আঁখি যেখানে ফিল্ডিং দিচ্ছে আমরা তার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিলাম। ঝুনঝুন বলটা যখন কাছে আসে তখন আঁখি তার শব্দ শুনতে পায়, যখন দূরে থাকে তখন সে কিছুই বলতে পারে না। আমরা আঁখির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করছিলাম। যখন বলটা তার দিকে আসছে তখন চিৎকার করে তাকে সাবধান করি, বলি, “আঁখি আসছে, বল আসছে।” কিংবা বলি”একটু ডান দিকে” বা”একটু বাম দিকে!” আঁখি তখন ডানে বামে গিয়ে বলটা ধরে ফেলে। আঁখির কারণেই স্কুলের বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে আমাদের পক্ষে। তাই আশরাফ বল করে যখন ক্লাস টেনের একটা ছেলেকে বোল্ড আউট করে ফেলল তখন পুরো স্কুল আনন্দে চিৎকার করে উঠে নাচানাচি করতে লাগল।
দশ ওভারের খেলা, পাঁচ ওভারে সাতাশ রান হল, এভাবে খেলা চললে ক্লাস টেন প্রায় ষাট রান করে ফেলবে। কিন্তু দেখা গেল ছেলেরা আউট হয়ে যাবার পর তাদের খেলা প্রায় শেষ হয়ে গেল। আমাদের টিমের মেয়েরা দৌড়াদৌড়ি করে খেলে কিন্তু ক্লাস টেনের মেয়েরা একেবারেই লুতুপুতু। নিয়ম করে দেওয়া আছে যে প্রতি টিমে তিনজন মেয়ে থাকতে হবে সেই জন্যেই তাদের রাখা হয়েছে কিন্তু তারা একেবারেই খেলতে পারে না। আমাদের রিতু একাই বল করে দুজনকে বোল্ড আউট করে ফেলল। শেষ মেয়েটা যখন রানআউট হয়েছে তখন তাদের মোট রান বত্রিশ।
আমাদের ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলতে নামল বজলু আর রিতু। দুজনেই খুব ভালো খেলতে লাগল। আমরা চেঁচিয়ে মাঠ গরম করে রাখলাম। আমাদের স্কুলে এমনিতে বাইরের মানুষ আসতে পারে না, আজকে খেলা উপলক্ষে বাইরের মানুষকে আসতে দেওয়া হয়েছে। মাঠে তাই অনেক ভিড়। শুধু মানুষজন নয় ঝালমুড়ি চিনাবাদাম আর আমড়াওয়ালারাও চলে এসেছে। আমি হঠাৎ করে অবাক হয়ে দেখি মাঠের এক কোনায় আমার সেই কমবয়সী মুচি দাঁড়িয়ে আছে। আমার কাছে খেলার খবর শুনে সেও তার কাজ বন্ধ করে খেলা দেখতে চলে এসেছে। আমাদের দলের কেউ রান করলেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠছে সে জোরে জোরে হাততালি দিচ্ছে। প্রথম দিকে আমরা খুবই ভালো খেলছিলাম কিন্তু মাঝামাঝি সময়ে আমাদের খেলায় ধস নামল। একজন মাঠে যায় আর আউট হয়ে ফিরে আসে। দেখতে দেখতে আমরা সবাই আউট হয়ে গেলাম, বাকি আছে শুধু আঁখি! আমাদের তখন মাত্র তেইশ রান হয়েছে। মাঠে আছে সুজন আর আঁখি। তারা দুজন মিলে দশ রান করতে পারবে সেরকম আশা নেই। ক্লাস টেনের একটা ছেলে দুর্দান্ত বল করে, সেই বলের সামনে দাঁড়ানোই মুশকিল।
