শাহানা অনেকক্ষণ থেকেই ছাদে হাঁটছে। আনিসকে লক্ষ করছে। কিন্তু আনিস এক বারও তাকাচ্ছে না। কেউ এক জন যে ছাদে আছে, এই বোধাটুকুও সম্ভবত তার নেই। শাহানা দরজার প্লাশে এসে দাঁড়াল। হালকা গলায় ডাকল, আনিস ভাই।
আনিস অবাক হয়ে বলল, কী ব্যাপার, অসময়ে?
অসময়ে মানে? আপনার এখানে কি পঞ্জিকা দেখে আসতে হবে?
না, তা হবে না। ভেতরে আসবে?
আসতে বললে হয়তো আসব। আগে বলুন।
আস। ভেতরে আস।
আপনি বাক্স হাতে নিয়ে কী করছেন? ধ্যান করছেন নাকি? অনেকক্ষণ থেকে লক্ষ করছি। এক সারা দেখি বিড়বিড় করে কথা বলছেন। কার সঙ্গে কথা বলছেন? বাক্সটার সঙ্গে?
দাঁড়াও, তোমাকে ব্যাপারটা বলি! এই বাক্সটাকে বলে টু-ওয়ে বক্স। দুটো কম্পার্টমেন্ট আছে। একটা দেখা যায়, অন্যটা দেখা যায় না!
আনিস দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে ফেলল। স্প্রীংটা কীভাবে কাজ করে সেটা দেখাল। বর্তমানে কী সমস্যা হচ্ছে, সেটা বোঝাতে চেষ্টা করল। শাহানা গভীর মনোযোগে তাকিয়ে আছে। যেন সব কিছু পরিষ্কার বুঝতে পারছে! আনিস বলল, কত সহজ টেকনিকে কেমন চমৎকার একটা কৌশল, দেখলে?
হ্যাঁ, দেখলাম। আপনি কথা বলার সময় আমি একটা কথাও বলি নি, চুপ করে শুনেছি। এখন আমি কিছুক্ষণ কথা বলব, আপনি চুপ করে শুনবেন। আমার কথা শেষ না-হওয়া পর্যন্ত মুখ খুলবেন না। হাঁ ই কিছুই বলবেন না।
আনিস অবাক হয়ে তাকাল। শাহানার চোখ জ্বলজ্বল করছে। মুখ রক্তলাভ। গলার স্বর গাঢ়। ব্যাপারটা কী!
আনিসভাই।
বল।
শুক্রবারে আমার বিয়ে, আপনি তো জানেন। আপনাকে কার্ড দেওয়া হয়েছে না?
হয়েছে।
এখন আপনি যদি মনে করেন। আপনার সাহস আছে, তাহলে আমি আপনার সঙ্গে অন্য কোথাও চলে যেতে পারি। কোর্টে কীভাবে নাকি বিয়ে করে। আমি তো কিছু জানি না, আপনিই ব্যবস্থা করবেন। আমার কাছে চারশ টাকা আছে।
আনিস হতভম্ব হয়ে গেল। কী বলছে শাহানা! সুস্থ মাথায় বলছে, না। অন্য কিছু?
আনিস ভাই, আমি একটা স্যুটকেস গুছিয়ে রেখেছি। আপনি আপনার দরকারী জিনিসগুলি গুছিয়ে নিন।
এসব তমি কী বলছ শাহানা!
আপনি কি চান না। আমি সারা জীবন আপনার সঙ্গে থাকি?
চাইলেই কি সব হয়? আমি তোমাকে নিয়ে যাব কোথায়? কী খাওয়াব তোমাকে?
শাহানা উঠে দাঁড়াল। শান্ত স্বরে বলল, আনিস ভাই, আমি যাচ্ছি।
শাহানা শোন, একটা কথা শোন!
শাহানা দাঁড়াল না। সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত নেমে গেল। আনিস সন্ধ্যা পর্যন্ত তার ঘরে বসে রইল। সন্ধ্যা মেলাবার পর নিচে নেমে এল। বারান্দায় নীল কী যেন করছে। আনিসকে দেখেই বলল, তোমার কি শরীর খারাপ নাকি আনিস?
জ্বি না।
চোখ মুখ বসে গিয়েছে।
মনটা ভালো নেই ভাবী। বারান্দায় কী করছেন?
