মিনিস্টার, সেক্রেটারি, এরা আসে।
মনজুর বলল, দিনে আসে না কেন?
দিনে আসলে তাে লাভ নাই। দিনের বেলা পীর সাহেব হচ্ছে দােকানদার। রাতে পীর।
সাহেবকে গিয়ে আমার অসুখের কথা বলবে?
হুঁ। এরা ইচ্ছা করলে কী না করতে পারে? আজ যাবি?
না।
তোকে যদি রিলিজ করে দেয় তাহলে চল না। আমার সাথে। ক্ষতি তো কিছু নাই।
জাহানারা বলল, স্যার যান না। পীর ফকির সাধু সন্ন্যাসী এদের অনেক রকম ক্ষমতা থাকে।
মনজুর বলল, এদের একমাত্র ক্ষমতা হচ্ছে লোকজনদের ধোঁকা দেয়া। এর বাইরে এদের কোনো ক্ষমতা নেই।
ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা না বলেই তুই বুঝে ফেললি? আগে কথা বল–তারপর ডিসিশান নে। পীর সাহেবের তাবিজ যে গলায় বাধতেই হবে, এমন তো কথা নেই।
