আমি অবাক হয়ে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সারাটা জীবন ভাইয়া আমাকে জ্বালিয়ে গেছে, হঠাৎ করে আমি আবিষ্কার করলাম ভাইয়া আসলে খুবই দুর্বল অপদার্থ, ফালতু একজন মানুষ। তার উপর রাগ করে লাভ নেই, তার জন্যে বরং মায়া হতে পারে। আমার তখন হঠাৎ করে এই দুর্বল হতভাগা ভাইটার জন্যে এক ধরনের মায়া হল। আহা বেচারা!
.
পরের দিন ঘুম থেকে উঠেই আমি আমার ক্লাসের সবার সাথে কথা বলতে শুরু করলাম, তখন সবকিছু আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমার সাথে কেউ যোগাযোগ করছিল না কারণ সবাই বুঝতে পেরেছিল আমি যেতে পারব না বলে নিশ্চয়ই আমার খুব মন খারাপ, এখন যদি অন্যেরা সেটা নিয়ে কথা বলে তা হলে আমার আরো মন খারাপ হবে। যে জিনিসটা কেউ ঠিক করে বুঝতে পারছিল না সেটা হচ্ছে আমাদের যদি আসলে গ্রামের বাড়ি যাবার কথা না থাকে তা হলে কেন ভাইয়া সেটা বলল। ভাইয়া চায় না আমি যাই সেই জন্যে এতো বড় মিথ্যা কথাটা বলেছে সেটা বলতে আমার লজ্জা হল তাই আমি আরেকটা ছোট মিথ্যা কথা বললাম। আমি তাদের বললাম, “এই ধরনের একটা আলোচনা হচ্ছিল ভাইয়া তারিখটা ভুলে গোলমাল করে ফেলেছে।”
তবে ভাইয়া আমাকে নিয়ে যে মিথ্যা কথাটা বলেছে বজলুর জন্যে সেটা সত্যি হয়ে গেল। বজলুর নানা খুব অসুস্থ, ডাক্তার জবাব দিয়ে গেছে। যে কোনো মুহূর্তে মারা যাবেন তাই বজলুর বাসার সবাই তার নানাকে শেষ দেখার জন্যে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে। বজলুকেও যেতে হবে। তার মানে সে আমাদের সাথে যেতে পারবে না। বজলুর সাথে কথা বলে বোঝা গেল মারা যাবার জন্যে এরকম একটা সময় বেছে নেবার জন্যে বজলু কোনোদিন তার নানাকে ক্ষমা করবে না।
বজলুর মতোই ফাটা কপাল হল আশরাফের। ঠিক এই সময়টাতে তার বোনের বিয়ে। তার উপর যদি ছেড়ে দেওয়া হত তা হলে সে নিঃসন্দেহে বোনের বিয়েতে হাজির না থেকে আমাদের সাথে রাঙামাটি, বান্দরবান আর কক্সবাজার যেত। কিন্তু এই বিষয়গুলো আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় না, বড়রা ঠিক করে, তাই আশরাফেরও যাওয়া হল না। দেখা গেল সব মিলিয়ে যাব আমরা ছয়জন, ছেলেদের মাঝে আমি, সুজন আর মামুন। মেয়েদের মাঝে রিতু, শান্তা আর আঁখি। আঁখির আব্বু খুবই গোছানো মানুষ, কবে কোথায় যাওয়া হবে, কোথায় থাকা হবে, সাথে কী নিতে হবে–সবকিছু কাগজে টাইপ করে লিখে দিয়েছেন। অন্যেরা আগেই সেই লিস্ট পেয়ে গেছে, সাথে যা যা নেওয়ার কথা
সেগুলো জোগার করে তারা রেডি হয়ে গেছে। আমি শেষ মুহূর্তে পেয়েছি কিন্তু সেই জন্যে আমার সেরকম কোনো সমস্যা হয়নি। লিস্টটি খুবই সহজ, নিজের জামা কাপড় ছাড়া তেমন কিছু নেই। বাকি যা কিছু লাগবে সবকিছু আমাদের জন্যে ম্যানেজ করে নেওয়া হবে।
