না।
রুটি বানাইয়া দেই? দুধ দিয়া চিনি দিয়া খান।
কিছু খাব না রে শওকত। তুই যা, পানির অবস্থাটা কি খোঁজ নিয়ে আয়।
না খাইয়া থাকবেন। সারা রাইত?
হুঁ। একটা কথা মন দিয়ে শোন শওকত। এদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ পেটে খিদে নিয়ে ঘুমুতে গেছে। সুস্থ মানুষ। আর আমি অসুস্থ। খেতে ইচ্ছা করছে না। আমি এক বেলা না খেলে কিছু যাবে-আসবে না।
কবির সাহেবের মন অন্য একটি কারণেও বেশ খারাপ। ঢাকা থেকে নীলু হঠাৎ করে তাঁকে দীর্ঘ একটি চিঠি লিখেছে। সে চিঠিতে শাহানার সেকেণ্ড ডিভিশনে মাটিক পাশের খবরের সঙ্গে তার বোন বিলুর মৃত্যুসংবাদ আছে। শেষ লাইনটিতে সে লিখেছে, মামা, আপনি তো অনেক জ্ঞানী মানুষ, আপনি আমাকে বলুন, এত কষ্ট কেন মানুষের? চিঠি পড়ে তিনি চোখ মুছেছেন। এটাও বয়সের লক্ষণ। মন দুর্বল হয়ে গেছে। সামান্যতেই চোখ ভিজে ওঠে।
দুপুর-রাতে শওকত খবর নিয়ে এল, পানি কমতে শুরু করেছে। এই খবরের আনন্দেই সম্ভবত কবির সাহেবের জ্বর কমে গেল। তিনি হাসিমুখে বললেন, একটু যেন খিদে–খিদে লাগছে রে শওকত।
ভাত খাইবেন?
দে, চারটা ভাতাই খাই। তরকারি কী?
খইলাসা মাছ ডেঙ্গা দিয়া রাঁধছি। মাষের ডাইল আছে।
খেয়েই ফেলি চারটা।
খেতে খেতেই তিনি মনস্থির করলেন, আগামী কাল ভোরে ঢাকা যাবেন। সুখী নীলগঞ্জের কাজে হাত দেওয়া দরকার। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে 66छ।
শওকত।
জ্বি স্যার।
ঢাকা যাব। কাল। তুইও চল আমার সাথে।
জ্বি আচ্ছা।
বড়ো একটা কাজে হাত দেব। সুখী নীলগঞ্জ নীলগঞ্জের মানুষের আর কোনো দুঃখ থাকবে না।
শওকত তাকিয়ে থাকল। এই অদ্ভুত মানুষটিকে সে খুবই পছন্দ করে। সেও মজনু মিয়ার মতো মনে-মনে ভাবল, আমাদের স্যার খুব পাগলা।
কবির সাহেব যাবেন ঢাকা। ভৈরব রেল স্টেশনে আটকা পড়ে গেলেন। এক গ্লাস পানি খাবার জন্যে স্টেশনের পাশের এক হোটেলে ঢুকেছেন। ক্যাশবাক্স নিয়ে বসা মোটাসোটা লোকটি হী করে তাকিয়ে রইল-যেন ভূত দেখছে। কবির সাহেব বললেন, স্লামালিকুম। লোকটি জবাব দিল না।
পানি খাব। এক গ্রাস পানি দেওয়া যাবে?
লোকটি লাফিয়ে উঠল। কবির সাহেব ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন না।
স্যার, আমি আপনার ছাত্র।
ভালো আছে বাবা?
আমার নাম স্যার, ফজল।
ফজল পা ছুঁয়ে সালাম করল। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, সে কী করবে: ভেবে পাচ্ছে না। পানির গ্লাসের জন্যে নিজেই ছুটে গেল। কিন্তু ফিরে এল পানি ছাড়াই।
স্যার, বাড়িতে চলেন। বাড়িতে পানি খাবেন! কাছেই বাড়ি, দুই মিনিট লাগবে।
ঢাকার গাড়ি ধরব ফজল!
আমি স্যার গাড়িতে তুলে দেব।
পানিটা এখানেই খেয়ে গেলে হত না?
