আমাদের খাওয়া শেষ হবার পর বড়রা খেতে বসে। তখন লালচে চুলের একটা মেয়ে বলল, “সবাই বাইরের ঘরে এসো। এখন আঁখির গিফট খোলা হবে।”
সবাই হইহই করে বাইরের ঘরে হাজির হয়। আঁখি দেয়ালে হেলান দিয়ে একটা কার্পেটের উপর বসে আর সবাই তখন তার উপহারগুলো তার সামনে এনে রাখতে থাকে। কতো রকম উপহার, ছোট বড় মাঝারি বাক্স, চকচকে রঙিন কাগজ দিয়ে মোড়ানো। লাল চুলের মেয়েটা সামনে বসে বড় একটা বাক্স তুলে উপরে লেখাগুলো পড়ে বলল, “এটা দিয়েছেন বড় খালাম্মা। হ্যাপি বার্থডে লেখা গিফট র্যাপ দিয়ে র্যাপ করেছেন।”
সবাই চিৎকার করে বলল, “বড় খালাম্মী। বড় খালাম্মা।”
আঁখি বাক্সটা খোলার চেষ্টা করে, আশেপাশে বসে থাকা ছোট ছোট কয়েকটা বাচ্চা টানাটানি করে তাকে সাহায্য করে, বাক্সটা খোলর পর ভেতর থেকে একটা টেডিবিয়ার বের হয়ে আসে। আঁখি নরম তুলতুলে টেডিবিয়ারটি বুকে চেপে একটু আদর করে বলল, “থ্যাংকু বড় খালা। থ্যাংকু।”
বড় খালা কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন, বললেন, “তোকে যে কী দেব বুঝতে পারি। তুই টেডিবিয়ার পছন্দ করিস তাই প্রতি বছর একই জিনিস দিয়ে যাচ্ছি।”
আঁখি বলল,”বড় খালা এটাই আমার পছন্দ। থ্যাংকু।”
লালচে চুলের মেয়েটা আরেকটা বাক্স আঁখির হাতে তুলে দিল। আঁখি বাক্সটা খুলতেই ভেতর থেকে একটা ইলেকট্রনিক গেম বের হয়ে এলো। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা দশ-বারো বছরের ছেলে উত্তেজিত গলায় বলল, “আঁখি আপু এইটা মেমোরি গেম। তুমি একটা বাটন চাপ দিবে তখন একটা শব্দ হবে। সেটা মনে রেখে আরেকটা চাপ দিবে।”
আঁখি বলল, “থ্যাংকু লিটন।”
“আব্বু সিঙ্গাপুর থেকে এনেছে।”
“হাউ নাইস। মামাকে থ্যাংকু দিস লিটন।”
ছেলেটি গম্ভীর গলায় বলল, “দিব আঁখি আপু।”
আঁখির আত্মীয়স্বজনেরা সবাই নিশ্চয়ই খুব বড়লোক-প্রত্যেকটা বাক্স থেকেই খুব দামি দামি উপহার বের হতে থাকল। কোনোটা এমপি থ্রি প্লেয়ার, কোনোটা মোবাইল ফোন, কোনোটা ইলেকট্রনিক গেম, কোনোটা দামি কাপড়, কোনোটা সুন্দর জুতো, কোনোটা মুক্তার মালা-এমন কিছু নেই যেটা সে উপহার হিসেবে পায়নি।
বাক্সগুলো খুলতে খুলতে হঠাৎ করে আমাদের একটা প্যাকেট বের হল। লালচে চুলের মেয়েটা প্যাকেটের উপর লেখা দেখে পড়ল, “আঁখি আপু এটা দিয়েছে তোমার স্কুলের তিনজন বন্ধু–রিতু, শান্তা, আর সুমি। প্যাকেটটা খুব সুন্দর লাল কাগজ দিয়ে সাজিয়েছে।”
আঁখি প্যাকেটটা হাতে নিয়ে খুলতেই ভেতর থেকে অনেকগুলো সিডি বের হল। আঁখি হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কীসের সিডি, তখন রিতু বলল, “আঁখি আমরা দশটা গল্পের বই রেকর্ড করে দিয়েছি। একটা ভূতের, দুইটা সায়েন্স ফিকশান অন্যগুলো অ্যাডভেঞ্চার!”
