শারমিন নিজেই চা বানোল। বাবার জন্যে কিছু করতে ইচ্ছা করে ইদানীং, করা হচ্ছে না। বিয়ের পর আরো হবে না। এই মানুষটি পুরোপুরি নিঃসঙ্গ হয়ে যাবেন। সারা দিন নিজের কাজ দেখে ফিরে আসবেন জনমানবহীন একটি বাড়িতে। হয়তো আবার কুকুর পুষিবেন। দিন কয়েক আগেই সরাইলের দুটি কুকুর আনা হয়েছে। কিন্তু পছন্দ না-হওয়ায় ফেরত পাঠিয়েছেন। এ-রকম হতেই থাকবে। বিভিন্ন জায়গা থেকে কুকুর আসবে, এদের পছন্দ হবে না। আবার সেগুলি ফেরত যাবে।
বাবার জীবনের শেষ অংশ কেমন হবে? এদেশের অসম্ভব বিত্তশালী এক জন মানুষ মারা যাবেন একা একা? আসলেই কি বিপুল বৈভবের তেমন কোনো দরকার আছে?
আফা।
শারমিন চমকে তাকাল। জয়নাল,-কখন যে নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
কি ব্যাপার জয়নাল?
আপনের কাছে যে আসে এক জন দাড়িওয়ালা মানুষ-রফিকসাব।
হ্যাঁ, কেন?
হেইন আইজি সইন্ধ্যায় আসছিলেন।
আমাকে আগে বল নি কেন?
মনে আছিল না আফা।
ডাকলে না কেন আমাকে?
ডাকতে গেছিলাম, জামিলার মা কইল আপনার মাথা ধরছে। দরজা বন্ধ কইরা ঘুমাইতাছেন।
ও আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি যাও।
জয়নাল গেল না। মাথা নিচু করে পাশেই দাঁড়িয়ে রইল।
কিছু বলবে জয়নাল?
জ্বি।
বল।
জয়নাল একটা অদ্ভুত কথা বলল। সে নাকি তার ঘরে ঘুমুতে পারে না। জেগে কাটাতে হয়। কারণ সে প্রায়ই দেখে তার ঘরে মাটি সাহেব হাঁটছে কিংবা পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। ঘর অন্ধকার থাকলেই দেখা যায়। বাতি জ্বলিলে দেখা যায় না। শারমিনের বিস্ময়ের সীমা রইল না। বলে কী এ!
রোজ দেখ?
রোজ দেখতাম আগে। এখন সারা রাত ঘরে বাতি জ্বলে। আমারে অন্য একটা ঘরে থাকতে দেন। আফগা।
বেশ তো থাক অন্য ঘরে ঘরের তো অভাব নেই।
জয়নাল বেরিয়ে যেতেই শারমিনের মনে হল, সে মিথ্যা কথা বলেছে। উদ্দেশ্যও পরিষ্কার, একটা ভালো ঘর সে দখল করবে। উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য একটি চমৎকার গল্প সে ব্যবহার করছে। আমরা সবাই কি সে রকম করি না।
চা নিয়ে বারান্দায় যাওয়ামাত্রই রহমান সাহেব বললেন, তোমাকে একটা বড়ো খবর দেয়া হয়নি।
কী খবর?
এখন না, সে খবরটা বিয়ের পরপরই দেব।
শুধু শুধু তাহলে আমার মধ্যে কৌতূহল জাগিয়ে দিলে কেন?
ইচ্ছা করেই দিলাম।
রহমান সাহেব ছেলেমানুষের মতো হাসতে লাগলেন। যেন বুদ্ধি করে শারমিনের ভেতর কৌতূহল জাগিয়ে তুলতে পেরে তিনি খুব খুশি। কিন্তু শারমিন তেমন কোনো কৌতুহল অনুভব করল না। তার ঘুম পেতে লাগল।
আমি যাই বাবা, ঘুম পাচ্ছে।
আর একটু বস মা। রাত বেশি হয়নি।
শারমিন বসল। রহমান সাহেব সিগারেট ধরালেন। অন্তরঙ্গ সুরে বললেন, আমার সব কর্মচারী তোমার বিয়ে উপলক্ষে একটা বোনাস পাচ্ছে, তুমি জান?
