রিতু যতক্ষণ খুশি ততক্ষণ বলে যেতে পারে। আমাদের মাঝে সবচেয়ে খারাপ ধারাবর্ণনা দেয় সুজন। সে বলে, “এ্যা ইয়ে আমরা এখন সামনে যাচ্ছি। হা সামনে যাচ্ছি। একটা সিএনজি ওভারটেক করলাম। এ্যা-এখন যাচ্ছি। সামনে যাচ্ছি। আরেকটা সিএনজি ওভারটেক করলাম। এ্যা এ্যা যাচ্ছি। দূরে আরেকটা সিএনজি সেটাকেও ওভারটেক করব। এ্যা ওভারটেক করলাম। এখন সামনে যাচ্ছি। এ্যা সামনে যাচ্ছি!…”
.
ঘণ্টা দুয়েক পরে হঠাৎ জাবেদ চাচা ড্রাইভারকে বললেন, “রতন, গাড়ি থামাও।”
“এখানে?”
“হ্যাঁ। সামনে রেস্ট এরিয়া। সবাই একটু রেস্ট নিবে, চা নাস্তা খাবে।”
রতন ড্রাইভার বলল, “এক্ষুনি?”
জাবেদ চাচা বললেন, “হ্যাঁ। স্যার বলে দিয়েছেন প্রতি দুই ঘণ্টা পরে থামতে হবে, একটু রেস্ট নিতে হবে। তোমার চা খেতে হবে।”
“আমার লাগবে না স্যার, আরো এক দেড়শ কিলোমিটার যেতে পারব।”
“না না।” জাবেদ চাচা মাথা নাড়লেন, “এই বাচ্চাকাচ্চার দায়িত্ব আমার। তুমি একটু পরে পরে থামতে থামতে যাবে। আমি কোনো রিস্ক নিব না।”
কাজেই ড্রাইভার একটা রেস্ট এরিয়াতে থামল। পিছনে নিশাত আপু একেবারে কাদার মতো ঘুমাচ্ছিলেন, গাড়ি থামতেই আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠলেন। বললেন, “কোথায় থেমেছি? রেস্ট এরিয়াতে?”
আমরা মাথা নাড়লাম। নিশাত আপু হাসি হাসি মুখে বললে, “গুড! সবাই নাম। একটু হাত-পা ছড়িয়ে নেওয়া যাক। বাথরুম ব্রেকফাস্ট সব সেরে ফেলা যাক।”
আঁখি নামতে নামতে জিজ্ঞেস করল, “আশেপাশে কী অনেক মানুষ?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ একটা বাস থেকে নামছে।”
আঁখি একটা ছোট নিশ্বাস ফেলে বলল, “আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে?”
“অনেকেই।”
“আমাকে দেখে আহা উঁহু করছে?”
“এখনো করছে না। এখনো বুঝতে পারছে না।”
আঁখি বলল, “যা বিরক্ত লাগে আমার! হোয়াইট কেনটা খুলতেই সবাই বুঝে যাবে আর আহা উঁহু শুরু করবে।”
আঁখির কথা সত্যি, সে যেই মুহূর্তে তার ভাঁজ করা সাদা লাঠিটা খুলে হাতে নিয়েছে সাথে সাথে সবাই মাথা ঘুরিয়ে আঁখির দিকে তাকাল। আমরা দেখলাম চাপা গলায় আঁখিকে নিয়ে কথা বলছে। আমরা যখন ভেতরে গিয়ে বসেছি তখন বোকা ধরনের একজন বয়স্কা মহিলা হেঁটে আমাদের কাছে এসে বলল, “এই মেয়ে চোখে দেখে না? অন্ধ?”
আমাদের ইচ্ছে হল মহিলাটার টুটি চেপে ধরি, কিন্তু সত্যি সত্যি তো আর কারো টুটি চেপে ধরা যায় না তাই দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, “না, দেখতে পায় না।”
“আহারে! কী কষ্ট।”
আমরা কিছু বললাম না।
”তোমাদের কী হয়?”
“বন্ধু।”
বন্ধু শুনে মহিলাটা কেমন জানি বিরক্ত হল, কেন বিরক্ত হল বুঝতে পারলাম না। বলল, “বাবা কী করে?”
