ড্রিল স্যার অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন, বললেন, “না না। এটা হয় না। একটা মেয়ে চোখে দেখতে পায় না সে কেমন করে ক্রিকেট খেলবে? মেয়েটা ব্যথা পেয়ে যাবে।”
“না স্যার পাবে না।”
“তোদের ক্লাসে তো আরো মেয়েরা আছে। তাদের কাউকে টিমে নে।”
আমি বললাম, “না স্যার। আমরা অন্য মেয়েদের নিতে চাই না। আমরা আঁখিকে নিয়েই খেলতে চাই।”
আগে হলে ড্রিল স্যার এক ধমক দিয়ে বিদায় করে দিতেন। আজকাল কেউ সেটা করে না, ড্রিল স্যার বললেন, “আমি জানি না। ম্যাডামের সাথে কথা বলতে হবে।”
নতুন ম্যাডাম এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। শুধু তাই নয় বলে দিলেন আমাদের টিম যখন ফিল্ডিং করবে তখনো এই ঝুনঝুন বলটা দিয়ে খেলতে হবে। দুপুরবেলা যখন আমাদের টিম প্র্যাকটিস করছে তখন ম্যাডাম আমাদের দেখতে এলেন, বলটা খুব কৌতূহল নিয়ে দেখলেন। এটা আমার আইডিয়া শুনে এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন যেন আমি একজন আইনস্টাইন না হয় বিল গেটস! বলটা কীভাবে তৈরি করিয়েছি সেটাও শুনলেন, মুচি কোনো পয়সা নেয়নি শুনে যতটুকু অবাক হলেন তার থেকে বেশি খুশি হলেন। মাথা নেড়ে বললেন, “দেখেছ, সাধারণ মানুষেরা কতো সুইট?”
.
যেদিন আমাদের টুর্নামেন্ট শুরু হল সেদিন দুপুরের পর ক্লাস ছুটি হয়ে গেল। আমরা সব মাঠের চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়েছি। প্রথম খেলা ক্লাস নাইনের সাথে ক্লাস টেনের। ক্লাস নাইনের দুইজন খুব ভালো ক্রিকেট খেলে কিন্তু কী কারণ কে জানে দুইজনেই খেলার শুরুতেই ক্যাচ তুলে আউট হয়ে গেল! এরপর তারা অনেক টেনেটুনে দশ ওভারে বাইশ রান করে অলআউট। ক্লাস টেন ব্যাট করতে এসে কিছুতেই রান করতে পারে না, আমরা ভেবেছিলাম তারা বুঝি হেরেই যাবে। কিন্তু ক্লাস নাইনের খুবই কপাল খারাপ, সোজা সোজা ক্যাচগুলো ধরতে পারল না। অনেকগুলো নো বল করল তাই শেষ পর্যন্ত ক্লাস টেন জিতে গেল।
ক্লাস সিক্স আর সেভেন মিলে একটা টিম, বিকেলবেলা তাদের সাথে আমাদের ক্লাস এইটের খেলা। টসে সিক্স সেভেন জিতে গিয়ে তারা ব্যাট করতে নেমেছে। দুইটা আলাদা আলাদা ক্লাস মিলে একটা টিম করেছে নিজেদের ভিতরে বোঝাবুঝি হয়নি! তা ছাড়া ক্লাস সেভেনের ছেলেমেয়েগুলো ক্লাস সিক্সের ছেলেমেয়েগুলোর উপর একটু মাতবরি করার চেষ্টা করল। তাই তাদের খেলা হল খুবই খারাপ। মাত্র বারো রানে তারা অলআউট। আমাদের বজলু আর আশরাফ খেলতে নেমে দুইজনই দুই ওভারে বারো রান করে ফেলল। এতো সহজে আমরা জিতে যাব বুঝতে পারিনি! পুরো স্কুলই জেনে গিয়েছে আঁখি আমাদের টিমে খেলবে, তার খেলা দেখার জন্যে সবাই অপেক্ষা করছিল কিন্তু তার ব্যাট করার জন্যে মাঠে নামতেই হল না।
পরের দিন আমাদের ফাইনাল খেলা। আমাদের খেলতে হবে ক্লাস টেনের সাথে। তাদের সাথে হেরে গেলেও আমাদের কোনো দুঃখ থাকবে না, আজকে ছোট ক্লাসের কাছে হেরে যাইনি। তাতেই আমরা খুশি!
