আমরা থামলাম। মামুন জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
বজলু বলল, “ক্রিকেট টুর্নামেন্টের জন্যে টিম তৈরি করতে হবে।”
মামুন বলল, “আমরা কোনোভাবেই ক্লাস নাইনের সাথে পারব না। ওরা খুব ভালো ক্রিকেট খেলে।”
রিতু বলল, “না পারলে নাই।”
সুজন বলল, “কারা কারা ভালো খেলে আমাকে বলে দিস। আমি ব্যবস্থা করে দেব।”
রিতু ভুরু কুঁচকে বলল, “কী ব্যবস্থা করবি?”
সুজন বলল, “খেলার সময় দেখবি তারা শুধু বদনা নিয়ে বাথরুমে যাচ্ছে আর বের হচ্ছে।“ ব্যাপারটা চিন্তা করেই সুজনের মুখে আনন্দের হাসি ফুটে উঠল।
বজলু বলল, “বাজে কথা বলে লাভ নাই। আমাদের টিম তৈরি করতে হবে, তারপর প্র্যাকটিস করতে হবে।”
মামুন হতাশভাবে মাথা নেড়ে বলল, “আমাদের ক্রিকেট টিম তৈরি করে লাভ নাই, আমাদের ক্লাসে কেউ ক্রিকেট খেলতে পারে না।”
বজলু বলল, “ভালো খেলতে হলে বেশি করে খেলতে হয়। তোরা কেউ ক্রিকেট খেলবি না, দিন রাত সাতচাড়া খেলবি তা হলে কেমন করে হবে?”
আমি বললাম, “ক্রিকেট টুর্নামেন্ট না হয়ে সাতচাড়া টুর্নামেন্ট হলে কেউ আমাদের সাথে পারত না।”
বজলু মুখ শক্ত করে বলল, “সাতচাড়া টুর্নামেন্ট হচ্ছে না। হচ্ছে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট।”
সুজন বলল, “আমরা নতুন ম্যাডামকে গিয়ে বলতে পারি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের বদলে সাতচাড়া টুর্নামেন্ট করতে।”
বজলু বলল, “বাজে কথা বলবি না।”
মামুন হতাশভাবে মাথা নাড়ল, বলল, “টুর্নামেন্টে আমরা যে লাড্ড গাড়া, ক্লাস টুয়ের কাছে হেরে যাব। আমাদের ক্লাসে কেউ ক্রিকেট খেলতে পারে না।
বজলু বিরক্ত হয়ে বলল, “ভ্যাদর ভ্যাদর না করে খেলতে আয়।”
কাজেই আমাদের সাতচাড়া বন্ধ করে ক্রিকেট খেলা শুরু করতে হল। মামুনের কথা সত্যি আমাদের ক্লাসে বজলু ছাড়া আর কেউ ক্রিকেট খেলতে পারে না । যখন বল করতে বলা হয় তখন বলটি স্ট্যাম্প থেকে দশ হাত দূর দিয়ে যায়। যখন ব্যাট করতে হয় তখন ব্যাট ঘুরিয়ে মারার পর দেখা যায় বল তার জায়গাতেই আছে আমরা ব্যাটটা বলকে লাগাতেই পারিনি। আমরা অবশ্যি হাল ছাড়লাম না প্র্যাকটিস করতে লাগলাম।
পরের দিন খেলা শুরু করার আগে বজলু বলল, “খামোখা সবাইকে নিয়ে না খেলে টিম তৈরি করে ফেলি। যারা টিমে থাকবে তারা প্র্যাকটিস করুক।”
আমরা রাজি হলাম। সাতজনের টিমে কমপক্ষে তিনজন মেয়ে থাকতে হবে। রিতু আর শান্তা টিমে থাকতে রাজি হল কিন্তু আর কাউকেই রাজি করানো গেল না। সুমি বলল দূর থেকে একজন ছুটে এসে তার দিকে বল ছুঁড়ে দিচ্ছে দেখেই না কী তার বুক ধড়াস ধড়াস করে। মিতু বলল ব্যাডমিন্টন হলে সে খেলতে রাজি আছে কিন্তু ক্রিকেট খেলতে রাজি না। লিপি বলল রোদের মাঝে দৌড়াদৌড়ি করে ক্রিকেট খেললে তার মাথা ধরে যায়। মাধুরী ক্রিকেট খেলার কথা শুনে হাসতে হাসতেই গড়াগড়ি খেল। আমি তখন বললাম, “আঁখিকে নিয়ে নিই।”
সবাই অবাক হয়ে বলল, “আঁখি?”