আঁখি আনন্দে চিৎকার করে বলল, “থ্যাংকু থ্যাংকু তোদের। থ্যাংকু।” তারপর সিডিগুলো খানিকক্ষণ বুকে চেপে রেখে বলল, “তোরা কখন এগুলো করলি?”
রিতু বলল, “আস্তে আস্তে করেছি। আমার ভাইয়া সিডিতে রাইট করে দিয়েছে।”
শান্তা বলল, “আমরা নিজেরা পড়েছি তো তাই উচ্চারণগুলো কিন্তু আমাদের মতোন।”
আঁখি বলল, “সেটাই তো সবচেয়ে ভালো। আমি যখন শুনব তখন মনে হবে তোরা পাশে বসে আছিস!”
আরো কয়েকটা প্যাকেট খোলার পর আঁখি আমার ছোট বাক্সটা হাতে নিল। সেটা একটু ঝুনঝুন শব্দ করে উঠল, আঁখি তখন সেটা কানের কাছে নিয়ে ঝাঁকায়, তারপর জিজ্ঞেস করে, “এটা কী?”
লালচে চুলের মেয়েটা বলল, “এটা দিয়েছে তিতু।”
আঁখি জিজ্ঞেস করল, “এটা কী তিতু?”
আমি ইতস্তত করে বললাম, “খুবই হাস্যকর একটা জিনিস! তোর এতো সুন্দর সুন্দর গিফটের সাথে এটা না খুলে পরে খুলিস।”
লালচে চুলের মেয়েটা বলল, “না না! সব এখনই খুলতে হবে।”
আঁখি বাক্সটা খুলতেই টেনিস বলটা বের হয়ে এলো। আঁখি বলটা হাতে নিয়ে নাড়াতেই সেটা ঝুন ঝুন শব্দ করে উঠল, সাথে সাথে আঁখি ইলেকট্রনিক শক খাওয়ার মতো চমকে ওঠে, “এটা কোথায় পেয়েছিস?”
“পাইনি। তৈরি করেছি।”
“তৈরি করেছিস?” আঁখি উত্তেজিত গলায় বলল, “তুই তৈরি করেছিস?”
“আমি নিজে তৈরি করিনি–একজন আমাকে তৈরি করে দিয়েছে।”
“কী আশ্চর্য!” আঁখি বলটা দুই হাতে ধরে বুকে চেপে রাখল। তাকে দেখে মনে হয় সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। যারা আঁখিকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল তারা এখনো ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছে না। দামি দামি উপহার পেয়ে আঁখি ভদ্রতার কথা বলে সেগুলো পাশে রেখে দিয়েছে–আর এই অতি সাধারণ টেনিস বল পেয়ে সে কেন এতো উত্তেজিত হয়ে উঠেছে কেউ বুঝতে পারছে না।
আঁখি উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, “আম্মু আব্বু দেখে যাও আমি কী পেয়েছি!”
আঁখির আম্মু আর আব্বু কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এলেন, “কী পেয়েছিস মা?”
“এই দেখো, ঝুনঝুনি টেনিস বল।” কেন এই টেনিস বলটা পেয়ে সে উত্তেজিত সেটা বোঝানোর জন্যে বলটা উপরে ছুঁড়ে দেয়, সেটা ঝুনঝুন শব্দ করে উপরে উঠে যখন আবার ঝুনঝুন শব্দ করে নেমে আসে সে শব্দটা লক্ষ করে বলটা খপ করে ধরে ফেলল!
হঠাৎ করে সবাই এই বলটার গুরুত্বটা ধরতে পারে আর সবাই একসাথে বিস্ময়ের শব্দ করল। আঁখিকে ঘিরে থাকা ছেলেমেয়ের ভেতরে একজন বলল,
“বলটা আমার দিকে ছুঁড়ে দাও আপু!”
আঁখি বলটা ছুঁড়ে দিল। ছেলেটা বলটা ধরে বলল, “এখন তুমি ধরো।”
