“গুল?”
“হ্যাঁ গুলু-হনুমানের নাম।”
সুজন কেমন জানি রেগে উঠল, বলল, “হনুমানের নাম গুলু?”
“কেন? হনুমানের নাম গুলু হতে পারে না?”
সুজন কেন জানি আরো রেগে উঠল, বলল, “তোর নাম হওয়া উচিত গুলু।”
এবারে আমিও রেগে উঠলাম, বললাম, “কেন আমার নাম কেন গুলু হবে?”
“কারণ, তোর বুদ্ধি হচ্ছে হনুমানের মতো।” সুজন হাত-পা নেড়ে বলল, “আমি জিজ্ঞেস করলাম আঁখি তার আব্বুর কাছে কী চেয়েছে–আর তুই বললি হনুমান!”
আমি রেগে বললাম, “হনুমানের বাচ্চা!”
“ঠিক আছে হনুমানের বাচ্চা! একজন মানুষ যদি নিজে হনুমান না হয় তা : হলে সে হনুমানের বাচ্চার কথা বলতেই পারে না।”
আমার সাথে সুজনের একটা মারামারি লেগে যেত–কিন্তু ঠিক তখন সুজনের আম্মু আমাদের জন্যে নাস্তা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন তাই মারামারিটা লেগে গেল না, আমরা নাস্তা খেতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম।
নাস্তা খাওয়ার পর আমাদের মেজাজ একটু ঠাণ্ডা হল, তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আঁখি কী চেয়েছে তার আব্বুর কাছে?”
“আঁখি তার আব্বুকে বলেছে আমাদের পুরা ক্রিকেট টিমকে কক্সবাজার রাঙামাটি বান্দরবান নিয়ে যেতে!”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“তার আব্বু রাজি হয়েছে?”
“হবেন না কেন?” সুজন দাঁত বের করে হেসে বলল, “তার মানে আমি, বজলু, আশরাফ, মামুন, রিতু, শান্তা আর আঁখি কক্সবাজার রাঙামাটি আর বান্দরবান যাব। কী মজা!”
আমি চমকে উঠলাম, আমার নাম বলেনি! তখন মনে পড়ল সত্যিই তো আমি ক্রিকেট টিমে নাই-কিন্তু আমি যদি ঝুনঝুন বলটা আবিষ্কার না করতাম তা হলে কী আঁখি ক্রিকেট খেলতে পারত? তা হলে আমি কেন যেতে পারব না? কিন্তু আমাকে যদি নিতে না চায় তা হলে আমি কী করব?
সুজন ফ্যাক ফ্যাক করে হাসতে হাসতে বলতে থাকে, “কী মজা হবে! আঁখির আব্বু সব ব্যবস্থা করে দিবে, আমরা এয়ারকন্ডিশান গাড়ি করে যাব, হাইফাই হোটেলে থাকব, হাম বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চপ কাটলেট এইগুলো খাব, ঘুরে বেড়াব। চিন্তা করেই আমার ঘুম হচ্ছে না!”
আমি শুকনো মুখে বললাম, “আঁখি তোদের সবার সাথে কথা বলেছে?”
“এখনো বলে নাই। তারিখটা ঠিক হলেই বলবে।”
“তোদের বাসা থেকে পারমিশান দিবে?”
সুজন চোখ কপালে তুলে বলল, “দিবে না কেন?”
আমি বললাম, “না–মানে ইয়ে–” কথাটা শেষ না করেই আমাকে থেমে যেতে হল। সত্যিই তো এরকম চমৎকার একটা ব্যাপার সেখানে যেতে বাসা থেকে পারমিশান দেবে না কেন?
আমি বাসায় ফিরে আসলাম খুবই মন খারাপ করে। আমি ইচ্ছে করলেই ক্রিকেট টিমে থাকতে পারতাম–মামুন আর আশরাফের থেকে আমি মোটেও খারাপ খেলি না কিন্তু তাদের অনেক বেশি আগ্রহ ছিল দেখে আমি তাদের জন্যে ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন সেই জন্যে আমি পড়ে থাকব আর তারা রাঙামাটি, বান্দরবান আর কক্সবাজার বেড়াতে যাবে? পৃথিবীতে এর থেকে বড় অবিচার আর কী হতে পারে?
