আমরা চিৎকার করে বললাম, “আমরা জিতেছি সেই জন্যে!”
ম্যাডাম বললেন, “না। খেলায় তো একদল জিতবেই সেটা কখনো বড় কথা। আজকের খেলাটা অন্যরকম কারণ এই খেলায় এমন একজন অংশ নিয়েছে সাধারণভাবে তার এখানে অংশ নেবার কথা নয়। সেটা সম্ভব হয়েছে একটা বিশেষ ধরনের বলের জন্যে। কাজেই যে বলটা তৈরি করেছে তাকে আমরা অভিনন্দন জানাই। সেই বলের আবিষ্কারক ক্লাস এইটের তিতু।” ম্যাডাম বললেন, “তিতু তুমি কোথায়? এখানে চলে এসো।”
আমাদের ক্লাসের সব ছেলেমেয়ে আনন্দে চিৎকার করতে থাকে। আমি তার মাঝে উঠে দাঁড়িয়ে ম্যাডামের কাছে গেলাম। ম্যাডাম বললেন, “তোমরা সবাই এই ঝুনঝুন বলের আবিষ্কারক তিতুর জন্যে হাততালি দাও।” সবাই হাততালি দিতে থাকে। আমি দেখলাম দর্শকদের মাঝে দাঁড়িয়ে সেই কমবয়সী মুচিও হাততালি দিচ্ছে। তারও খুব আনন্দ হচ্ছে বলে মনে হল।
আমি ফিসফিস করে ম্যাডামকে বললাম, “ম্যাডাম যে মানুষটা এই বলটা তৈরি করেছে সেও এখানে আছে।”
“তাই না কি?”
“জি ম্যাডাম।”
“ভেরি গুড, তাকেও ডেকে নিয়ে আসি। নাম কী?”
“ম্যাডাম। সে কিন্তু মুচি।”
“আমি জানি। তাতে কী আসে যায়? নাম কী?”
“নাম তো জানি না।”
ম্যাডাম তখন দর্শকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাদের তিতু এই বলের আবিষ্কারক, কিন্তু সেই আবিষ্কারকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন যিনি তিনিও আজকে এই মাঠে হাজির আছেন। তিনি নিজের হাতে এই বলটা তৈরি করেছেন, আমি তাকেও চলে আসতে অনুরোধ করছি।”
কমবয়সী মুচির মুখে প্রথমে অবিশ্বাস এবং তারপর ভয়ের ছায়া পড়ল। সে দর্শকদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রবল বেগে মাথা নাড়তে থাকে সে কিছুতেই আসবে না। অন্যেরা তখন রীতিমতো জোর করে ঠেলে তাকে সামনে নিয়ে এল। ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার নাম কী?”
“নাম? আমার?”
“জি।”
“লালচান রাজবংশী।” আমি যখন জিজ্ঞেস করেছিলাম নামটা বলতে রাজি হয়নি, আজকে তাকে বলতে হল!
ম্যাডাম বললেন, “আমি আজকে জনাব লালচান রাজবংশীকে আমাদের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স আপ টিমের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে অনুরোধ করছি।”
মানুষটি নিজের কানকে বিশ্বাস করল না, সে ম্যাডামকে ফিসফিস করে বলল, “কী করছেন ম্যাডাম? আমি একজন মুচি। জুতা সেলাই করি।”
ম্যাডাম বললেন, “আপনি লালচান রাজবংশী, ঝুনঝুন বল মেকার। পুরস্কার তুলে দেন।”
লালচান রাজবংশী পুরস্কার তুলে দিল, যারা খেলোয়াড় তাদের গলায় মেডেল পরিয়ে দিল। ঠিক কী কারণ জানা নেই আমি দেখলাম মানুষটি খুব সাবধানে তার চোখ মুছছে! ক্যামেরাম্যানরা ছবি তুলল আর যতগুলো ছবি তোলা হল সবগুলোর ভিতরে আমি ঢুকে গেলাম, ম্যাডামের পাশে দাঁড়িয়ে আমি দাঁত বের করে হাসতে লাগলাম।
আঁখির গলায় যখন মেডেল পরিয়ে দেওয়া হল তখন প্রচণ্ড হাততালিতে মাঠ ফেটে যাবার অবস্থা। সুজন হাত তুলে চিৎকার করে উঠল, “সবার সেরা!”
