নীলু ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, বাবলু কি পারবে তোমাকে ছেড়ে থাকতে?
পারবে। ও শক্ত ছেলে। তুই একটু বলে দেখ জামাইকে। নাকি আমি বলব?
তোমার বলতে হবে না। যা বলার। আমিই বলব। রাজি হতে চাইবে না হয়তো। কে চায় একটা বাড়তি ঝামেলা কাঁধে নিতে!
নীলু জবাব দিল না। রোকেয়া বললেন, তুই চাকরি করিস, এটা বোধহয় তোর শাশুড়ি পছন্দ করে না।
নীলু সে কথারও কোনো জবাব দিল না। সে বাবলুর ব্যাপারটি কী করে বলবে, তাই ভাবছিল। রোকেয়া বললেন, চল নিচে যাই। তোর শাশুড়ি বোধহয় খুঁজছেন।
তুমি যাও মা। আমি থাকি এখানে কিছুক্ষণ। প্রচণ্ড মাথা ধরেছে।
রোকেয়া নিচে নেমে গেলেন। তার কিছুক্ষণ পরই চায়ের কাপ হাতে শাহানা তাকে খুঁজতে এল। সে অবাক হয়ে দেখল, নীলু কাঁদছে।
কী হয়েছে ভাবী?
কিছু হয় নি।
তোমার জন্যে চা এনেছি।
চা খাব না, শাহানা।
একটু খাও ভাবী, আমি নিজে বানিয়েছি।
বলতে বলতে সেও কেঁদে ফেলল। কাউকে কাঁদতে দেখলেই তার কান্না পেয়ে যায়। নীলু অবাক হয়ে বলল, তোমার আবার কী হল?
শাহানা ফোঁপাতে লাগল। কিছু বলল না।
বাবলুকে রেখে রোকেয়া রাজশাহী চলে গেলেন। মনে করা হয়েছিল বাবলু। খুব কান্নাকাটি করবে, সে তেমন কিছুই করল না। রোকেয়া যখন বললেন, যাই বাবলু?
বাবলু ঘাড় কাত করল। যেন যাবার অনুমতি দিচ্ছে।
কাঁদবে না তো?
বাবলু মাথা নাড়ল। সে কাঁদবে না।
দীর্ঘদিন পর উত্তেজনা
রহমান সাহেব দীর্ঘদিন পর উত্তেজনা অনুভব করছেন।
মেয়ের বিয়েতে তিনি বড়ো রকমের একটা হৈচৈ করতে চান। সব ধরনের সামাজিকতা, উৎসব অনুষ্ঠান। তিনি মনেপ্ৰাণে অপছন্দ করতেন। এখনো করেন, কিন্তু শারমিনের বিয়ের অনুষ্ঠানের কথা মনে হলেই মনে হয় ঢাকা শহরের সবাইকে আনন্দ অনুষ্ঠানে ডাকা যায় না?
রাত জেগে আত্মীয়স্বজনদের লিস্টি তৈরি করেছেন। কেউ বাদ থাকবে না, সবাই আসবে। দাওয়াতের চিঠি নিয়ে লোক যাচ্ছে। প্রতিটি দাওয়াতের চিঠির সঙ্গে ঢাকায় আসা-যাওয়ার খরচ দেওয়া হচ্ছে।
তাঁর নিজের বাড়িটি প্রকাণ্ড, তবু তিনি আরেকটি দোতলা বাড়ি ভাড়া করেছেন। বিয়ের খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারটা একটা বড়ো হোটেলে সারবার জন্যে সবাই বলছিল। এতে খরচ বেশি হলেও ঝামেলা কম হবে। তিনি রাজি হন নি। তাঁর ঝামেলা করতে ইচ্ছা হচ্ছে। বাবুচিরা বিশাল ডেগচিতে পাক বসাবে। সকাল থেকেই ঘিয়ের গন্ধ ছড়িয়ে পড়বে চারদিকে। হৈচৈ ছোটাছুটি হবে। তবেই না আনন্দ!