আঁখির বাবা কী করে আমি ভালো করে জানি না, কিছু একটা উত্তর দিতে হয় তাই বললাম, “র্যাব। মাঝে মাঝে ক্রসফায়ার করে।”
“ও আচ্ছা। র্যাব!” মহিলা একটু ঘাবড়ে গেল তারপর গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে আঁখির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “মা, তুমি এই জিন্দেগিতে কিছু না পেলে কী হবে, আখেরাতে তুমি সব পাবে! অন্ধ মানুষের দোয়া আল্লাহ্ কবুল করে।”
মহিলা চলে যাবার পর আঁখি বলল, “মিথ্যা কথা।”
“কী মিথ্যা কথা?”
“অন্ধ মানুষের দোয়া আল্লাহ্ কবুল করে।”
“কেন?”
“আমি দোয়া করেছিলাম এই মহিলার মাথায় যেন ঠাঠা পড়ে। পড়ে নাই।”
আমরা হি হি করে হাসতে লাগলাম, রিতু বলল, “আরে গাধা এইটা তো বদ দোয়া! বদ দোয়া কবুল করে কেউ তো বলে নাই।”
আমাদের টেবিলে নানারকম খাবার দিয়ে যায়। সকালে খেয়ে বের হয়েছি তারপরেও বেশ খিদে লাগছে। আমরা বেশ উৎসাহ নিয়ে খেতে শুরু করলাম, শুধু আঁখি পানির বোতল থেকে এক ঢোক পানি খেয়ে বলল, “বুঝলি, এই জন্যে আমি বাসা থেকে বের হতে চাই না।”
কী বলতে চাইছে সেটা আমরা ঠিকই বুঝতে পারছিলাম তারপরেও রিতু জিজ্ঞেস করল, “কী জন্যে?”
“এই যে আমাকে দেখেই আহা উঁহু শুরু করে দেয়! আমার এত বিরক্ত লাগে কী বলব। আমার কী ইচ্ছে করে জানিস?”
“কী?”
“আমি এমনভাবে বের হব যে কেউ আমাকে দেখে বুঝতে পারবে না যে আমি দেখতে পাই না, আর আমাকে দেখে আহা উঁহু করবে না।”
আমি বললাম, “সেটা আর কঠিন কী? তুই তোর লাঠিটা ব্যবহার করিস না তা হলেই কেউ বুঝতে পারবে না।”
“হ্যাঁ! আর হাঁটতে গিয়ে বাদুড়ের মতো এখানে সেখানে ধাক্কা ধুক্কা খাই!”
“খাবি না। আমরা তোর কাছে থাকব। তোকে সবকিছু বলে দেব। দেখ চেষ্টা করে।”
আঁখি কয়েক সেকেন্ড কী যেন চিন্তা করল তারপর বলল, “ঠিক আছে। দেখি চেষ্টা করে। কিন্তু মনে রাখিস আমি যদি আছাড় খেয়ে পড়ে দাঁত ভাঙি তা হলে কিন্তু তোরা দায়ী থাকবি।”
আমি বললাম, “আছাড় খাবি না। আমরা কাছাকাছি থাকব তোকে পড়তে দিব না।”
আমরা যখন আবার গাড়িতে ফিরে যাচ্ছিলাম তখন আঁখি তার ভঁজ করা লাঠিটা খুলল না। সেটা হাতে নিয়ে হেঁটে যাওয়া শুরু করল। রিতু তার একটু সামনে, আমি তার একটু পিছনে। আমি ফিসফিস করে তাকে বলে দিতে লাগলাম, “সামনে দরজা। তারপর সিঁড়ি। তিনটা সিঁড়ি এক দুই তিন। সোজা সামনে, ডান দিকে মানুষ, বাম দিকে সরে যা।“
সামনে একটা বাস থেমেছে, সেখান থেকে মানুষজন নামছে, তারা আমাদের দিকে একনজর তাকাল কিন্তু কেউ আগের মতো ঘুরে তাকাল না! রিতু বলল, “খুব ভালো হচ্ছে আঁখি, কেউ তোকে সন্দেহ করছে না। শুধু একটা জিনিস তোর ঠিক করতে হবে।”
