কবে?
এই সপ্তাহেই। তোমার জন্যে যে সুপারিশ আমি করেছিলাম, সেটিও বাতিল হয়েছে। কাজেই তুমি ফিরে যাবে তোমার আগের জায়গায়।
শফিক সিগারেট ধরাল। সুরেনসেন শান্ত স্বরে বলল, আমার ব্যাপারে ওদের ডিসিশন ঠিকই আছে। আমি মোটামুটি একটি অপদার্থ। কিন্তু তোমার ব্যাপারে ওরা ভুল করল। আমি খুবই দুঃখিত। ঠিক আছে, তুমি এখন যাও। আমি চার্জ হ্যাণ্ডওভার করব, তার জন্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করতে সাহায্য কর।
শফিক দীর্ঘ সময় তার ঘরে চুপচাপ বসে রইল। সুরেনসেনের বদলে অন্য কেউ এলে ভালো হবারই কথা। এখানকার এ্যাডমিনিসটেশন অত্যন্ত দুর্বল। প্রায় এগারটার মতো বাজে, এখনো অফিসের সব কর্মচারী এসে উপস্থিত হয় নি। কর্মচারীদের আনা-নেয়ার জন্যে কোনোগাড়ি নেই। অথচ গাড়ির স্যাংশন হয়ে আছে দু বছর আগে। অত্যন্ত জরুরি ছাপ মারা ফাইলগুলিও সে ফেলে রাখবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। তার মুড আসছে না, কিংবা মাথা ধরেছে। কিংবা এই ব্যাপারটি নিয়ে সে আরো চিন্তা-ভাবনা করতে চায়।
কিন্তু তবুও সুরেনসেন এক জন ভালো মানুষ। জগতের বেশির ভাগ অপটু মানুষরা সাধারণত ভালো মানুষ হয়ে থাকে, এর কারণ কি? নিজের অক্ষমতাকে ভালোমানুষী দিয়ে আড়াল করে রাখার একটা চেষ্টা কি?
সিদ্দিক সাহেব এসে ঢুকলেন। হাসি-হাসি মুখ। যেন এইমাত্র মজার কিছু ঘটে গেছে।
কী শফিক সাহেব, সকালবেলাতেই মুখ এমন গম্ভীর কেন? বড়ো সাহেবের খবরে আপসেট নাকি?
কিছুটা তো আপসেট বটেই।
যাকে নিয়ে আপসেট, সে কিন্তু সুখেই আছে। সকালে এসে গুনগুন করে গান গাইছে। আসলে বাংলাদেশ থেকে বেরুতে পেরে ব্যাটা খুশি।
তাই কি?
তাই। নয়তো এতটা ফুর্তি হবার কথা না। বেল টিপুন, চা দিতে বলুন। আপনি কি অফিশিয়াল অর্ডার পড়ে দেখেছেন?
না।
আছে আমার সঙ্গে। চা খাবার পর পড়ে দেখবেন।
শফিক ব্যাপারটা বুঝতে পারল না। অফিস অর্ডার সিদ্দিক সাহেবের কাছে যাবে কেন?
বুঝলেন শফিক সাহেব, এবার আমরা অফিস এ্যাডমিনিসটেসন টাইট করব। আপনার ফুল কো-অপারেশন দরকার। আমাদের নিজেদের সারভাইভেলের জন্যেই এটা দরকার। অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, এতে কোম্পানি বিজনেস গুটিয়ে ফেলবে। বিদেশী কোম্পানিগুলি এদেশে আসে কাঁচা পয়সা নিতে। ভ্যাকেশন কাটাতে তো আসে না। এদের পয়সা তৈরির সুযোগ করে দিতে না পারলে তো আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, কী বলেন?
