আমি মাথা নাড়লাম, “না শরীর খারাপ না।”
ফুলি খালা বলল, “তিতুর কিছু একটা হয়েছে। কয়দিন থেকে চুপচাপ, খালি কী যেন চিন্তা করে।”
আম্মু আবার জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে তিতু। বল আমাদের।”
আমি বললাম, “কিছু হয়নি। তারপর অনেক কষ্টে চোখের পানি লুকালাম। আমার মন খারাপ দেখে ভাইয়ার খুব আনন্দ হচ্ছে মনে হল, আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকায় আর খ্যাক খ্যাক করে হাসে।
খাওয়া শেষ করে আমি তাড়াতাড়ি বিছানায় শুয়ে পড়েছি। চোখে ঘুম আসছে না, প্রচণ্ড অভিমানে আমার বুকটা প্রায় ভেঙে যাচ্ছিল আঁখি অন্তত একবার ফোন করে আমার সাথে কথা বলতে পারত।
ঠিক এরকম সময় ফোন বাজল, ফোন ধরল ফুলি খালা। তারপর আমার বিছানার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “তিতু, তুমি জাগা না ঘুম।”
আমি উঠে বসলাম, “কেন?”
“তোমার ফোন।”
“কে?”
“একটা মেয়ে। নাম আঁখি।”
আমি একবার ভাবলাম বলি, গিয়ে বলে দাও ঘুমিয়ে আছি। শেষ পর্যন্ত বললাম না, গিয়ে ফোন ধরলাম, “হ্যালো।”
অন্যপাশ থেকে আঁখি বলল, “তিতু?”
“হ্যাঁ।“
আঁখি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “বুঝলি তিতু, যতবার চিন্তা করছি তুই যেতে পারবি না আমার মনটাই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে আমরা প্রোগ্রামটা চেঞ্জ করি-তুই তোর গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরে এলে তারপরে যাই–”
আমি বললাম, “গ্রামের বাড়ি? কীসের গ্রামের বাড়ি?”
আঁখি বলল, “তুই যে তোর ফ্যামিলির সাথে গ্রামের বাড়ি যাবি।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “আমি গ্রামের বাড়ি যাব?”
“হ্যাঁ। আমার আব্বু সেই যে ফোন করল, তোর ভাইয়ের সাথে কথা বলল। তোর ভাই বলল তোরা গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিস। তুই যেতে পারবি না–”
আমার মাথার মাঝে চন্ন করে রক্ত উঠে গেল। তার মানে ভাইয়া আঁখির আব্বুর সাথে মিথ্যা কথা বলেছে যেন আমি যেতে না পারি। আমি অনেক কষ্ট করে নিজেকে শান্ত করলাম, তারপর ঠাণ্ডা গলায় বললাম, “আমরা কোথাও যাচ্ছি না। আমরা এখানেই আছি।”
“তার মানে তুই যেতে পারবি?” আঁখি চিৎকার করে বলল, “আমাদের সাথে যেতে পারবি?”
“আবু আম্মু যদি রাজি হন-”
“সেটা আমাদের উপর ছেড়ে দে।” আমি শুনলাম আঁখি ”ইয়াহু” বলে একটা চিৎকার করল। তারপর চিৎকার করে তার আব্বুকে ডাকতে লাগল। আমি শুনতে পেলাম আঁখি উত্তেজিত গলায় তার আব্বুর সাথে কথা বলছে, কিছুক্ষণ পর আঁখির আব্বু ফোন ধরলেন, “হ্যালো তিতু?”
“জি চাচা।”
“তোমার আব্বু আম্মু কি জেগে আছেন?”