পরের কয়েকদিন আমি ছাড়া ছাড়াভাবে এর কাছ থেকে ওর কাছ থেকে নানা রকম খবর পেতে থাকি। সুজন যেটা বলেছে সেটা সত্যি। ক্রিকেট টিমের সবাইকে আঁখির আব্বু এক সপ্তাহের জন্যে রাঙামাটি, বান্দরবান আর কক্সবাজার নিয়ে যাচ্ছেন। কীভাবে কী করা হবে সেটা ঠিকঠাক করার জন্যে পরশুদিন সবাই আঁখিদের বাসায় যাবে কথাবার্তা বলতে। সবার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে–আমাকে কেউ কিছু বলেনি। যার অর্থ আমাকে ছাড়াই যাওয়া হবে। আমি ভাবলাম লজ্জার মাথা খেয়ে আমি আঁখিদের বাসায় গিয়ে আঁখির আবুকে বলি, “প্লীজ প্লীজ, আমাকে নিয়ে যান! আমি হয়তো ক্রিকেট টিমে নাই, কিন্তু আমি যদি ঝুনঝুন বলটা তৈরি করে না দিতাম তা হলে আঁখি ক্রিকেট খেলতে পারত না।” কিন্তু সত্যি সত্যি তো আর সেটা করা যায় না। পুরো ব্যাপারটা চিন্তা করে আমার খুব অভিমানও হল–আমি না হলে কিছুই হত না-অথচ আমাকে ছাড়াই সবাই আনন্দ করতে যাচ্ছে। অন্য সবার কথা ছেড়ে দিলাম, আঁখি কি তার আব্বুকে একবারও বলতে পারে না যে আমাকে নিয়ে যাওয়া হোক?
আমি হিসেব করে বের করলাম কখন আঁখিদের বাসায় সবাই যাচ্ছে, সেই সময়টা আমি টেলিফোনের কাছাকাছি থাকলাম। মনে মনে আশা করতে লাগলাম হঠাৎ করে টেলিফোন বেজে উঠবে আর আঁখি ফোন করে বলবে, “তিতু তুই চলে আয়! তোকেও আমরা নিয়ে যাব।”
কিন্তু টেলিফোন বাজল না। রাতে সুজন ফোন করে বকবক করতে লাগল, “বুঝলি তিতু, আমরা রওনা দিব খুব ভোরে। সকালে নাস্তা করা হবে রেস্ট এরিয়াতে। ডিম পরোটা আর সবজি। সাথে গরম চা। দুপুরের খাওয়া হবে চিটাগাংয়ে। গাড়িতে সবরকম খাবার থাকবে। পনেরোজনের বিশাল গাড়ি। ড্রাইভারের পাশে বসবে জাবেদ আঙ্কেল। আমরা পিছনে। জাবেদ আঙ্কেল হচ্ছে আঁখির আব্বুর ডান হাত, সবকিছুর ব্যবস্থা করে দেবে। জাবেদ আঙ্কেল ছাড়াও যাবে নিশাত আপু। নিশাত আপু হচ্ছে আঁখির কাজিন। মেডিকেলে পড়ে-হাফ ডাক্তার, আমাদের দেখে শুনে রাখবে। চিটাগাংয়ে একটা রেস্ট হাউজে আমরা লাঞ্চ করব–তারপর আবার রওনা। প্রথমে রাঙামাটি না কী প্রথমে বান্দরবান সেটা নিয়ে বিশাল আলোচনা হল, শেষে ভোটাভুটি। আমি বান্দরবান ভোট দিয়েছিলাম, ভোটে বান্দরবান জিতে গেল। হা হা হা!…” সুজন টানা কথা বলে যেতে থাকে আমি শেষের দিকে কিছু শুনছিলাম না, আমার চোখে শুধু পানি এসে যেতে থাকে।
খাবার টেবিলে আমি কোনো কথা না বলে চুপচাপ খেলাম, ভাইয়া বকবক করে গেল। আম্মু একসময় জিজ্ঞেস করলেন, “তিতু তুই এতো চুপচাপ তোর শরীর খারাপ না কি?”
