টুনীও ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করেছে। নীলু বলল, ওকে আমার কাছে দিন মা।
মনোয়ারা রেগে গেলেন, অন্ধকারে হাত থেকে ফেলবে। ও থাকুক আমার কাছে। তুমি তোমার কাজ কর।
করার মতো কোনো কাজ নেই। নীলু তার ঘরে চলে গেল। ঝামািঝম শব্দে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। গাঢ় অন্ধকার চারদিকে। এক-এক বার বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আর আলো হয়ে উঠছে চারদিক। পরীক্ষণেই প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ছে। মনে হয় এই কাছেই কোথাও যেন পড়ল। চুপচাপ বসে থাকতে ভালোই
লাগছে নীলুর।
ভাবী।
নীলু। তাকাল। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বোঝা যাচ্ছে শাহানা এগিয়ে আসছে। নীলু হাসিমুখে বলল, রাগ কমেছে নাকি শাহানা?
শাহানা জবাব দিল না। নীলু হালকা গলায় বলল, ওদের কী অবস্থা, কে জানে!
কাদের?
বাবা আর রফিক।
তোমার বরের কথা তো কিছু বল নি। নাকি ভাইয়াকে নিয়ে তুমি ভাব না?
শাহানা উঠে এল খাটের উপর। মৃদুস্বরে বলল, হঠাৎ করে এমন দিন খারাপ হল কীভাবে? যা ভয় লাগছে।
ভয়ের কী আছে?
টুনী কাঁদছে। মনোয়ারা তাকে শান্ত করবার চেষ্টা করছেন। কোনো লাভ হচ্ছে না। শাহানা বলল, ভাবী, তুমি টুনীকে নিয়ে এস তো।
তুমি নিয়ে এস, আমার কাছে দেবেন না।
আমি যাচ্ছিটাচ্ছি না।
নীলু হালকা গলায় বলল, এত ছোট ব্যাপার নিয়ে এ-রকম রাগ করেচ কেউ? জীবনে রাগ করার মতো অনেক বড়ো বড়ো ব্যাপার ঘটবে।
শাহানা মৃদুস্বরে বলল, হঠাৎ করে আমার কেমন যেন রাগ ধরে যায়। আর এ-রকম করব না।
মোমবাতি কোথায় আছে জান?
জানি। আমার টেবিলের ড্রয়ারে।
একটা মোমবাতি মার ঘরে দিয়ে আস না। টুনী অন্ধকার দেখে কাঁদছে।
আমি পারব না ভাবী। তুমি যাও!
নীলু। মোমবাতি জ্বলিয়ে মনোয়ারার ঘরে রেখে এল। টুনীর কান্না থেমে গেল সঙ্গে সঙ্গে। হাত-পা ছুঁড়ে খেলা জুড়ে দিল। নীলুর ইচ্ছা হল বলে, ওকে আমার কাছে একটু দিন না মা। কিন্তু সে কিছু বলল না। মনোয়ারা দেবে না।
বৌমা, কটা বাজল?
নটা পঁচিশ।
এ তো মহাচিন্তায় পড়লাম। কোথায় আটকা পড়ল। ওরা কে জানে?
এসে পড়বে মা। আপনার দাঁতব্যথা কমেছে?
কমেছে।
কিছু খাবেন আপনি? দুপুরে তো কিছু খান নি।
না, কিছু খাব না। তুমি দেখ, শাহানার রাগ ভাঙাতে পার। কিনা। যন্ত্রণা হয়েছে একটা!
ওর রাগ তেঙেছে মা। আমার ঘরে বসে আছে।
মনোয়ারা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন।
দরজায় ধাক্কা পড়ছে। নীলু দরজা খুলে দেখল, আনিস দাঁড়িয়ে আছে। কাকভেজা হয়ে গেছে সে।
ব্যাপার কী আনিস?
অবস্থা কাহিল ভাবী। চা খাওয়াতে পারবেন?
তা পারব। শুকনো কাপড় কিছু পরে আস।
শুকনো কাপড় আমার কিছু নেই ভাবী। ঘর ভেসে গেছে। একটা গামছা-টামছা কিছু দিন।
এস ভেতরে। শাহানাকে বলছি, কাপড় দেবে তোমাকে!
