ছেলেটা বলটা আঁখির দিকে ছুঁড়ে দেয়, আঁখি সত্যি সত্যি বলটাকে ধরে ফেলল। সবাই তখন আনন্দে চিৎকার করে উঠল! আঁখি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি এখন তোদের সাথে সাতচাড়া খেলতে পারব!”
আমি মাথা নাড়লাম, “হ্যাঁ। সেই জন্যেই তো তৈরি করেছি।”
আঁখি বলল, “তিতু তুই একটা জিনিয়াস!” তারপরে সে আমাকে আনন্দে জাপটে ধরল।
.
আঁখির আম্মু ডাইনিং টেবিলে একটু পর পর অনেক রকম খাবার রেখে যেতে লাগলেন কিন্তু আমরা খাওয়ার জন্যে ভেতরে এলাম। আঁখিকে নিয়ে সাতচাড়া খেলোম। সে যে খুব সাংঘাতিক প্লেয়ার তা না, কিন্তু জীবনে এই প্রথমবার সে একটা বল নিয়ে ছোটাছুটি করে খেলছে!
০৭-৮. স্কুলে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট
যখন আমাদের স্কুলে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হল এবং সেখানে এমন ব্যাপার ঘটল যেটা কেউ কোনোদিন কল্পনাও করতে পারবে না
এসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে নতুন ম্যাডাম বললেন, “সামনের সপ্তাহ থেকে আমাদের স্কুলে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হবে।”
ছেলেরা আনন্দের মতো শব্দ করল এবং মেয়েরা হতাশার মতো শব্দ করল। যখন শব্দ কমে এলো তখন ক্লাস নাইনের একটা মেয়ে বলল, “আমাদের জন্যে কী খেলা হবে ম্যাডাম?”
ম্যাডাম বললেন, “পরের বার আমরা মেয়েদের জন্যে আলাদা করে ক্রিকেট হ্যান্ডবল কিংবা অন্য কোনো খেলা শুরু করব। এবারে ছেলেদের সাথে খেলবে। ছেলে এবং মেয়ে মিলে যৌথ ক্রিকেট।”
সব ছেলেরা হইহই করে উঠল এবং বলার চেষ্টা করল যে মেয়েরা মোটেও ক্রিকেট খেলতে পারে না। মেয়েরা হইহই করে উঠল এবং বলার চেষ্টা করল যে ছেলেরা মোটেও তাদের খেলায় নেবে না। ম্যাডাম শান্তমুখে অভিযোগটা শুনে বললেন, “তোমরা যদি মনে কর আমি এই স্কুলের মাঠে খুব ভালো ক্রিকেট খেলা দেখতে চাই তা হলে জেনে রাখ সেটা সত্যি নয়। ভালো ক্রিকেট খেলা দেখতে চাইলে আমি শহরের স্পোর্টস ক্লাবকে বলতাম তাদের টিম নিয়ে এই মাঠে খেলতে-তারা তোমাদের থেকে অনেক ভালো ক্রিকেট খেলে। ঠিক কি না?”
ম্যাডাম কোন লাইনে কথা বলতে চাইছেন বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে সেটা ধরতে পারল না তাই তারা হ্যাঁ কিংবা না কোনোটাই বলল না। শেষ পর্যন্ত কী বলেন সেটা শোনার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকল। ম্যাডাম বললেন, “আমরা ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করছি” থেমে গিয়ে হাত তুলে পুরো স্কুলের ছেলেমেয়েদের দেখিয়ে বললেন, “তোমাদের খেলা দেখার জন্যে। ভালো হোক খারাপ হোক কিছু আসে যায় না। খেলাটা হতে হবে তোমাদের। বুঝেছ?” ছেলেমেয়েরা মাথা নাড়ল। ম্যাডাম বললেন, “আমি চাই তোমরা সবাই খেল এবং তোমাদের ভেতর যারা ভালো খেলতে পার তারা মিলে টিম তৈরি কর। সেই টিমে ছেলে আর মেয়ে দুইই থাকতে হবে।”
ম্যাডাম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমরা কেন ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু করেছি কে বলতে পারবে?”
