বুদ্ধিমতী মেয়ে ভুল করে না তার নমুনা এখন দেখা যাচ্ছে। তিন বছরের মাথায় তাকে স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হতে হয়েছে।
বদরুল আলম ভাগ্নেকে দেখতে এসেছেন
বদরুল আলম ভাগ্নেকে দেখতে এসেছেন।
শুধু হাতে আসেন নি। দু ডজন কমলা, এক ডজন কলা এবং চারটা ডাব এনেছেন। একটা হরলিক্সের কোটাও সঙ্গে আছে। তিনি বিছানার পাশে বসতে বসতে বললেন, তুই আছিস কেমন?
মনজুর বলল, ভালো।
ভালো সেটা বুঝতেই পারছি। ভালো না হলে এইভাবে বিছানায় বসে কেউ চা খায়? তোকে চা খেতে দিচ্ছে?
হ্যাঁ দিচ্ছে। শুধু তাই না–ডাক্তার বলেছে ইচ্ছা করলে আমি বাসায় চলে যেতে পারি।
বলিস কি!
গতকাল ডায়ালিসিস হলো। তারপর থেকে শরীর ইমপ্ৰক্ষাভ করছে। এখন বেশ ভালো। যে কিডনিটা কাজ করছিল না সেটাও কাজ করা শুরু করেছে বলে আমার ধারণা।
তোর কিডনি প্রবলেম তাহলে সলভড্। বাঁচলাম। আমি মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম প্রয়োজনে একটা তোকে দেব।
মনজুর দরাজ গলায় বলল, সেই সুযোগ থেকে তোমাকে বঞ্চিত করব না মামা। সুযোগ এখনো আছে। একশ ভাগ আছে। কিডনি বদলাতে হবে।
বদরুল আলম চুপ করে গেলেন।
মনজুর বলল, শুনে মনে হচ্ছে চুপসে গেলে!
বদরুল আলম বললেন, চুপসে যাব না তো কী? এই বয়সে কিডনি দিলে কি আর বাঁচব? অপারেশনের ধকলই সইবে না। তুই ঠিকই বেঁচে থাকবি, মাঝখান থেকে আমি শেষ।
তোমার আর বাঁচার দরকার কী? অনেক দিন তো বাঁচলে।
এই বাঁচা কি কোনো বাঁচা? পরিশ্রম করতে করতে জীবন গেল। সুখের মুখ দেখলাম না–এখন একটু দেখতে শুরু করেছি, এখন যদি মরে যাই তাহলে লাভটা কী?
তাও ঠিক।
বদরুল আলম বললেন, নে কলা খা।
কলা খাব না মামা, তুমি খাও।
কলা হলো ফ্রুটসের রাজা। একটা কলায় কতটুকু আয়রন থাকে জানিস?
কতটুক থাকে?
অনেক–বলতে গেলে পুরোটাই আয়রন।
তুমি বসে বসে আয়রন খাও। আমার ইচ্ছা করছে না। আর কিডনি নিয়েও তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। এমনি বললাম
কিডনি লাগবে না?
লাগবে হয়তো। লাগলেও তোমারটা না।
বদরুল আলম বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করলেন। দুটা কলা এবং একটা কমলা খেলেন। হৃষ্ট গলায় বললেন, তোর এখানে কোনো লোকটােক নেই? একটা দা পেলে ডাব কেটে খাওয়া যেত।
এখানে কোনো লোক নেই মামা। ডাব সঙ্গে করে নিয়ে যাও। তোমার অফিসের লোকজন কেটে দেবে।
ডাবের শাঁসেও কিন্তু আয়রন আছে।
মনজুর বিরক্ত গলায় বলল, তুমি আয়রনের এত খোঁজ কোথায় পেলে বল তো
কাঠের মিস্ত্রি বলে তুই আমার কথা বিশ্বাস করছিস না?
বিশ্বাস করছি। বিশ্বাস করছি।
বদরুল আলম বললেন, এক কাপ চা খেতে পারলে মন্দ হত না।
মনজুর বলল, এখানের চা মুখে দিতে পারবে না মামা। ভয়াবহ চা। প্রচুর চিনি, প্রচুর দুধ এবং প্রচুর জীবাণু।
প্রচুর জীবাণু মানে?
