আমি ভালো করে ভেতরে তাকালাম, ড্রাইভারের পাশে বসেছেন আঁখির আব্বুর ডান হাত জাবেদ চাচা। পিছনে বসেছেন নিশাত আপু। আমরা ছয়জন মাঝখানে। জাবেদ চাচা কাজের মানুষ, কাজের মানুষেরা মনে হয় কথা কম বলে। তাই জাবেদ চাচা মুখে তালা মেরে বসে থাকলেন। নিশাত আপু মোটাসোটা নাদুসনুদুস একজন মেয়ে। যারা মোটাসোটা নাদুসনুদুস হয় তারা সাধারণত হাসিখুশি হয়, নিশাত আপুও হাসিখুশি। আমরা ছয়জন ভ্রমণের উত্তেজনায় এত হইচই করছিলাম যে নিশাত আপু আমাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা না করে আমাদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন। যারা মোটাসোটা নাদুসনুদুস তাদের মনে হয় ঘুম অন্যদের থেকে বেশি। একটু পর দেখলাম গাড়ির সিটে মাথা রেখে মুখে মিটিমিটি হাসিসহ নিশাত আপু ঘুমিয়ে পড়েছেন।
গাড়ি ছাড়তেই সুজন বলল, “আমি কিন্তু জানালার পাশে বসব।”
রিতু বলল, “ঠিক আছে। তোর ইচ্ছে করলে তুই গাড়ির ছাদেও বসতে পারিস।”
আঁখি বলল, “উঁহু। কেউ গাড়ির ছাদে বসে যেতে পারবে না। সেফটি ফাস্ট।”
আমি বললাম, “খামোখা চেষ্টা করে লাভ নেই। সুজনকে যতই বোঝানোর চেষ্টা কর সে কোনো একটা ঝামেলা করবেই।”
মামুন বলল, “সুজন যদি বেশি দুষ্টুমি করে আমরা ওকে নামিয়ে দিয়ে চলে যাব।”
শান্তা বলল, “আমরা তখন গাড়ি করে যাব আর সুজন গাড়ির পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে আসবে।”
দৃশ্যটা কল্পনা করে আমরা সবাই হি হি করে হাসতে থাকি। সুজন হাসল সবচেয়ে জোরে জোরে। আঁখি হাসতে হাসতে বলল, “উঁহু। কাউকে গাড়ি থেকে নামানো যাবে না। সেফটি ফাস্ট।”
রিতু বলল, “সুজনকে নামিয়ে দিলেই গাড়ির সেফটি বেশি হবে। তুই কী বেশি সেফটি চাস না কী কম সেফটি চাস?”
আঁখি বলল, “আমরা সুজনকেও চাই, সেফটিও চাই!”
এইভাবে কথা বলতে বলতে আমাদের গাড়ি এগুতে থাকে। আমরা এতো ভোরে রওনা দিয়েছি–এখনো চারিদিকে ঠিকমতো আলো হয়নি, কিন্তু তার মাঝেই লোকজন কাজকর্ম শুরু করেছে। চায়ের দোকানগুলো খুলছে, চুলোয় আগুন দিচ্ছে। মাথায় বোঝা নিয়ে মানুষজন যাচ্ছে। রাস্তার পাশে হকাররা খবরের কাগজ ভাগাভাগি করছে, রিকশা নিয়ে রিকশাওয়ালারা বের হয়েছে। এক কথায় দেখেই বোঝা যায় শহরটা জেগে উঠছে। আমি জানালা দিয়ে বাইরে দেখতে দেখতে হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম আঁখি এর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। শুধু যে দেখতে পাচ্ছে না তা নয় কখনোই দেখতে পাবে না। দেখতে না পেলে কেমন লাগে বোঝার জন্যে মাঝে মাঝে আমি চোখ বন্ধ করে থাকি কিন্তু কিছুক্ষণের ভিতরে আমি ছটফট করতে থাকি, আমাকে চোখ খুলে ফেলতে হয়। আঁখি দিনের পর দিন এভাবে কাটিয়ে দিচ্ছে চিন্তা করে হঠাৎ আমার ওর জন্যে অন্য এক রকম মায়া হতে থাকে। আমি জানি আঁখি সবকিছু সহ্য করতে পারে কিন্তু কেউ ওর জন্যে মায়া করলে সেটা সহ্য করতে পারে না, সে চায় সবাই তাকে অন্য সবার মতোন দেখুক। আমরা সবাই সেটা বুঝে ফেলেছি তাই তাকে সবসময় অন্য সবার মতোন দেখি, কখনোই আলাদা করে দেখি না। অন্তত সেরকম ভান করি।
রাস্তার একপাশ থেকে হঠাৎ একজন মানুষ দৌড় দিয়ে রাস্তা পার হল, ড্রাইভারকে এক মুহূর্তের জন্যে গাড়িকে ব্রেক কষে মানুষটাকে বাঁচাতে হল, আমরা সবাই একটা ঝাঁকুনি টের পেলাম, আঁখি বলল, “কী হল?”
