ওরা বেশ আগ্রহ নিয়েই প্রশ্নের জবাব দিল। গ্রামের ভিক্ষুকরা শহরের ভিক্ষুকদের মতো নয়, এরা কথা বলতে পছন্দ করে। জীবন সম্পর্কে আগ্রহ এখনো আছে। কবির সাহেব হাত-মুখ ধুয়ে উঠে দাঁড়াতেই ওদের এক জন চিকন সুরে বলল, চাচামিয়া, আট আনা পয়সা দেন। কবির সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, আমি ভিক্ষা দিই না।
ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তিনি উত্তরের সড়ক ধরলেন। সূর্য উঠে গেছে, এখন আর হাঁটতে ভালো লাগবে না। গ্রামে ভিক্ষুক বাড়ছে। খুব খারাপ লক্ষণ। এটা হতে দেওয়া যায় না। গ্রাম হচ্ছে উৎপাদনের জায়গা, এখানে ভিক্ষুক তৈরি হলে চলবে কীভাবে?
স্যার, স্নামালিকুম।
ওয়ালাইকুম সালাম। রকিব ভালো আছ?
জ্বি স্যার। একটু বসবেন না?
না, আরেক দিন।
রকিব সঙ্গে সঙ্গে আসতে লাগল। সে গ্রামে থাকে না। রাজশাহীতে ফুড সাপ্লাইয়ে কাজ করে। অল্প দিনের মধ্যেই পয়সাকড়ি করে ফেলেছে। বাড়ি এসেছে ঘর পাকা করবার জন্যে।
স্যার, একটা দোনলা বন্দুক কিনলাম।
তাই নাকি? বন্দুক কেন?
একটা বন্দুক থাকলে স্যার ডাকাতি হয় না। জানেন তো আশেপাশে খুব ডাকাতি হচ্ছে।
তাই নাকি? জানি না তো।
খুব হচ্ছে স্যার। এই গ্রামেও হবে। বন্দুকটা কিনলাম। এই জন্যেই। আসেন না স্যার, একটু দেখে যান।
বন্দুক-টন্দুকের ব্যাপারে আমার উৎসাহ নেই রকিব। বন্দুক দিয়ে কিছু হয় না।
বলেই তাঁর মনে হল কথাটা ঠিক না। মুক্তিযুদ্ধ বন্দুক দিয়েই করতে হয়েছে। বন্দুক একটা অত্যন্ত দরকারি জিনিস।
রকিব!
জ্বি, স্যার।
বন্দুক দিয়ে কিছু হয় না, তোমাকে যে বললাম-এটা ঠিক না। বন্দুকের দরকার আছে।
জ্বি, স্যার, তা তো আছেই। গ্রামের এক বাড়িতে বন্দুক আছে শুনলে সেই গ্রামে আর ডাকাত আসে না।
তাই নাকি?
জ্বি স্যার।
তোমার বন্দুক বাড়িতেই থাকবে?
জ্বি।
তুমি কত দিন আছ?
এক সপ্তাহ থাকব স্যার। কাল এক বার আসব আপনার কাছে?
কোনো কাজে? না, এমনি দেখা-সাক্ষাৎ?
একটা কাজ স্যার আছে!
কখন আসলে পাওয়া যাবে আপনাকে?