বিকেলবেলা বাসায় যাবার সময় রাস্তার পাশে আমার সেই কম বয়সী মুচির সাথে দেখা। একটা পুরোনো চামড়ার স্যান্ডেল দুই পায়ে চেপে ধরে সে সেলাই করছে। আমি সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে মুখ তুলে তাকাল। আমাকে দেখে বলল, “কী খবর?”
“খবর ভালো।”
“তোমার সেই ঝুনঝুন বল কী আছে, না কী ফেটে গেছে?”
“না না ফেটে যায়নি। খুব ভালো কাজ করছে।”
“বাহ!”
আমি বললাম, “সেই বল দিয়ে আমরা এখন টুর্নামেন্ট খেলছি।”
“তাই না কি?”
“হ্যাঁ। যার জন্যে বলটা বানিয়েছিলাম সেও কালকে টুর্নামেন্টে আপনার তৈরি করা বলটা দিয়ে খেলবে।”
মানুষটি বলল, “বাহ্! বাহ! কে জিতেছে বলে যেও।”
আমি মাথা নাড়লাম, “বলব। বলে যাব।”
.
পরের দিন ফাইনাল খেলা নিয়ে আমাদের মাঠে প্রচণ্ড উত্তেজনা। মাঠের এক পাশে একটা টেবিলে একটা বড় আরেকটা ছোট কাপ রাখা হয়েছে। পাশে অনেকগুলো চেয়ার সেখানে স্যার-ম্যাডামরা বসেছেন। উপরে শামিয়ানা টানানো হয়েছে, এক পাশে ব্ল্যাকবোর্ডে স্কোর লেখার ব্যবস্থা। দেখে মনে হয় বুঝি রীতিমতো ওয়ার্ল্ড কাপ খেলা!
খেলার শুরুতে দুই ক্লাসের টিম মাঠে গেল, নতুন ম্যাডাম আর ড্রিল স্যার তাদের সাথে হ্যান্ডশেক করলেন। দুই টিম মিলে লটারি করা হল, লটারিতে আমরা জিতে গেলাম, বজলু তখন ক্লাস টেনকে ব্যাট করতে দিল।
সুজন উইকেটকিপার, বজলু প্রথমে বল করবে। আশরাফ আর মামুন মাঠের ডান পাশে, রিতু আর আঁখি বাম পাশে। শান্তা উইকেটকিপারের পিছনে।
ড্রিল স্যার বাঁশি দিলেন, সাথে সাথে খেলা শুরু হল। ক্লাস টেনের বড় বড় দুজন ছেলে ব্যাট করতে এসেছে। বজলু বল করল, ব্যাটসম্যান ঘুরিয়ে মারল সাথে সাথে বাউন্ডারি! ক্লাস টেনের ছেলেমেয়েরা আনন্দে লাফাতে থাকে আমাদের মুখ চুন। বজলু আবার বল করল, ছেলেটা আবার ঘুরিয়ে মারল, আবার বাউন্ডারি হয়েই যেত শেষ মুহূর্তে আশরাফ ঠেকিয়ে ফেলল। তার মাঝে ছেলেটি দুই রান করে ফেলেছে। ক্লাস টেনের ছেলেমেয়েরা আবার লাফাতে থাকে। বজলু আবার বল করল, ছেলেটা আবার ঘুরিয়ে মারল, বল আকাশে উঠে যায়, এবারে নির্ঘাত ছক্কা! কিন্তু ছক্কা হল না আমাদের রিতু ক্যাচ ধরে ফেলল। তখন আমাদের আনন্দ দেখে কে, আমরা চিৎকার করে লাফিয়ে কুঁদিয়ে মাঠ গরম করে ফেললাম। ড্রিল স্যার বাঁশি বাজিয়ে আমাদের মাঠ থেকে বের করে দিলেন, আবার খেলা শুরু হল। বেঁটে মতোন একটা ছেলে ব্যাট করতে এসেছে, এতো তাড়াতাড়ি আউট হয়ে তারা এবারে খুব সাবধানে খেলতে লাগল।
