শাহানা বসল। আনিস বলল, চা খাবে? চা বানাব?
হুঁ, খেতে পারি। আচ্ছা আনিস ভাই, আপনাকে একটা কার্ড পাঠিয়েছিলাম, পেয়েছিলেন?
পেয়েছি।
এক বার তো জিজ্ঞেস করলেন না, আমার কী অসুখ হয়েছিল।
চোখের সামনে তোমাকে এত সুস্থ দেখছি যে অসুখের কথা আর মনে এল না।
এখন অন্তত জিজ্ঞেস করুন।
কী হয়েছিল?
ঝুধরনের ভ্রমুখ। আমি বোধহয় বেশিদিন বাঁচব না।
কী বলছ তুমি!
সত্যি বলছি। বিশ্বাস করুন। এই খবরটা আর কাউকে বলি নি। শুধু আপনাকে বললাম।
অসুখটা কী?
তা আমি জানি না।
শাহানা তার মুখ খুব করুণ করতে চেষ্টা করল। যেন তার সত্যি-সত্যি খুব খারাপ একটা অসুখ হয়েছে। মৃত্যু অবধারিত। আর মাত্র অল্প ক দিন সে বাঁচবে। পৃথিবীর চমৎকার সব দৃশ্য আগের মতোই থাকবে। বর্ষারাতে বৃষ্টি পড়বে ঝমোঝম করে। চৈত্র মাসে উথালিপাথাল জোছনা হবে। শুধু সে দেখতে পাবে না। ভাবতে-ভাবতে তার চোখে পানি এসে গেল। গাল বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে, কিন্তু আনিস সেটা দেখছে না। সে চা বানানোয় ব্যস্ত। অথচ শাহানার খুব ইচ্ছা, আনিস দৃশ্যটা দেখুক।
আনিস না দেখলেও জহির দৃশ্যটি দেখল। সে ছাদে এসেছিল সিগারেট খাবার জন্যে। আনিসের ঘর খোলা দেখে উঁকি দিয়েই চট করে সরে গেল। ছাদের এক কোণায় দাঁড়িয়ে পরপর দুটি সিগারেট শেষ করে নিঃশব্দে নেমে গেল। আনিসের খোলা দরজা দিয়ে তার আরেক বার তাকানোর ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তাকাল না। সব ইচ্ছাকে প্রশ্রয় দিতে নেই। সে নিচে নেমে এল।
বসার ঘরে দ্বিতীয় বার ঢুকতে ইচ্ছা করছে না। হোসেন সাহেবের হোমিওপ্যাথির গল্প তাকে কখনো আকর্ষণ করে নি, আজ আরও করছে না। ঘরে ঢুকলেই তিনি আবার শুরু করবেন। হাসি—হাসি মুখে গল্প শুনতে হবে। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতে হবে, যাতে মনে হয় খুব আগ্রহ নিয়েই সে শুনছে।
এই যে জহির, তুমি এখানে?
জ্বি।
হোসেন সাহেবের হাতে মোটা একটা বই। তিনি দ্রুত বইয়ের পাতা ওন্টাতে লাগলেন, তোমাকে খুব ইন্টারেস্টিং একটা কেইস হিস্ট্রি পড়ে শোনাই।
জ্বি আচ্ছা।
বিরক্ত হচ্ছে না তো আবার?
জ্বি-না, বিরক্ত হব কেন?
আসি, ঘরে আস।
তারা ভেতরে গিয়ে বসল। জহির প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল মুখ হাসি-হাসি রাখতে। হোসেন সাহেব কী বলছেন, তা শুনতে। কিন্তু মন বসছে না। হোসেন সাহেব চোখ বড়ো-বড়ো করে বলছেন, বিমলা নামের একট মেয়ের কেইস হিস্ট্রি। বয়স একুশ, বিবাহিতা, গাত্রবৰ্ণ গৌর, একহারা গড়ন, মৃদুভাষী, ভোগী স্বভাব, কিছুটা অলস। পয়েন্টগুলি মন দিয়ে শুনছ তো? প্রতিটি পয়েন্ট কিন্তু ইম্পটেন্ট। ডায়াগনেসিস এই পয়েন্টগুলির উপর হবে।
আমি মন দিয়েই শুনছি।
আরেক কাপ চা খেয়ে শুরু করা যাক। কী বল তুমি?