বাড়িতে খাবেন স্যার।
ফজল, কবির সাহেবের হাত থেকে ব্যাগ প্রায় ছিনিয়ে নিল। কবির সাহেব হাঁটতে শুরু করলেন। এ জাতীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি তাঁকে হতে হয়। অদ্ভুত অদ্ভুত জায়গায় তাঁর ছাত্র বের হয়ে যায়। মাঝে মাঝে তাকে বেশ অস্বস্তিতে পড়তে হয়। এক বার সান্তাহার যাচ্ছিলেন-ট্রেনে প্রচণ্ড ভিড়। টিকেট চেকার উঠেছে। টিকিট-নেই যাত্রীর সংখ্যাই বেশি। টিকিট চেকার দিব্যি বিনা টিকিটের যাত্রীদের কাছ থেকে এক টাকা দুটাকা করে নিয়ে নিচ্ছে। তার ভাব দেখে মনেই হচ্ছে না যে কাজটা অন্যায় এবং এ-রকম প্রকাশ্যে করাটা ঠিক হচ্ছে না। এক পর্যায়ে কবির সাহেব বললেন, আপনি কী করছেন এসব? টিকিট চেকার রাগী মুখে তাঁর দিকে তাকাল, সে থেমে থেমে বলল, স্যার, আপনি! সে এগিয়ে এসে সালাম করল।
তুমি কি বাবা আমার ছাত্র?
জ্বি স্যার।
তুমি তো আমাকেও লজ্জা দিলে। তোমার মতো ছাত্র তৈরি করল যে মাস্টার, সে কেমন মাস্টার?
টিকিট চেকার গাড়ির দরজার কাছে মুখ কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি দেখে কবির সাহেবের নিজেরই একটু খারাপ লগতে লাগল। কিছু না বললেই হত। মুখের কথায় কি আর অন্যায় বন্ধ হয়? দোষ তো তার একার নয়। লোকগুলি বিনা টিকিটে উঠল কেন? প্রথম অন্যায় তো করেছে। যাত্রীরা। দেশের সব মানুষই কি অসৎ হয়ে যাচ্ছে? নীতিবোধ নেই? ন্যায়-অন্যায় বিচার নেই?
সন্তাহার স্টেশনে টেন বদলের জন্যে কবির সাহেব নামলেন। টিকিট চেকার ছাত্র এসে উপস্থিত। কথা নেই বার্তা নেই, সুটকেস উঠিয়ে নিল হা05!
ব্যাপার কি!
বাসায় যেতে হবে স্যার।
আমি তো রংপুর যাব। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি।
রাতের বেলা যাবেন স্যার। রাতে একটা টেন আছে।
আজ বাবা বাদ দেওয়া যায় না?
না স্যার। আমার অনেক দিনের শখ, আপনাকে সাথে নিয়ে এক বেলা চারটা ভাত খাই। স্যার, আপনি বোধ হয় আমাকে চিনতে পারেন নি।
না।
আপনি স্যার পুরো এক বছর আমার কলেজের পড়ার খরচ দিয়েছেন! প্রতি মাসের তিন তারিখে আপনার কাছ থেকে নিয়ে আসতাম।
যেতে হল তাঁকে। গিয়ে মনে হল, ছেলেটি তাঁকে ইচ্ছা করেই বোধহয় এনেছে। বিশাল পরিবার। নিজের স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ে ছাড়াও তিনটি বড়ো বড়ো বোন, দুটি ভাই, বাবা এবং মা। সবাই মিলে দু কামরার রেলের কোয়ার্টারে আছে। কবির সাহেবের বেশ মন খারাপ হয়ে গেল।
ছেলেটি রাতে তাঁকে টেনে তুলে দিল। মৃদুস্বরে বলল, স্যার, বড়ো কষ্টে আছি। আপনি স্যার আমাকে বলেন, আমি কী করব।
তিনি কিছু বলতে পারলেন না। মাঝে মাঝে দারুণ সব অস্বস্তিতে পড়তে হয়।
ভৈরবেও এই জাতীয় অবস্থা হল। পানি খেতে গিয়ে তিনি আটকা পড়ে গেলেন। কোনো কিছুর বাড়াবাড়ি তাঁর পছন্দ নয়। ফজল সেই জিনিসটিই করতে লাগল। তাঁকে বসিয়ে রেখে—একটু আসি স্যার বলেই উধাও হয়ে গেল এবং ফিরে এল প্রকাণ্ড একটা রুই মাছ নিয়ে। কবির সাহেবের বিরক্তির সীমা রইল না। তাঁর ঢাকা যাবার দরকার।
দুপুরবেলা পিওন
দুপুরবেলা পিওন একটি রেজিস্ট্রি চিঠি দিয়ে গেছে।
