তাহলে এমন রাগী-রাগী মুখ করে রেখেছ কেন?
বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়ের উপর রাগ করব কোন সাহসে?
তার মানে?
পরের বাড়ির মেয়ে রাতের পর রাত হাসপাতালে থেকে আমার সেবা করে। আর নিজের পেটের মেয়ে একবার খোঁজ নিতেও আসে না।
শাহানা লজ্জিত স্বরে বলল, আমরা চিটাগাং চলে গিয়েছিলাম মা। আমার একেবারেই যাবার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু ও এমন করে বলল!
গিয়েছ, ভালো করেছ। শুধু চিটাগাং কেন, হিল্লি যাও, দিল্লি যাও। কাশ্মীর যাও।
মনোয়ারা পাশ ফিরলেন। শাহানা কিছু সময় বসে রইল তাঁর বিছানায়। মাির রাগ মনে হচ্ছে চট করে ভাঙানো যাবে না। মাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করতে হবে। কিন্তু কেন জানি তার কাঁদতে ইচ্ছা করছে না। সে যে মাকে দেখতেও যায় নি, তার জন্যে খুব অনুশোচনাও বোধ হচ্ছে না। সে এমন বদলে গেল কেন?
শাহানা মার ঘর থেকে বের হয়ে আবার বারান্দায় তার টবের গাছগুলির কাছে গেল। সেখান থেকে বসার ঘরে। তার কিছু করার নেই।
বসার ঘরে জহির চুপচাপ বসে আছে। হোসেন সাহেব অতি উৎসাহে হোমিওপ্যাথির গল্প করছেন।
বুঝলে জহির, যাকে বলে মিরাকল! কিডনিভর্তি গজগজ করছিল পাথর। সবচে বড়োটার সাইজ পায়রার ডিমের মতো। দাস বাবু রোগীকে দিলেন গ্ৰী হানড্রেড পাওয়ারের কেলিফস। মজার ব্যাপার কী, জান? কিডনির পাথরের জন্যে কিন্তু কেলিফস না।
কাজ হল কেলিফসে?
হবে না মানে! বললাম না মিরাকল। দুটা মাত্র ডোজ। প্রথম ডোজের আটচল্লিশ ঘণ্টা পর সেকেণ্ড ডোজ। অল ক্লিয়ার!
বাহ্ খুব আশ্চর্য!
আশ্চর্য তো বটেই। এক্সরে করে দেখা গেল পাথরের বংশটাও নেই। ভ্যানিশ। অল গান।
শাহানা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বাবার বক্তৃতা শুনল। এমন মজা লাগছে শুনতে। কেমন শিশুর মতো ভঙ্গিতে বাবা কথা বলেন। বিস্মিত হবার কী অসাধারণ ক্ষমতা এই মানুষটির।
হোসেন সাহেব মেয়ের দিকে এক পলক তাকিয়েই ছোট একটা ধমক দিলেন, জহিরকে চা-টা কিছু দে। তোর কোণ্ডজ্ঞান নেই নাকি?
শাহানার কাছে এই ধমক বড়ো মধুর লাগল। ঠিক আগের মতো বাবা তাকে ধমক দিলেন। যেন এখনও তার বিয়ে হয় নি। সে এ বাড়িরই একটি আদুরে মেয়ে, যে কোনো কাজকর্ম শেখে নি। শুধু গল্প শোনে।
আবেগে শাহানার চোখ ভিজে উঠল। সে এগিয়ে গেল রানাঘরের দিকে।
রান্নাঘরে নীলু খুব ব্যস্ত। একটি চুলায় সে ফুলকপির বড়া ভাঁজছে। অন্যটিতে চায়ের পানি
বাবা চা চাচ্ছেন্ন ভাবী।
দিচ্ছি। বড়াগুলি হয়ে যাক।
চা-টা আমি বানাই?
তোমাকে কিছু করতে হবে না। মার সঙ্গে গিয়ে গল্প কর।
তুমি আজ অফিসে যাও নি?
না, আমি দশ দিনের ছুটি নিয়েছি।
কেন?