“হ্যাঁ। আঁখি যখন ব্যাট করবে তখন ঝুনঝুন বলটা দিয়ে বল করলেই হবে।”
রিতু বলল, “আঁখি, তুই খেলবি?”
আঁখি বলল, “আমি জীবনে ক্রিকেট খেলি নাই।”
বজলু বলল, “কেউই খেলে নাই।”
আঁখি বলল, “এমনিতে আমি চেষ্টা করতে পারি কিন্তু টুর্নামেন্টে খেলা ঠিক। টুর্নামেন্টে আসল প্লেয়ারদের খেলা উচিত। আমাদের ক্লাসের প্রেস্টিজ।”
বজলু বলল, “আমাদের কোনো আসল প্লেয়ার নাই।”
মামুন বলল, “সব ভুয়া।”
আমি বললাম, “তুই ব্যাট নিয়ে দাঁড়া। আমরা বল করে দেখি তুই পারিস কি না।”
আঁখি ইতস্তত করতে লাগল, তারপরেও আমরা তাকে ব্যাটসহ দাঁড় করিয়ে দিলাম। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা হল একটু অন্যরকম কিন্তু আমরা সেটা নিয়ে মাথা ঘামালাম না। বজলু অন্যপাশ থেকে বল করতে গেল। প্রথম বলটা আঁখি মারার চেষ্টা করল না, মনে হল কান পেতে বোঝার চেষ্টা করল ঝুনঝুন শব্দ করে বলটা কোন দিকে কত দূরে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বলটা আসতেই সে একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করে হঠাৎ ব্যাট ঘুরিয়ে মেরে বসল। সত্যি সত্যি ব্যাটটা বলে লেগে যায় আর বলটা ঝুনঝুন শব্দ করে রীতিমতো আকাশে উড়ে গেল। আমরা সবাই হাততালি দিতে লাগলাম, বজলু বলল, “ফাটাফাটি ব্যাটসম্যান! একেবারে ফাটাফাটি!”
আঁখি হেসে বলল, “ঝড়ে বক পড়েছে!”
রিতু বলল, “দেখি ঝড়ে কতো বক পড়ে।”
বজলু আবার বল করল, এবার আগের থেকে জোরে আর কী আশ্চর্য আঁখি সত্যি সত্যি আবার বলটাকে মেরে বসল। যদি সত্যিকারের খেলা হত তা হলে সেটা হত রীতিমতো বাউন্ডারি।
রিতু বলল, “ব্যস ব্যস হয়ে গেছে। আমরা টিম মেম্বার পেয়ে গেছি। আঁখি হবে তিন নম্বর মেম্বার।”
আঁখি মাথা নেড়ে আপত্তি করে বলল, “না না। এটা মোটেও ঠিক হবে না। একটা সত্যিকারের টুর্নামেন্টে আমি খেলব কেমন করে?”
আমি বললাম, “কেন? তুই খেললে সমস্যা কী?”
আঁখি বলল, “সেটা যদি তোরা না বুঝিস তা হলে আমি কেমন করে বোঝাব?”
রিতু বলল, “এত বোঝাবুঝির দরকার নাই। টুর্নামেন্টে আমাদের জেতারও দরকার নাই। আমাদের একটা টিম হলেই হল–আর কিছু চাই না।”
ড্রিল স্যার আমাদের টিমের নাম দেখে চোখ কপালে তুলে বললেন, “আঁখি? আঁখি তোদের টিমে খেলবে?”
বজলু বলল, “জি স্যার?”
“কেমন করে খেলবে?”
“আঁখির একটা টেনিস বল আছে সেটা ঝুনঝুন শব্দ করে। আঁখি যখন ব্যাট করবে তখন সেটা দিয়ে বল করতে হবে।”