শফিকের কাছে ব্যাপারটা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। হেড অফিস সিদ্দিক সাহেবের প্রমোশন দিয়েছে। অফিস অর্ডার তাঁর কাছে যাবার রহস্য হচ্ছে এই।
শফিক সাহেব।
বলেন।
বড়োসাহেবের একটা জমকাল ফেয়ারওয়েল দেবার ব্যবস্থা করা যাক। এই দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। ছোটখাট একটি ফাংশান, তারপর ডিনার। ফাংশান সবাই এ্যাটেণ্ড করবে, ডিনার শুধুমাত্র অফিসারদের জন্যে। এবং সবার তরফ থেকে তাঁকে আমরা একটা গিফটও দিতে চাই। কী দিলে ভাল হয় সেটা নিয়েও একটু চিন্তা করবেন। বাংলাদেশের ল্যাণ্ডস্কেপের উপর একটা অয়েলপেইন্টিং পাওয়া যায়। কিনা দেখতে হবে। আপনার চেনা-জানা কেউ আছে আটিস্ট?
না।
আমি অবশ্যি দু-এক জনকে চিনি। দেখব কি করা যায়।
সিদ্দিক সাহেব প্ৰায় এক ঘণ্টার মতো বসলেন। তিনি সম্ভবত এই হঠাৎ আসা প্রমোশনের খবরে শফিকের কাছে লজ্জিত বোধ করছিলেন। লজ্জা ঢাকার জন্যেই বাসা।
শাহানাদের কলেজ আজ দুপুরবেলা ছুটি হয়ে গেল। ফাষ্ট্র। ইয়ারের একটি মেয়ে কুমিল্লা যাচ্ছিল বাবা-মার সঙ্গে। এ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। মারা গেছে তিন দিন আগে। খবর পাওয়া গেছে আজ। সেজন্যেই ছুটি এবং শোকসভা।
শোকসভায় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হল। ভাইস-প্রিন্সিপ্যাল সাহেব বক্তৃতা দিলেন। যার ভাবাৰ্থ হচ্ছে, সংসার অনিত্য, জনিলে মরিতে হবে। ভাইস প্রিন্সিপ্যাল সাহেবের লম্বা বক্তৃতা দেয়ার বদঅভ্যাস আছে। সুযোগ পেয়ে তিনি প্রায় পঞ্চাশ মিনিট কথা বললেন। খুবই বিরক্তিকর ব্যাপার।
শাহানার সবচে প্রিয় বান্ধবী মিলি, ফিসফিস করে বলল, আগে আগে ছুটি হয়ে লাভটা কি হল? সেই তো সাড়ে বারটা বাজিয়ে ফেলেছে।
শাহানা বলল, এখন দেখবি লীনা আপা বক্তৃতা দেবে।
সর্বনাশ হবে তাহলে। লীনা। আপা ঝাড়া দু ঘণ্টা বলবে!
ওদের আজ নিউ মার্কেটে যাবার কথা। লীনা। আপা ডায়াসে গেলে সেটা সম্ভব হবে না। শাহানা অস্বস্তি নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। সম্ভবত আজ আপা কিছু বলবে না। ঘন ঘন ঘড়ি দেখছেন। তাঁরও নিশ্চয়ই কোথাও যাবার কথা। হলভর্তি ছাত্রী মুখ শুকনো করে বসে আছে। শোকসভা না হয়ে অন্য কিছু হলে এতক্ষণে স্যাণ্ডেল ঘষাঘষি শুরু হত। আজ তা করা যাচ্ছে না। দুঃখী-দুঃখী মুখ করে সবাই বসে আছে।
শাহানার মন খারাপ করিয়ে লীনা আপা বক্তৃতা দিতে উঠলেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মানসী কাব্যগ্রন্থে একটি কবিতার…
শাহানা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। সূচনা দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটা একটা লম্বা ব্যাপার হবে। অথচ যে মেয়েটি মারা গেছে তাকে এই আপা হয়তো চেনেনও না। কিন্তু কত ভালো ভালো কথা বলা হবে! এমনভাবে সবাই বলবে, যেন ঐ মেয়েটির মতো ভালো মেয়ে পৃথিবীতে জন্মায় নি। এবং তার মৃত্যুতে সবার একটা বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। কোনো মানে হয়? শাহানার ঐ মেয়েটির উপর রাগ লাগতে লাগল। কী দরকার ছিল তার কুমিল্লা যাবার?