নীলু চা বানিয়ে বসার ঘরে ঢুকে দেখল, অন্ধকারে আনিস এবং শাহানা পাশাপাশি বসে আছে। ওদের বসার ভঙ্গিটার মধ্যেই কিছু একটা ছিল যা দেখে হঠাৎ নীলু একটু চমকাল। ভালোবাসাবাসির কোনো ব্যাপার নেই তো? শাহানার বয়স খুবই কম। এই সময়ে মন তরল থাকে। সবাইকেই ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।
দরজায় আবার ধাক্কা পড়ছে। হোসেন সাহেবের গলা পাওয়া যাচ্ছে–ও বৌমা, বৌমা।
রাত দশটার মধ্যে ভিজতে ভিজতে সবাই এসে উপস্থিত হল। তুমুল বর্ষণ হল সারা রাত। আনিস থেকে গেল এ বাড়িতে। সোফার উপর বিছানা হল তার, অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইল সে।
জেগে রইল শাহানাও। সমস্ত রাত তার মন কেমন করতে লাগল।
আজ প্রথম বারের মতো সে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ করেছে। আনিস ভাই যখন গামছায় তার মাথার ভেজা চুল মুছছে, তখন হঠাৎ তার ইচ্ছা করছিল গামছাটা তার কাছ থেকে নিয়ে নিতে। তার বলতে ইচ্ছা করছিল, আনিস ভাই, মাথাটা নিচু করুন, আমি মুছিয়ে দিচ্ছি। কেন এ-রকম মনে হল? এ-রকম মনে হওয়া নিশ্চয়ই খুব খারাপ। খুব খারাপ মেয়েদেরই নিশ্চয়ই এ-রকম মনে হয়। কিন্তু সে খারাপ মেয়ে হতে চায় না। সে খুব একটা ভালো মেয়ে হতে চায়।
শাহানা চাদর দিয়ে মাথা ঢেকে কাঁদতে শুরু করল। সে অন্ধকারে একা ঘুমুতে ভয় পাবে বলেই মনোয়ারা আজ তার সঙ্গে ঘুমিয়েছেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন, কী হয়েছে রে শাহানা, কাঁদছিস কেন? শাহানা ধরা গলায় বলল, জানি না কেন।
অদ্ভুত এক ধরনের কষ্ট হচ্ছে শাহানার। এ ধরনের কষ্ট পৃথিবীতে আছে, তা তার জানা ছিল না। মনোয়ারা শাহানার গায়ে হাত বুলিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করলেন। তিনি কি কিছু বুঝতে পারছেন? মায়েরা অনেক কিছু বুঝে ফেলে।
শাহানা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে মা।
কবির সাহেব
কবির সাহেব সাধারণত অন্ধকার থাকতে ঘুম থেকে ওঠেন। হাত-মুখ ধুয়ে হারিকেন জ্বলিয়ে তাঁর পড়ার টেবিলে বসেন। জরুরি লেখালেখির কাজগুলি সূর্য ওঠার আগেই সেরে ফেলা হয়। আজ তেমন কোনো জরুরি লেখালেখির ব্যাপার নেই। অভ্যাস-বশে লেখার টেবিলে বসেছেন। শুধু শুধু বসে থাকার কোনো মানে হয় না, তিনি একটি প্রবন্ধ লিখতে বসলেন। প্রবন্ধের নাম-স্বাধীনতা। প্রথমে ইচ্ছা ছিল মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের ভূমিকা এই বিষয়ে কিছু লিখবেন। প্রতিটি লেখারই নিজস্ব প্ৰাণ আছে। সে লেখাকে ঘুরিয়ে দেয়। এই লেখাটিও সে-রকম হল। তিন পৃষ্ঠা লেখার পর কবির সাহেব লক্ষ করলেন, দেশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে না লিখে তিনি লিখছেন ব্যক্তিগত স্বাধীনতা প্রসঙ্গে। তিনি ভুরু কুচকে লেখাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর বয়স হয়ে যাচ্ছে, যা ভাবছেন তা লিখতে পারছেন না। এটা বয়সের লক্ষণ। জরার লক্ষণ। সময় কি তাহলে শেষ হয়ে আসছে? তিনি একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। মানুষের মতো এমন শক্তিধর একটি প্রাণী এত ক্ষীণ আয়ু নিয়ে আসে কেন? একটি কচ্ছপ বাঁচে আড়াইশ বছর। কচ্ছপের আড়াইশ বছর বাঁচার কোনো প্রয়োজন নেই। জীবনের অপচয়।