আঁখি যখন মাঠে খেলতে নেমেছে তখন পুরো স্কুল তার জন্যে হাততালি দিতে থাকে। রিতু তাকে মাঠে নিয়ে স্ট্যাম্পের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। রিতু সেখানে দাঁড়িয়ে কান পেতে চারপাশে কী হচ্ছে শোনার চেষ্টা করল, তারপর খেলার জন্যে প্রস্তুত হল। বোলার ছুটে এসে বল করল, স্ট্যাম্প থেকে বেশ দূর দিয়ে বল এসেছে আঁখি তাই খেলার চেষ্টা করল না। পরের বলটা এলো একেবারে স্ট্যাম্পের সোজাসুজি, আঁখি শেষ মুহূর্তের জন্যে অপেক্ষা করে তারপর ব্যাট ঘুরিয়ে মেরে বসে, আর কী আশ্চর্য সেটা বাউন্ডারি হয়ে গেল।
পুরো স্কুল আনন্দে চিৎকার করে উঠে। আমরা সবাই লাফাতে থাকি, ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলো নাচতে থাকে। ক্লাস টেনের ছেলেমেয়েদের মুখ কালো হয়ে যায়, আঁখি যদি এভাবে বাউন্ডারি মারতে থাকে তা হলে তাদের সম্মানটা থাকে কেমন করে।
আমি হঠাৎ লক্ষ করলাম, ক্লাস টেনের সব ছেলেমেয়েরা আঁখির কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। কেন দাঁড়িয়েছে প্রথমে বুঝতে পারিনি, বোলার বল করার সাথে সাথে আমি কারণটা বুঝতে পারলাম। আঁখি বল দেখতে পায় না তাকে খেলতে হয় ঝুনঝুন শব্দ শুনে। ক্লাস টেনের ছেলেমেয়েরা আঁখিকে সেই শব্দ শুনতে দিবে না, যখনই বল আসতে থাকে তখন তারা সবাই চিৎকার করতে থাকে শব্দ করতে থাকে। তাদের এই কাজকর্ম দেখে আমরা ছুটে ড্রিল স্যারের কাছে গিয়ে নালিশ করলাম, স্যার এসে তাদের নিষেধ করলেন কিন্তু কোনো লাভ হল না তারা শব্দ করতেই লাগল। মাঠ বোঝাই মানুষজন তাদেরকে শান্ত করা চাট্টিখানি কথা নয়।
আঁখি অত্যন্ত বিপজ্জনক দুটি বল টিকে গেল। এই ওভারের শেষ বলটি যদি টিকে যায় তা হলে সুজন ব্যাট করতে পারবে। আমরা নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করে আছি। ক্লাস টেনের দুর্দান্ত বোলার বল করল, বলটা সোজাসুজি স্ট্যাম্পের দিকে যাচ্ছে, আঁখি শুনতে পাচ্ছে কী না আমরা জানি না। আমরা দেখলাম ব্যাট তুলে সে মেরে বসেছে, আর কি আশ্চর্য, ঝুনঝুন বলটা একেবারে আকাশে উঠে গেল। ক্যাচ ধরার জন্যে একটা লম্বা ছেলে ছুটছে কিন্তু বল একেবারে সীমানার বাইরে! অবিশ্বাস্য ব্যাপার আমাদের আঁখি ছক্কা মেরে দিয়েছে। আমরা জিতে গেছি। চিৎকার করতে করতে আমরা মাঠে ঢুকে গেলাম, আঁখিকে ঘাড়ে তুলে আমরা আনন্দে লাফাতে লাগলাম–আঁখি চিৎকার করতে লাগল, “ছেড়ে দে, আমাকে ছেড়ে দে। আমি পড়ে যাব তো!”
আমরা কেউ তার চিৎকারে কান দিলাম না!
খেলা শেষ, এখন পুরস্কার বিতরণী। আমরা সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়েছি। আমাদের নতুন ম্যাডাম পুরস্কার দিবেন। পুরস্কার দেবার আগে দুই একটা কথা বলতে হয় তাই ম্যাডাম হাত তুলে আমাদের থামালেন, তারপর কথা বলতে শুরু করলেন। ম্যাডাম বললেন, “আমরা অনেক ক্রিকেট খেলা দেখেছি কিন্তু আজকের খেলাটা ছিল একেবারে অন্যরকম, কেন তোমরা বলতে পারবে?”
