তুমি নিজেই দু কাপ খাও। ভালো সুম হবে।
রফিক চা বানাতে পারল না! ঘরে চায়ের পাতা নেই। নীলুর খুবই খারাপ লাগতে লাগল। বেচারা এত কষ্ট করে পানি টানি গরম করেছে।
সরি রফিক। আমি খেয়াল করি নি!
সরি হবার কোনোই কারণ নেই ভাবী। আজকের দিনটিই আমার জন্য খারাপ। যে কটা কাজ করতে গিয়েছি, প্রতিটি ভণ্ডুল হয়েছে।
মোড়ের চায়ের দোকানটা খোলা আছে না? ওখান থেকে খেয়ে আস।
দরজা খুলে দেবে কে?
আমি জেগে থাকব।
রফিক সঙ্গে সঙ্গে রওনা হল। তার মুখ হাসি-হাসি। নীলু বসার ঘরে অপেক্ষা করতে লাগল। এক বার যখন বের হয়েছে এত সহজে ফিরবে না। শাহানার ঘরে এখনো বাতি জ্বলছে। এক বার উঁকি দিয়ে দেখলে হয়। কিন্তু কেমন আলসে লাগছে। উঠতে ইচ্ছা করছে না।
মাঝে মাঝে এমন আলসেমি লাগে। কোনো কিছুই করতে ইচ্ছা করে না। তারও কি বয়স হয়ে যাচ্ছে? হচ্ছে তো নিশ্চয়ই, কিন্তকেন জানি তা মেনে নিতে ইচ্ছা করে না। আয়নায় নিজেকে দেখলে মনে হয়, কই, বয়স তো কিছুই বাড়ে নি। সুন্দর একটি মায়াভিরা মুখ। ঘন কালো চোখ। এই চোখ নিয়ে কত কাণ্ড। তাদের কলেজের ইংরেজির স্যার আফতার উদিনের কাছে গিয়েছে পার্সেন্টেজ দিতে। ক্লাসে দেরি করে এসেছিল, সেখানে দেয়া হয় নি। আফতার স্যার রেজিস্টার খাতা খুলে বললেন, তোমার কটা পার্সেন্টেজ। দরকার বল তো? মোটে একটা? নীলু বিস্মিত হয়ে তাকাতেই তিনি বললেন, বাহ, তোমার চোখ তো ভারি সুন্দর! ভালো করে তাকাও আমার দিকে। এই বলেই কিছু বোঝাবার আগেই গালে হাত দিয়ে নীলুর মুখ তাঁর দিকে ফিরিয়ে দিলেন। তখন বিকেল হয়ে গেছে। কমন রুমে একটি মানুষ নেই। আফতার স্যার তাকাচ্ছেন অদ্ভুত চোখে; কী সৰ্ব্বনাশা। কাণ্ড! প্রতিটি মেয়ের জীবনেই এ-রকম দু-একটা ঘটনা ঘটে, যা চিরকাল গোপন রাখতে হয়। কোথায় এখন আফতার স্যার কে জানে। কী সুন্দর ভরাট গলায় শেকসপীয়ার পড়াতেন! এখনো কানো বাজে।
Tell them that God bids us do good for evil.
And thus I clothe my naked villainy
With odd old ends stolen out of Holy Writ.
And seem a saint when most I play the devil.
কিং রিচার্ড দ্য থার্ড। আচ্ছা, তার যদি আফতার স্যারের সঙ্গে বিয়ে হত তাহলে কেমন হ৩? জীবনটা নিশ্চয়ই সম্পূৰ্ণ অন্য রকম হত। টুনি জন্মাত না। অন্য কোনো মেয়ে জন্মাত কিংবা কোনো ছেলে। এখন সে যেমন টুনিকে ভালোবাসে, সেই ছেলে বা মেয়েটিকে সে তেমনই ভালোবাসত। বাসত না?
ভাবী। একা একা বসে আছ কেন?
শাহানা বের হয়ে এসেছে। একটা সাদা চাদর এমনভাবে গায়ে জড়িয়েছে। যে, অদ্ভুত লাগছে দেখতে।
কথা বলছি না কেন ভাবী?
রফিকের জন্যে বসে আছি। রফিক দোকানে চা খেতে গিয়াছে। ঘরে চা ছিল না।
ছিল না, তবু খেতেই হবে? ছেলে হবার কত মজা, দেখলে ভাবী? একটা ছেলে যা চাইবে, সবাই তাকে তা করতে দেবে, কিন্তু একটা মেয়েকে দেবেন!