এইটিই তো জীবনের শেষ ঝামেলা। আবার এক দিন শারমিনের বাচ্চার বিয়ের সময় ঝামেলা হবে। সেই ঝামেলায় তিনি অংশ নিতে পারবেন, এমন মনে হয় না। মানুষ নিজের মৃত্যুর ব্যাপারটি আগে আগে টের পায়।
রাত নটা বাজে। প্রচণ্ড গরম পড়েছে। রহমান সাহেব শারমিনের ঘরের দিকে রওনা হলেন। শারমিনকে নিয়ে বারান্দায় বসবেন। বারান্দায় বেশ হাওয়া।
শারমিনকে কেমন যেন রোগা— রোগ লাগছে। চোখের নিচে কালি। ওর কি ভালো ঘুম হচ্ছে না? অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিয়ের আগে আগে নানান ধরনের দুশ্চিন্তা মানুষকে কাবু করে ফেলে। শারমিনকেও নিশ্চয়ই করছে। এবং ওকে সাহস ও আশ্বাস দেবার কেউ নেই।
শরীরটা ভালো আছে তো মা?
ভালো আছে।
ঘুম হচ্ছে না। ভালো? মুখটা কেমন শুকনো লাগছে।
শারমিন মৃদুস্বরে বলল, যা গরম!
দোতলার ঘরটার এয়ারকুলার চালু করে ঘুমালেই পার।
না, ঐখানে আমার কেমন দম বন্ধ লাগে।
চা খাওয়া যাক, কি বল শারমিন?
গরমের মধ্যে আমি চা খাব না।
গরমের মধ্যেই চা ভালো। বিষে বিষক্ষয় হয়। যাও, চায়ের কথা বলে আস। তুমি চা না চাইলে ঠাণ্ডা কিছু নাও। এস কিছুক্ষণ গল্প করি। নাকি আমার সঙ্গে গল্প করতে ভালো লাগবে না?
ভালো লাগবে না কেন?
কেমন গম্ভীর মুখে বসে আছ, তাই বলছি।
শারমিন হাসল।
তোমার কটা কার্ড লাগবে, তা তো বললে না।
আমার কোনো কার্ড লাগবে না, বাবা।
কেন, লাগবে না কেন?
আমার কাউকে নিমন্ত্রণ করতে ইচ্ছা করছে না।
রহমান সাহেব অবাক হয়ে বললেন, কেন করছে না?
জানি না, কেন করছে না।
আমার মনে হয় তুমি সাময়িকভাবে একটা ডিপ্রেশনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলবো?
না-না, আমার কি কোনো অসুখ করেছে নাকি যে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলব?
তাও ঠিক।
রহমান সাহেব হাসলেন। শারমিনও হাসল।
শারমিন, সাব্বির কি ছ তারিখে আসছে?
ছ তারিখ কিংবা আট তারিখ?
তুমি কিন্তু এয়ারপোর্টে যাবে।
ঠিক আছে, যাব।
তুমি কিন্তু মা এখনো আমার চায়ের কথা বল নি। তুমি কি কোনো ব্যাপারে আপসেট?
না। আপসেট না।
সে আপসেট না, এই কথাটা ঠিক নয়। শারমিন এক অদ্ভুত সংশয়ে ভুগছে, যার উৎস সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। উৎসবের ছোঁয়া চারদিকে, কিন্তু এই উৎসব তাকে স্পর্শ করছে না। বাবা প্রতি রাতে বিয়ের নানান ব্যাপারে কত আগ্রহ নিয়ে গল্প করছেন, তাতেও মন লাগছে না। কেন লাগছে না? সাৰ্বিরকে কি সে পছন্দ করছে না? তাও তো সত্যি নয়।
মানুষ হিসেবে তাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় নি। যতটুকু দেখেছে, তার ভালোই লেগেছে। সাব্বিরের ভেতর এক ধরনের দৃঢ়তা আছে, থা ভালো লাগে। সব মেয়েই বোধহয় তার পাশে একজন শক্ত সবল মানুষ চায়, যার উপর নির্ভর করা চলে।
সে রাতদিন বইপত্র নিয়ে থাকে, এখানে কি শারমিনের আপত্তি? তাও তো নয়, পড়াশোনা সে নিজেও পছন্দ করে। জীবনের বেশির ভাগ সময় তো সে বই পড়েই কাটিয়েছে। তাহলে আপত্তিটা কোথায়?