আমি বললাম, “একটা ছাগল রাস্তা পার হতে চেষ্টা করেছে।”
মামুন বলল, “ছাগল না। মানুষ।”
আমি বললাম, “যে মানুষ এভাবে গাড়ির সামনে দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হয় সে মোটেও মানুষ না। সে আসলে ছাগল।”
ঠিক তখন সত্যি সত্যি একটা ছাগল হেলতে দুলতে রাস্তার মাঝখানে চলে এল, ড্রাইভারকে আবার ব্রেক কষে পাশ দিয়ে যেতে হল, আবার আমরা সবাই একটা ঝাঁকুনি টের পেলাম। আঁখি আবার জিজ্ঞেস করল, “কী হল?”
আমরা তার কথার উত্তর না দিয়ে হি হি করে হাসতে লাগলাম। আঁখি বলল, “কী হল? হাসিস কেন?”
“আবার একটা ছাগল রাস্তা পার হতে চেষ্টা করছে।”
“এর মাঝে হাসির কী হল?”
মামুন বলল, “এটা সত্যিকারের ছাগল, যেটা চার পায়ে হাঁটে।”
আমরা তখন মাঝে মাঝে আঁখিকে ধারাবর্ণনা দিতে থাকি। যেমন আমি বললাম, “আমাদের পাশ দিয়ে একটা বাস যাচ্ছে। বাসের পিছনের জানালা দিয়ে মাথা বের করে একজন টিশটাশ মহিলা হড়হড় করে বমি করছে।”
রিতু বলল, “ছিঃ তিতু! তোর এগুলো বলার দরকার কী?”
“যা দেখছি সেটাই বলছি। চোখ আছে বলে খালি আমাদের এই সব দৃশ্য দেখতে হবে, আঁখিকে দেখতে হবে না সেটা হতে পারে না।”
আঁখি হি হি করে হেসে বলল, “দে, দে, ওকে বলতে দে।”
উৎসাহ পেয়ে আমি বললাম, “আমরা এখন শহর থেকে বের হয়েছি। রাস্তার দুই পাশে ধান খেত, খাল, গাছপালা এগুলো দেখা যাচ্ছে। একজন মানুষ তার গেঞ্জিটা ওপরে তুলে ভুড়িটা বের করে সেটা চুলকাতে চুলকাতে দাঁত ব্রাশ করছে। কেন একই সাথে ভুঁড়ি চুলকাতে হবে আর দাঁত ব্রাশ করতে হবে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। দাঁত ব্রাশ করা খুবই জরুরি কাজ কিন্তু কেন সেটা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে করতে হবে সেটাও আমি জানি না।”
একটু পরে বললাম, “একজন মানুষ বদনা নিয়ে ছুটছে। এই যে সে মাঠের পাশে বসে গেল। সে এখন কী করছে সেটা বলতে চাই না”
শান্তা আর রিতু গুম গুম করে আমার পিঠে কিল দিয়ে বলল, “অসভ্য অসভ্য!”
একটু পরেই এই ধারাবর্ণনা দেওয়াটা আমাদের মাঝে একটা খেলার মতো হয়ে গেল। সবচেয়ে সুন্দর করে দিতে পারে রিতু, সে বলে, “আমাদের রাস্তাটা এখন ডান দিকে একটু বেঁকে গেল, সূর্যটা বাম দিকে সরে এসেছে। সূর্যটা এখনো কমলা রংয়ের, মনে হয় বিশাল মসুরের ডাল। সামনে থেকে দৈত্যের মতো একটা ট্রাক আসছে, এই যে, হুঁশ করে পাশ দিয়ে চলে গেল। মনে হচ্ছে সামনে একটা নদী। নদীতে পানি টইটম্বুর, এতো সকালেও একটা নৌকা হেলতে দুলতে যাচ্ছে। নদীর দুই ধারে সবুজ ধান খেত। সবুজ রংয়ের মাঝে যে এতো রকম শেড থাকতে পারে কে জানতো। কোনো কোনো ধান খেত হালকা সবুজ কোনোটা গাঢ়। টুকটুকে লাল রংয়ের ফ্রক পরা ছোট একটা মেয়ে কালো রংয়ের বিশাল একটা ষাঁড়কে নিয়ে যাচ্ছে। ষড়টার শিংগুলো ভয়ংকর, মনে হয় চলন্ত ট্রাককে গেঁথে ফেলবে, কিন্তু এই ছোট মেয়েটার কোনো ভয়ডর নেই। সে বিশাল ষাঁড়টাকে নিয়ে মাঠের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বাজে রকমের একটা বাস আমাদের ওভারটেক করতে চাচ্ছে, শুধু হর্ন দিয়ে যাচ্ছে। সামনে দিয়ে আরো গাড়ি আসছে এখন ওভারটেক করা যাবে না কিন্তু বেয়াদপ বাসটা ওভারটেক করে ফেলছে, কী ভয়ংকর! আমাদের ড্রাইভার চাচা অবশ্যি খুবই সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছেন। এই যে এখন আমরা ছোট বাজারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, বাজারে অনেক রকম সবজি। এখনো বাজার শুরু হয়নি সবাই আসছে চারিদিক দিয়ে। বাজারের কাছে একটা বাসস্ট্যান্ড, সেখানে লাল শাড়ি পরা একটা বউ! ইশ, কী সুন্দর বউ! একেবারে সিনেমার নায়িকার মতো। এতো সুন্দর বউটার হাজব্যান্ডটা একটু ভ্যাবলা ধরনের। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান চুলকাচ্ছে…”