অনেক রকম ঝামেলার মধ্যে আছি। কবির মামার জন্যে হাসপাতালে খাবার পাঠাতে হয়। এদিকে মার অসুখ। তোমার কিন্তু এক বার কবির মামাকে দেখতে যাওয়া উচিত, শাহানা।
যাব। কাল–পরশুর মধ্যে যাব।
কবির মামা তোমার কথা আর জহিরের কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। নাও, একটা বড়া খেয়ে দেখ তো কেমন হয়েছে। সস দিয়ে মাখিয়ে খাও। কী, लालों?
খুব ভালো হয় নি ভাবী। কেমন যেন ঘাসের মতো লাগছে।
নীলুর মুখ কালো হয়ে গেল। সে খুব যত্ন করে বানিয়েছে। শাহানা বলল, ঠাট্টা করছিলাম ভাবী। খুব চমৎকার হয়েছে।
সত্যি বলছ?
হ্যাঁ, সত্যি। এই যে তোমার গা ছুঁয়ে বলছি। ছোট ভাবী কোথায়?
নিউ মার্কেটে গিয়েছে, এসে পড়বে। যাও তো শাহানা, এগুলি দিয়ে আস। আমি চা নিয়ে আসছি।
শাহানা টেতে খাবার সাজাতে-সাজাতে বলল, এ বাড়ির কেউ আমাকে পছন্দ করে না, ভাবী।
নীলু চুপ করে রইল। লক্ষ বার শাহানার মুখে এই কথা তার শুনতে হয়েছে। জবাব দিতে হয়েছে। জবাব শাহানার পছন্দ হয় নি। যে কোনো কারণেই হোক, ব্যাপারটা শাহানার মনে গেঁথে গিয়েছে। এই কাঁটা সহজে তোলা যাবে না।
ভাবী।
শুনছি। বল কী বলবে।
মার অসুখ হয়েছে, তাঁকে হাসপাতালে নিয় গেছে–এই খবর কেউ আমাকে দেয় নি।
সঙ্গে সঙ্গে দেয় নি, কিন্তু দিয়েছে। তৎক্ষণাৎ দেওয়ার উপায় ছিল না। তোমার ভাই এবং রফিক, কেউ বাসায় ছিল না। ওরা ফিরেছে অনেক
ইচ্ছা করলে কিন্তু দেওয়া যেত ভাবী। হাসপাতাল থেকে সহজেই টেলিফোন করতে পারতে। আমার টেলিফোন নাম্বার তোমরা জানি।
ঝামেলার মধ্যে এটা মনে আসে নি।
আমাকে যদি তোমরা পছন্দ করতে, তাহলে ঠিকই মনে আসত।
নীলু হেসে ফলল। শাহানা শুকনো গলায় বলল, ভাইয়া এত বড়ো প্রমোশন পেয়েছে, এই খবরও কিন্তু দাও নি।
দিতে চেয়েছিলাম। তোমার ভাইয়া নিষেধ করল। তার স্বভাব তো তুমি জান। কাউকেই কিছু জানাতে চায় না।
নীলুর কথা শেষ হবার আগেই শাহানা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার রাষ্ট্রতিমতো কান্না পাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেন সে এ বাড়িতে এসেছে। কোনো দরকার ছিল না। কেউ তাকে নিয়ে ভাবে না। সে কেন ভাববে? তার এমন কী গরজ? টুনিকে আনিস ভাইয়ের খবর আনতে পাঠিয়েছিল। সেও ফিরে আসে। নি। কেনইবা আসবে? সে তাদের কে? কেউ না।
শাহানা খাবার কিছুই মুখে দিল না। দু চুমুক চা খেয়ে ছাদে গেল। আনিসের ঘর খোলা। সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হালকা স্বরে বলল, আসব আনিস ভাই?
আনিস নিজের বিস্ময় চাপা দিয়ে হাসিমুখে বলল, আরে কী মুশকিল, এস।
করছেন কী?
তেমন কিছু না। বসা শাহানা।
বসবার সময় নেই। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে চলে যাব। ম্যাজিক নাকি ছেড়ে দিয়েছেন?
কে বলল?
টুনি। এখন নাকি মাস্টারি করেন?
পাগল হয়েছ। মাস্টারি করব কোথায়? দুটো প্রাইভেট টিউশ্যনি জোগাড় করেছি। সন্ধ্যাবেলা তাই করি। খাদ্য জোগাড় করতে হবে না? ম্যাজিক দিয়ে পেটে ভাত আসছে না। একটু বসনা শাহানা।