আমি দেব। তুমি যদি এখন বাইরে চা খেতে যেতে চাও, আমার কোনো আপত্তি নেই, যেতে পার।
শাহানা গভীর হতে গিয়ে হেসে ফেলল। নীলুও হাসল। শাহানা বলল, তুমি শুয়ে পড়, আমি দরজা খুলে দেব। আমার ঘুম আসবে না। রাতে আমি প্রায় জেগেই থাকি। দিনে ঘুমাই।
অভ্যেসটা ভালো, বিয়ের পর তাহলে আর খুব কষ্ট হবে না। কষ্ট হবে না কেন? বিয়ের পর অনেক দিন পর্যন্ত স্বামী নামক জিনিসটি বৌদের রাতে ঘুমুতে দেয় না।
শাহানা কিছু বলল না। নীলু লক্ষ করল মেয়েটির ফর্সা গাল টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। কথাগুলি বলা ঠিক হয় নি। নীলুর লজ্জা লাগতে লাগল। এত বাচ্চা মেয়ে। জীবন সম্পর্কে কোনো বোধ পর্যন্ত জন্মায় নি। এত তাড়াতাড়ি বিয়ের ব্যবস্থা করা ঠিক হয় নি।
দাঁড়িয়ে আছ কেন শাহানা, ধস।
শাহানা বসল না। দাঁড়িয়েই রইল। রফিক এখনো আসছে না। এক ঘণ্টার মতো হয়ে গেল। কী যে সে করে!
বাহান্নটা কার্ড
বাহান্নটা কার্ড বাহান্ন রকম।
দর্শকরা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করবেন। তারপর ফিরিয়ে দেবেন। ম্যাজিশিয়ানকে। ম্যাজিশিয়ানের হাতে নয়, টেবিলে রাখা একটি চারকোণা বাক্সে। ম্যাজিশিয়ান দূর থেকে মন্ত্র পড়বেন। ম্যাজিক ওয়াণ্ড শূন্যে দোলাবেন, ওমনি বাহান্নটি তাস হয়ে যাবে বাহান্নটি সাহেব। খেলার আসল মজাটা হচ্ছে ম্যাজিশিয়ান এক বারও হাত দিয়ে তাস ছেবেন না। তিনি দাঁড়িয়ে থাকবেন। দূরে। কাজেই দর্শকরা এক বারও ভাববে না। এর মধ্যে হাতসাফাইয়ের কিছু আছে। অসাধারণ একটি খেলা, তবে পুরোপুরি যান্ত্রিক। ম্যাজিশিয়ানের করবার কিছু নেই। যা করবার স্প্রিং লাগানো কাঠের বাক্সটাই করবে। তাসের প্যাকেট রাখামাত্র তা চলে যাবে লুকানো একটি খোপে। উপরে উঠে আসবে আগে থেকে রাখা এক প্যাকেট তাস। তাসের বদলে অন্য কিছুও উঠে আসতে পারে। একটি ডিম উঠে আসতে পারে। ছোট্ট চড়ুইছোনা উঠে আসতে পারে। কিন্তু তা করা ঠিক হবে না। তাহলে দর্শকরা ভাববে কাঠের বাক্সেই কিছু একটা আছে। তখন তারা বাক্স পরীক্ষা করতে চাইবে। তাসের বদলে যদি তাস আসে তাহলে কোনো সমস্যা হবে না। দর্শকরা ভাববে গণ্ডগোলটি তাসে। তারা ব্যস্ত থাকবে তাস পরীক্ষায়। ম্যাজিক হচ্ছে মনস্তত্ত্বের খেলা।
আনিস স্প্রিং-দেওয়া বাক্সটি নিজেই বানিয়েছে, কিন্তু ঠিকমতো কাজ করছে না। ডালা নেমে আসার সময় ঝাপ্ত করে শব্দ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সব সময় নামছেও না। স্প্রিংটি আরো শক্ত করে সেই ত্রুটি দূর করা যায়, কিন্তু তাতে ঝাপ্ শব্দ আরো বেড়ে যায়। এই মুহূর্তে সেই শব্দ-সমস্যার কোনো সমাধান মনে আসছে না।