আমরা বললাম, “আঁখি! আঁখি।”
আমরা বিশাল কাপটা নিয়ে স্কুলের মাঠে ঘুরতে থাকি। ছোট ক্লাসের ছেলেমেয়েদের উৎসাহ সবচেয়ে বেশি। তারা চিৎকার করতে থাকে, “আমার আপু তোমার আপু-”
“আঁখি আপু! আঁখি আপু!!”
.
০৮.
যখন আঁখি তার আব্বুর কাছ থেকে ক্রিকেট টিমের জন্যে একটা অসাধারণ উপহার আদায় করল
প্রত্যেকবারই ছুটির আগে আমি ছুটিতে কী কী করব তার একটা লম্বা লিস্ট করি, কোনোবারই সেই লিস্টের কোনো কিছুই করা হয় না। স্কুলের ছুটি শেষ হবার আগে প্রত্যেকবারই আমার মন খুঁতখুঁত করতে থাকে যে ছুটিতে কিছুই করতে পারলাম না। এইবার তাই বুদ্ধি করে ছুটির জন্যে কোনো কাজই রাখিনি, ঠিক করে রেখেছি এই ছুটিতে আমি কিছুই করব না, তা হলে ছুটি শেষ হবার পর মন খুঁতখুঁত করবে না। ম্যাডাম অবশ্যি প্রত্যেক ক্লাসের ছেলেমেয়েদের একটা বইয়ের লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছেন, সবাইকে বলে দিয়েছেন ছুটিতে এই বইগুলো পড়তে হবে। গল্পের বই পড়া তো আর কাজ হতে পারে না তাই সেটা নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা নেই। লাইব্রেরি থেকে একজন একেকটা বই ইস্যু করে নিয়েছে। এখন ছুটির মাঝে আমরা নিজেরা নিজেরা বইগুলো নিজেদের ভিতরে বদলাবদলি করে নিচ্ছি। একদিন সুজনের সাথে বই বদল করতে গিয়েছি, গিয়ে দেখলাম সে মহা উত্তেজিত। আমাকে দেখে হাত-পা নেড়ে বলল, “জানিস কি হয়েছে?”
“কী হয়েছে?”
“আমরা যে ক্রিকেট খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম মনে আছে?”
আমি মাথা নাড়লাম, “মনে থাকবে না কেন?”
“আঁখির আব্লু সে জন্যে খুব খুশি হয়েছেন। খুশি হয়ে আঁখিকে বলেছেন আঁখি যেটা চাইবে সেটাই পাবে!”
“কী মজা! আঁখি কী চেয়েছে?”
“কী চেয়েছে সেটা শুনলে তুই ট্যারা হয়ে যাবি।”
আমি বললাম, “আমি কেন ট্যারা হব?”
সুজন বলল, “তুই বল দেখি আঁখি কী চেয়েছে?”
আমি মাথা চুলকালাম। জন্মদিনে তার বাসায় গিয়ে আমি দেখেছি তারা, অসম্ভব বড়লোক। একজন মানুষের যা যা দরকার তার সবই সেই বাসায় আছে। আঁখি বেচারি যেহেতু চোখে দেখতে পায় না তাই অনেক জিনিস সে ব্যবহার করতে পারবে না। আমি চিন্তা করে বললাম, “একটা হনুমানের বাচ্চা?”
সুজন আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, “হনুমানের বাচ্চা?”
“হ্যাঁ। হনুমানের বাচ্চা। ঠিকমতো ট্রেনিং দিলে সেটা আঁখির জন্যে কাজ করতে পারবে। ধর আঁখির একটা কলম দরকার, আঁখি বলবে, “এই গুলু-”