না, থাক।
থাকবে কেন? খাও আরেক কাপ। আমি বৌমাকে বলে আসছি। তোমাকে পেয়ে ভালোই হল। কারো সঙ্গে ডিসকাস করতে পারি না। কেউ উৎসাহ দেখায় না। তোমার ভালো লাগছে না। শুনতে?
জ্বি, লাগছে।
লাগতেই হবে। গল্প-উপন্যাসের চেয়ে এগুলি অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং।
হোসেন সাহেব চায়ের কথা বলতে গেলেন।
জহিরদের রাতে এ বাড়িতে খাওয়ার কথা ছিল না। নীলুর পীড়াপীড়িতে খেয়ে যেতে হল। অল্প সময়েই ভালো আয়োজন হয়েছে। রফিক নিউ মাকেট থেকে বিশাল সাইজের কৈ মাছ নিয়ে এসেছে। মটরপোলাও, কৈ মাছ ভাজা এবং ভূনা গোশত। খেতে বসে শাহানা বলল, আনিস ভাইকে ডেকে নিয়ে এলে কেমন হয়? বেচারা বোধহয় আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খাবে।
নীলু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার তাকাল শাহানার দিকে। শাহানা সেই দৃষ্টি; অর্থ বুঝল না। সে হাসিমুখে বলল, ভাবী, আনিস ভাইকে আমি ডেকে নিয়ে আসি? তোমাদের খাবারে কম পড়বে না তো আবার?
নীলু কিছু বলার আগেই জহির বলল, কম পড়বে কেন? তোমরা খাওয়া শুরু কর, আমি ডেকে নিয়ে আসছি।
শাহানা বলল, তোমার যেতে হবে না, আমি যাচ্ছি। যাব আর আসব।
শাহানা বের হয়ে গেল। জহির তাকিয়ে আছে নীলুর দিকে। নীলু কি তা বুঝতে পারছে? সে এক বারও জহিরের দিকে তাকাচ্ছে না। হোসেন সাহেব বললেন, হাত গুটিয়ে বসে আছ কেন, খাওয়া শুরু কর।
জহির বলল, আনিস সাহেব এলেই শুরু করব।
আনিসকে পাওয়া গেল না। সে প্রাইভেট টুৰ্যশানিতে গিয়েছে। শাহানাকে দেখে মনে হল, সে খুব মন খারাপ করেছে। তার মুখ শুকনো। চোখ দুটি छ्ग्रंथ।
হোসেন সাহেব বললেন, অপূর্ব রান্না হয়েছে বৌমা, অপূর্ব! কৈ মাছ কি আরেকটা নেওয়া যাবে?
মাতাল অবস্থায়
রফিকের ধারণা ছিল, মাতাল অবস্থায় লোকজন সত্যি কথা বলে। সে অবশ্যি মাতাল দেখেছে খুব কম। যাদের দেখেছে তাদের সবই কুলি বা রিকশাওয়ালা শ্রেণীর। এদের এক জন কাপড়াচোপড় খুলে মেয়েদের দিকে অশ্লীল ভঙ্গি করছিল। এতে আশপাশের পারলিক খেপে গিয়ে তাকে ধোলাই দিতে শুরু করে। সে হাতজোড় করে বারবার বলতে থাকে।–ভাই মাফ করেন। আর জীবনে মদ খামু না। এই কানো ধরলাম ভাই। দ্বিতীয় মাতালটি একটি ঠেলাগাড়ির উপর বসে বেশ করুণ সুরে গান গাচ্ছিল। ঠেলাওয়ালা সবাইকে হাসিমুখে বলতে—বলতে যাচ্ছে–ব্যাটা মদ খাইছে। ঠেলাওয়ালাকে খুব হাসিখুশি মনে হচ্ছিল। এক জন মাতাল তার গাড়িতে বসে সবার চিত্ত বিনোদনের চেষ্টা করছে, এটা বোধহয় তাকে খুব আনন্দ দিচ্ছিল। পারলিকও দৃশ্যটিতে মজাই পাচ্ছিল।
মাতালরা সত্যবাদী হয়, এ-রকম ধারণা হবার মতো কোনো কারণ রফিকের জানা ছিল না। তবু কেন জানি সে এটা স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে ধরেই নিয়েছিল। ইদরিসের ব্যাপারটা সেই কারণে তাকে চিন্তায় ফেলে দিল। ব্যাটার মতলবটা কী?