হাসপাতাল হচ্ছে অসুখের গুদাম। এখানকার চায়ে জীবাণু থাকবে না তো কোথায় থাকবে? কিলবিল করছে জীবাণু। তুমি বরং চলে যাও।
তুই আমাকে বিদায় করে দিতে চাচ্ছিস কেন?
বিদায় করতে চাচ্ছি। কারণ তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছে না। তোমার গা থেকে তার্পিন তেলের গন্ধ আসছে— গন্ধে বমি এসে যাচ্ছে।
বদরুল আলম দুঃখিত গলায় বললেন, তুই কি কোনো কারণে আমার উপর রেগে আছিস? রেগে থাকলে সেটা খোলাখুলি বল। খামাখা তার্পিন তেলের কথা আনলি কেন? আমি কি গায়ে তাৰ্পিন তেল মাখি, নাকি আমি একটা ফার্নিচার যে আমার গায়ে দুবেলা তার্পিন তেল দিয়ে বার্নিশ করা হয়? তোর রাগটা কী জন্যে, শুনি?
আমার কোনো রাগ নেই।
অবশ্যই আছে। এবং কারণটাও জানি। কাঠমিস্ত্রি হয়েছি বলেই কি আমার বুদ্ধিশুদ্ধি থাকবে না?
ঠিক আছে, কী কারণ তুমি বল।
আমি তোকে বলেছিলাম তোর বিয়েতে একটা খাট বানিয়ে দেব। এমন খাট যে যেই দেখবে ট্যারা হয়ে যাবে। সেই খাট দেয়া হয় নি–তোর রাগটা এই কারণে। কাঠ এখন কেনা হয়েছে। বাৰ্মা টিক খুঁজেছিলাম, পাইনি। চিটাগাং টিক কিনেছি। সিজন করা কাঠ। খুব ভালো জিনিস। ছমাসের মধ্যে তোর খাট আমি দেব–যা কথা দিলাম।
ছমাস আমি টিকব না মামা।
পাগলের মতো কথা বলিস না।
সত্যি বলছি ছমাস টিকব না।
ডাক্তার বলছে এই কথা?
ডাক্তাররা কি আর সরাসরি এই কথা বলে?
তাহলে কি স্বপ্ন দেখেছিস?
হ্যাঁ।
কী স্বপ্ন?
মনজুর হাসল, কিছু বলল না। বদরুল আলম উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, স্বপ্নটা কখন দেখেছিস? মাঝরাতে, না শেষরাতে? মাঝরাতের স্বপ্নের কোনো গুরুত্ব নেই। শেষরাতের স্বপ্ন হলে চিন্তার কথা। শেষরাতেই দেখেছি। ঘুম ভেঙে দেখি সকাল।
বদরুল আলম আরো উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, পেট ঠিক ছিল তো? বদহজম অবস্থায় স্বপ্ন দেখলে–লে যা।
বদহজম-টজম কিছু না। পেট ঠিকই ছিল।
স্বপ্নে কী দেখলি?
দেখলাম আমি এই বিছানায় শুয়ে আছি। একটা ধবধবে চাদরে আমার সারা শরীর ঢাকা। আমি বুঝতে পারছি আমি মারা গেছি। একজন ডাক্তার এসে বললেন, ডেডবডি এখনো সরানো হয় নি? কোনো মানে হয়? খামাখা একটা বেড দখল করে আছে। সবাই তখন ধরাধরি করে আমাকে নিচে নামিয়ে দিল। আমার বিছানায় নতুন একজন রোগী চলে এল। তার কিছুক্ষণ পর জাহানারা হাসপাতালে ঢুকল। সে অবাক হয়ে সবাইকে জুম করছে, সার কােথায়? কেউ বলতে পারছে না। অথচ আমি মেঝেতেই পড়ে আছি।
জাহানারাটা কে?
আমাদের অফিসে কাজ করে।
স্বপ্নটা এখানেই শেষ, না আরো আছে?
আর নেই। তার পরপরই আমার ঘুম ভেঙে যায়।