ক্লাস টেনের একজন ছেলে বলল, “বাংলাদেশের ক্রিকেট টিম খুব ভালো। সেই জন্যে আমরাও যেন ভালো হতে পারি সেই জন্যে।”
“উঁহু। হয়নি।”
সুজন বলল, “ক্রিকেট খেলায় মারামারি কম হয়। সেই জন্যে।”
ম্যাডাম ভুরু কুঁচকে বললেন, “কোন খেলায় মারামারি বেশি হয়?”
“ফুটবল খেলায়।” সুজন একগাল হেসে যোগ করল, “ক্রিকেট থেকে আমার ফুটবল খেলাটা সবসময় বেশি ভালো লাগে।”
“সেটা তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু ক্রিকেট খেলায় মারামারি কম হয় মোটেও সেই জন্যে আমরা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু করছি না। অন্য কারণ আছে।”
আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “অন্য কী কারণ ম্যাডাম?”
ম্যাডাম বললেন, “মানুষের অনেক ধরনের বুদ্ধিমত্তা আছে, কিন্তু এই স্কুলে আমরা শুধু একটা বুদ্ধিমত্তার টেস্ট করি। সেটা হচ্ছে লেখাপড়ার বুদ্ধিমত্তার। লেখাপড়ার বাইরে অন্য যে বুদ্ধিমত্তা আছে আমরা সেগুলোর খোঁজ নিই না, সেগুলোর গুরুত্ব দেই না সেগুলো বাড়ানোরও চেষ্টা করি না। সেই বুদ্ধিমত্তাগুলো লেখাপড়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ–অনেক সময় লেখাপড়া থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা আস্তে আস্তে তোমাদের মাঝে সেই বুদ্ধিমত্তাগুলো খুঁজব। সেটা শুরু করছি একটা খেলা দিয়ে আস্তে আস্তে আমরা অন্য কিছুও করব। গান, কবিতা আবৃত্তি, সায়েন্স ফেয়ার, নাটক, ডিবেট, ছবি আঁকা, দাবা খেলা, স্পোর্টস, দৌড়ঝাঁপ, বই পড়া আমরা সবকিছু শুরু করব। দেখবে তোমাদের সবারই নিজস্ব একটা ক্ষেত্র আছে। আমরা যার যার ক্ষেত্রের নায়কদের খুঁজে বের করব–নায়িকাদের খুঁজে বের করব।”
সবাই যখন নায়ক নায়ক নায়িকা নায়িকা” করে চিৎকার করছে তখন সুজন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “দুষ্টুমির একটা কম্পিটিশন থাকলে কী মজা হত। তাই না?”
আমি মাথা নাড়লাম, বললাম, “তুই তা হলে শুধু স্কুলে না, ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাবি।”
ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন, “ক্রিকেট টিম নিয়ে তোমাদের কোনো প্রশ্ন আছে?”
ক্লাস টেনের বড় একটা ছেলে জিজ্ঞেস করল, “ক্রিকেট টুর্নামেন্ট কী ক্রিকেট বল দিয়ে হবে না কী টেনিস বল দিয়ে?”
ম্যাডাম আমাদের ড্রিল স্যারের দিকে উত্তরের জন্যে তাকালেন। ড্রিল স্যার বললেন, “ছোট ছোট বাচ্চারাও খেলবে তাই শুরু হবে টেনিস বল দিয়ে।”
ছেলেদের ভিতর যারা ভালো ক্রিকেট খেলে তারা যন্ত্রণার মতো শব্দ করল।
.
দুপুরবেলা আমরা আঁখিকে নিয়ে তার ঝুনঝুন টেনিস বল দিয়ে সাতচাড়া খেলছি–এরকম সময় বজলু ঘাড়ে একটা ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে হাজির। হাত তুলে বলল, “থাম।”