সব সময়। যাব। আর কোথায়? ঘরেই থাকি সারা দিন।
রকিব বিদায় নিতে গিয়ে পা ছুঁয়ে সালাম করল। এটা একটা নতুন ব্যাপার। কোনো উদ্দেশ্য আছে কি? উদ্দেশ্য ছাড়া আজকাল কেউ কিছু করে না। তিনি ভুরু কোঁচকালেন। গুডগুড করে মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি হবে বোধহয়। খবর পেয়েছিলেন, শিয়ালজানি খালে পানি বাড়ছে। খুব খারাপ লক্ষণ। বন্যা এ বছরও কি হবে? একটু ঘুরে শিয়ালজানি খালটা দেখে গেলে হয়। একটা বীধ-টাধ দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। প্রতি বছর বন্যা হলে তো সবাই ভিখিরি হয়ে যাবে। চিন্তিত মুখে তিনি শিয়ালজানি খালের দিকে রওনা হলেন। ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে লাগল। সঙ্গে ছাতা আছে, কিন্তু ছাতা মেলতে ইচ্ছা করছে না। পথে যেতে যেতে তাঁর মনে হল, আর দেরি করা ঠিক হচ্ছে না! কাজে হাত দেওয়া দরকার। মানুষ কচ্ছপ নয়, সে আড়াইশ বছর বাঁচে না। অল্প কিছুদিন বাঁচে। যা করবার, এই অল্প সময়ের মধ্যেই করতে হবে। শুরু করতে হবে একা, তারপর অনেকে এসে দাঁড়াবে পাশে। কোনো স ৎকাজে মানুষের অভাব হয় না। মানুষ এক সময় না এক সময় পাশে এসে দাঁড়ায়। তাঁর পাশেও লোকজন এসে দাঁড়াবে।
ছাত্রদের কাছে চিঠি লিখতে হবে। দেখা করতে হবে সবার সাথে। অনেক কাজ। শিয়ালজানি খালের পাড়ে কবির সাহেব দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে রইলেন। ঝমোঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। ছাতা মেলতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত। পানি সত্যি সত্যি অনেকখানি বেড়েছে। ছোট একটা খাল। কিন্তু কত অল্প সময়ের নোটিশে বিশাল হয়ে যেতে পারে। এ-রকম নজির আছে।
স্নামালিকুম মাস্টার সাব।
ওয়ালাইকুম সালাম।
খালের পানি বাড়তাছে।
হুঁ।
এই বছর কিন্তুক পানি অইত না।
বুঝলে কীভাবে?
পরপর দুই সন বান হয় না। তারপর পানিটা দেখেন, ভারি পানি, বানের পানি অয় পাতলা।
তাই নাকি?
জ্বি।
ভারি-পাতলা বোঝা কীভাবে?
হাতে নিলেই বুঝন যায়।
কবির সাহেব অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বললেন, খালের তীর বরাবর বাঁধ দেবার ব্যবস্থা করব, বুঝলে মজনু মিয়া?
এইটা সম্ভব না। মাস্টার সাব।
কবির সাহেব রাগী গলায় বললেন, অসম্ভব বলে কোনো জিনিস নেই, মজনু মিয়া, সবই সম্ভব। মানুষের ক্ষমতা খুব বেশি। অবশ্যি বেশির ভাগ মানুষই তা জানে না। এস, ছাতার নিচে এস, ভিজছ কেন?
মজনু মিয়া হাসতে হাসতে বলল, ভিজতে ভালো লাগে মাস্টার সাব।
মজনু মিয়ার দাড়ি বেয়ে বৃষ্টির পানি পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে। ভালো লাগছে দেখতে।
তিনিও ছাতা নামিয়ে ফেললেন। মজনু অবাক হয়ে বলল ও মাস্টার সাব, তিজতাছেন তো?
বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোই লাগছে।
মজনু মনে-মনে ভাবল, আমাদের মাস্টার খুব পাগলা কিসিমের আছে।
সন্ধ্যার দিকে খবর এল, শিয়ালজানি খালের পানি অনেকখানি বেড়েছে। এই হারে বাড়তে থাকলে রাতের মধ্যে গ্রামে পানি ঢুকবে। নীলগঞ্জের সমস্ত মানুষ শঙ্কিত। খালের পাশে লোকজন আছে। অবস্থা তেমন দেখলে হাঁক-ডাক দেবে।
কবির সাহেব সন্ধ্যা থেকেই চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে আছেন। সকালবেলা বৃষ্টিতে ভেজা ঠিক হয় নি। জ্বর এসে গেছে। গলা ব্যথা করছে। ঢোক গিলতে পারছেন না। বয়সের লক্ষণ। শরীর বলছে-এখন আর আমাকে দিয়ে যা-ইচ্ছা-তা করিয়ে নিতে পারবে না। আমার দিন ফুরিয়ে আসছে।
শওকত ঘুরছে শুকনো মুখে। তার খুব ইচ্ছা, এক জন ডাক্তার নিয়ে আসে। কবির সাহেব রাজি নন। সামান্য জ্বরজারিতে ডাক্তার কী? তাছাড়া এ গ্রামে ডাক্তার নেই। বৃষ্টির মধ্যে যেতে হবে ফটিকখালি। কোনো অর্থ হয় না। শওকত কাঁচুমাচু মুখে বলল, স্যার, একটু চিড়া ভিজাইয়া দেই, খান।