জানি। ম্যানেজার সাহেব আমাকে বলেছেন।
আইডিয়াটা তোমার কেমন লাগল। মা?
ভালোই। প্রাচীন কালের রাজা-মহারাজাদের মতো মনে হচ্ছে। তাঁরাও তো নিজের পুত্র-কন্যাদের বিয়ে উপলক্ষে সবাইকে খেলাত-টেলাত দিতেন।
রহমান সাহেব উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলেন। শারমিনের কথাগুলি তাঁর বড়ো ভালো লাগল। অনেক রাত পর্যন্ত কন্যা ও পিতা বসে রইল মুখোমুখি!
আকাশে মেঘা জমতে শুরু করেছে। অনেক দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঠাণ্ডা বাতাস দিচ্ছে। বৃষ্টি হবে বোধহয়। রহমান সাহেব বললেন, যাও মা, শুয়ে পড়া। শারমিন নড়ল না। যেভাবে বসে ছিল সেভাবেই বসে রইল।
সাব্বির এল আট তারিখে। আগের বার এয়ারপোর্টে তাকে রিসিভ করবার জন্যে কেউ ছিল না। এবার অনেকেই এসেছে। সাৰ্বিরের মা অসুস্থ, তিনিও এসেছেন। এত লোকজনের মাঝখানে বিশাল একটা ফুলের তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে শারমিনের অস্বস্তি লাগছিল। ফুলের তোড়া, ফুলের মালা, এসব পলিটিশিয়ানদের মানায়-অন্য কাউকে মানায় না। তাছাড়া তোড়া জিনিসটাই বাজে। একগাদা ফুলকে জরির ফিতায় বেঁধে রাখা। অসহ্য! এরচে একটি দুটি গোলাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক ভালো। কোনো একটি ছবিতে এমন একটি দৃশ্য শারমিন দেখেছিল। রেল স্টেশনে একগাদা গোলাপ নিয়ে একটি মেয়ে তার প্রেমিকের জন্যে অপেক্ষা করছে। তার চোখে মুখে গভীর উৎকণ্ঠা। যদি সে না আসে? কত মানুষ নামল, কত মানুষ উঠল। কিন্তু ছেলেটির দেখা নেই। মেয়েটি প্লাটফরমের এক প্ৰান্ত থেকে অন্য প্ৰান্ত পর্যন্ত ছোটাছুটি করছে। হাত থেকে একটি একটি করে ফুল পড়ে যাচ্ছে। মেয়েটির সেদিকে খেয়াল নেই। শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল ছেলেটিকে। মেয়েটি সব ফুল ছুঁড়ে ফেলে জড়িয়ে ধরল। তাকে। চমৎকার ছবি।
কেমন আছ শারমিন?
ভালো। আপনি কেমন?
খুব ভালো।
এই নিন আপনার ফুল।
থ্যাংক ইউ। থ্যাংক ইউ ফর দি ফ্লাওয়ার্স।
সারিরের গায়ে ধবধবে সাদা একটা শার্ট। গাঢ় নীল রঙের একটা টাই। দীর্ঘ ভ্রমণজনিত ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই তার চেহারায়। কি চমৎকার লাগছে তাকে দেখতে! শারমিন ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস গোপন করল।
সাব্বির বলল, আমার সঙ্গে চল শারমিন। তোমার সঙ্গে অনেক কথা আছে।
উঁহু, এখন আপনার সঙ্গে যেতে পারব না।
কেন?
লজ্জা লাগবে।
সাব্বির এয়ারপোর্টের সকলকে সচকিত করে হেসে উঠল। এবং অত্যন্ত সহজ ভঙ্গিতে শারমিনের হাত ধরল। দৃশ্যটি এতটুকুও বেমানান মনে হল না। যেন এটাই স্বাভাবিক। সাব্বিরের মা একটু পেছনের দিকে সরে গেলেন। কলেজ-টলেজে পড়া কয়েকটি মেয়ে আছে তাঁর সঙ্গে। তারা মুখ নিচু করে হাসতে লাগল। শারমিনের লজ্জা লাগতে লাগল।