আমি অবশ্যি নিজে খুঁজে খুঁজে কিছু জিনিস নিয়ে নিলাম। ছবি তোলার জন্যে আব্বুর ক্যামেরা, পড়ার জন্যে গল্পের বই, রোদ থেকে বাঁচার জন্যে বেস বল ক্যাপ, চোখে দেওয়ার জন্যে কালো চশমা, ছবি আঁকার জন্যে রং তুলি, লেখালেখি করার জন্যে কাগজ কলম, ভ্রমণের কাহিনী লেখার জন্যে ডাইরি, ছোটখাটো কাটাকুটি করার জন্যে ছোট চাকু, পেট খারাপ হলে খাবার জন্যে খাবার স্যালাইন, জ্বর সর্দি কাশির জন্যে প্যারাসিটামল, দাঁত ব্রাশ করার জন্যে টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, চুল আঁচড়ানোর জন্যে চিরুনি।
যেদিন রওনা দেব তার আগের রাতে আমার চোখে ঘুমই আসতে চায় না! শেষ পর্যন্ত যখন ঘুমিয়েছি তখন ঘুমটা হল ছাড়া ছাড়া, সারা রাত স্বপ্ন দেখলাম গাড়ি করে যাচ্ছি আর গাড়িটা থেমে যাচ্ছে, ধাক্কা দিয়ে দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি সকলে মিলে!
০৯-১০. স্বাভাবিক মানুষের মতো
যখন আমরা আঁখিকে শিখিয়ে দিলাম কেমন করে একেবারে স্বাভাবিক মানুষের মতো চলাফেরা করতে হয়
খুব ভোরে আম্মু আমাকে ডেকে তুললেন। অন্য যে কোনোদিন হলে আমি অনেক ধরনের গাইগুই করতাম, “আর পাঁচ মিনিট”
“আর এক মিনিট” বলে বিছানায় ঘাপটি মেরে পড়ে থাকতাম, আজকে তার কিছুই করলাম না। তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বসলাম। তাড়াতাড়ি উঠে বাথরুমে গেলাম, দাঁত ব্রাশ করে গোসল করে রেডি হয়ে গেলাম। ফুলি খালা রুটি টোস্ট আর ডিম পোচ করে দিলেন। অন্য যে কোনোদিন হলে খাওয়া নিয়ে কমপক্ষে আধা ঘণ্টা ঘ্যানঘ্যান করতাম, আজকে কিছুই করলাম না, গপগপ করে খেয়ে ফেললাম।
কিছুক্ষণের মাঝে বাসার সামনে একটা গাড়ি এসে হর্ন দিল, আমি সাথে সাথে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেলাম। ভাইয়া ঘুমিয়ে থাকল না হয় ঘুমের ভান করে পড়ে রইল। আল্লু ঘুম ঘুম চোখে বাইরে এসে বললেন, “সাবধানে থাকিস।”
আম্মু আমার সাথে গাড়ি পর্যন্ত এলেন, গাড়ির দরজা খোলা ভেতরে সবাই বসে আছে। আমার ব্যাগটা পিছনে রাখা হল, আমি সামনের সিটে বসলাম। আম্মু বললেন, “সাবধানে থাকিস। দুষ্টুমি করিস না।”
আমি বললাম, “করব না আম্মু।”
আম্মু তখন আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, “ফি আমানিল্লাহ্।”
তখন অন্য সবাই তাদের মাথা এগিয়ে দিয়ে বলল, “চাচি আমাকে! চাচি আমাকে!”
আম্মু তখন সবার মাথায় হাত রেখে বললেন, “ফি আমানিল্লাহ্।” তারপর দরজা বন্ধ করা হল, ড্রাইভার স্টার্ট দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল। অন্য সবাইকে আগেই তুলে নেওয়া হয়েছে, আমি শেষ জন। আমাকে তুলে নেবার পর গাড়ি সত্যি সত্যি চিটাগাংয়ের রাস্তায় রওনা দিল।