“জি চাচা জেগে আছেন।”
“একটু কি কথা বলা যাবে যে কোনো একজনের সাথে?” আমি উত্তেজিত গলায় বললাম, “যাবে চাচা। যাবে। আপনি একটু ধরেন।”
আমি প্রায় ছুটে গেলাম আব্বুর কাছে, যাবার সময় দেখলাম, ভাইয়া পড়ার টেবিলে বইয়ের উপর ঝুঁকে বসে পড়ার ভান করছে, কিন্তু তার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে আসলে টেলিফোনে আমার প্রত্যেকটা কথা খুব মন দিয়ে শুনছে। তার চেহারার মাঝে একটা চোর চোর ভাব।
আব্বু এসে ফোন ধরলেন, আমি কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম। আব্বু একটু কথা শুনেই বললেন, “না, না–আপনার কষ্ট করে আসতে হবে না, ফোনেই বলতে পারেন।”
আঁখির আব্বু মনে হল জোর করলেন, বাসায় এসে কথা বলতে চান। আব্বু তখন আর না করলেন না। আম্মুকে ডেকে বললেন, “তিতুর ক্লাসে আঁখি নামের যে মেয়েটা পড়ে তার আব্বু আসছেন।”
“এতো রাতে কেন?”
“ক্লাসের কয়েকজনকে নিয়ে চিটাগাং হিলট্রাক্সে বেড়াতে যাবে, তাই তিতুকে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন। আমাদের পারমিশানের জন্যে।”
“পারমিশানের কী আছে?” আম্মু বললেন, “সবাই মিলে বেড়াতে যাবে, ভালোই তো।”
আবু বললেন, “ভদ্রলোক খুব সিরিয়াস টাইপের। বললেন আপনার ছেলেকে নিয়ে যাব, পুরো ব্যবস্থাটা শুনেন যেন আপনাদের মনে কোনোরকম দুশ্চিন্তা না থাকে।”
“তাই বলে এতো রাতে?”
আব্লু ইতস্তত করে বললেন, “আমি ঠিক বুঝলাম না, বললেন কী যেন ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, কেন জানি মনে করেছিলেন আমরা গ্রামের বাড়ি যাব তিতুকে নিয়ে। সেই জন্যে আমাদের বলা হয়নি–অন্য সবাই রেডি। তিতু না কি কী একটা বল তৈরি করে দিয়েছে তার মেয়েকে, সেই বল দিয়ে মেয়ে না কি ক্রিকেট পর্যন্ত খেলতে পারে। তাই তিতু ছাড়া যাবে সেটা না কি চিন্তাই করতে পারছেন না।”
আম্মু বললেন, “কিন্তু আমরা গ্রামের বাড়ি যাব সেই কথাটা কেন আসছে–”
আমি বলতে গেলাম, “ভাইয়া–” কিন্তু বললাম না, থেমে গেলাম। পুরো ব্যাপারটা মিটে যাক তারপর দেখা যাবে।
আঁখির আব্বু আর আম্মু দুজনেই চলে এলেন, আল্লু আর আম্মুর সাথে কথা বললেন, এমনভাবে কথা বললেন যে মনে হল আমি বুঝি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আর আমাকে যেতে দিয়ে আমার আব্বু আম্মু আঁখির আব্বু আম্মুকে কৃতার্থ করে দিলেন। কাজের কথা শেষ হবার পর অন্য গল্পগুজব হল, তারা আঁখিকে নিয়ে কথা বললেন, আগে কেমন মন খারাপ করে থাকত, আমাদের স্কুলে আসার পর কেমন হাসিখুশি থাকে এই রকম গল্প।
.
রাত্রে ঘুমানোর সময় যখন আশেপাশে কেউ নেই তখন আমি ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, “ভাইয়া তুমি আঁখির আব্বুকে মিথ্যা কথা কেন বলেছিলে?”
ভাইয়া আমতা আমতা করে বলল, “আ-আ-আমি আসলে আসলে-” কথা শেষ না করে ভাইয়া থেমে যায়। আমার দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলল, “প্লীজ তিতু তুই আম্বু আম্মুকে বলিস না। প্লীজ প্লীজ-আমি আর কোনোদিন করব না। খোদার কসম–”