কিছু করছি না। তুমি আমাকে দুটো মোমবাতি এনে দিতে পারবে? আমাদের বাড়িতে ইলেকট্রিসিটি নেই।
আনিস মোমবাতি আনতে গেল। মোমবাতি এনে দেখল, ইলেকট্রিসিটি এসে গেছে। সমস্ত বাড়ি আলোয় আলোয় ঝলমল করছে। একটি রিকশায় করে কারা যেন এসেছে, সম্ভবত নীলু ভাবীয় মা। বিয়ে বাড়ির লোকজন আসতে শুরু করেছে। করাই তো উচিত। আনিস মন্থর পায়ে দোতলায় উঠে এল।
শাহানার বিয়ে হয়ে গেল
তেমন কোনো ঝামেলা ছাড়াই শাহানার বিয়ে হয়ে গেল। বড়ো সমস্যা ছিল বিয়ের খরচের সমস্যা। তার সমাধান হল অদ্ভুত ভাবে। হোসেন সাহেব কবির মাস্টারকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন রফিকের শ্বশুর রহমান সাহেবকে দাওয়াত দিতে। দুজনই ভেবে রেখেছিলেন পরিচয়পর্ব খুব সুখকর হবে না। হোসেন সাহেব আসতে চান নি। তিনি বারবার বলছিলেন, ছোট বৌমা আগে যাক, বাবার সঙ্গে ঝগড়া মিটিয়ে আসুক, তারপর আমি যাব। মনোয়ারা বিরক্তিতে মুখ কুঁচকেছেন, ছোট বৌমা যেতে চাচ্ছে না, তাকে জোর করে পাঠাব?
তাকে জোর করে পাঠাবে না, তাহলে আমাকে জোর করে পাঠােচ্ছ কেন?
বাজে কথা বলবে না। তৈরি হও, কবির ভাই যাবে তোমার সাথে। কথাবার্তা যা বলবার সেই-ই বলবে, তুমি চুপ করে থাকবে।
তাহলে আমার যাবার আর দরকারই—বা কী?
আবার বাজে কথা?
হোসেন সাহেব চুপ করে গেলেন। দাওয়াতের চিঠি হাতে এমনভাবে বের হলেন যেন ফাঁসিকাঠে ঝোলবার জন্যে যাচ্ছেন। ইয়া মুকাদেমু পড়ে ডান পা ফেললেন। আয়াতুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দিলেন। দোয়ার কারণেই হোক বা অন্য কোনো কারণেই হোক রফিকের শ্বশুর হোসেন সাহেবকে জড়িয়ে ধরলেন। আন্তরিক স্বরে বললেন, আমার এত সৌভাগ্য, এত বড় মেহমান আমার ঘরে! আদরযত্বের চূড়ান্ত করলেন ভদ্রলোক। নিজের মেয়ের কথা এক বারও জিজ্ঞেস করলেন না। কবির মাস্টার সে-প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আমার মেয়ের সঙ্গে যা বোঝাপড়া তা আমাকেই করতে দিন। ঐটা বাদ থাক। আপনি আপনার নীলগঞ্জের ব্যাপারটা বলুন। এই বয়সে একটা শক্ত কাজ হাতে নিলেন।
যখন বয়স কম ছিল, তখন এইসব চিন্তা মাথায় আসে নি। এখন এসেছে। এখন কি বয়সের কারণে ঐ চিন্তা বাদ দেওয়া ঠিক হবে?
মোটেই ঠিক হবে না। বয়স কোনো ব্যাপার নয়।
আপনি আমার মনের কথাটা বলেছেন বেয়াই সাহেব।
এক দিন যোব আপনার নীলগঞ্জ দেখতে।
ইনশাআল্লাহ। বড়ো খুশি হলাম বেয়াই সাহেব, বড়ো খুশি হলাম।
শাহানার বিয়েতে তিনি থাকতে পারবেন না বলে খুব দুঃখ করলেন, কারণ আজ সন্ধ্যায়। তাঁকে ব্যাংকক যেতে হচ্ছে। কিছুতেই থাকা সম্ভব নয়।
বুঝলেন বেয়াই সাহেব, এক দিন আগে জানতে পারলেও ব্যাংককের প্রোগ্রাম ক্যানসেল করতাম। এখন তো সম্ভব না। আপনি কিছু মনে করবেন। না।
