আঁখিদের বাসাটি বিশাল, বাসার ভেতরে অনেক জায়গা। আঁখি দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল, আমাদের কেউ একজন এলেই সে আনন্দে চিৎকার করে উঠছে। আমি আসামাত্রই সে একটা চিৎকার দিল, “ও তিতু তুই এসেছিস! থ্যাংকু থ্যাংকু।”
পাশে হালকা পাতলা একজন মহিলা দাঁড়িয়েছিলেন, আঁখি তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আম্মু, এই হচ্ছে তিতু। আমাকে প্রথম দিন স্কুলে যখন অপমান করছিল আমি যখন রেগেমেগে বের হয়ে আসছিলাম তখন তিতু সবার আগে লাফ দিয়ে উঠে বলেছিল দাঁড়াও!”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “তুই সেটা জানিস?”
“জানব না কেন?” আঁখি হি হি করে হাসল, “আমি না চাইলেও সবকিছু শুনি! সবকিছু মনে থাকে!”
আঁখির আম্মু বললেন, “এসো বাবা। ভেতরে এসো।”
বাসাটা খুব সাজানো গোছানো। এটা সবসময়ই এরকম সাজানো গোছানো থাকে না কী আঁখির জন্মদিনের জন্যে এভাবে সাজানো হয়েছে বোঝা গেল না। বিশাল বড় একটা ডাইনিং টেবিলের উপর খুব বড় একটা কেক। পিছনে একটা জন্মদিনের ব্যানার। ঘরের চারপাশে অনেক বেলুন। বাসায় অনেক মানুষ, বেশির ভাগেরই বয়স কম। যাদের বয়স একটু বেশি কম তারা ছোটাছুটি করছে। আমাদের বয়সী ছেলেমেয়েরা একটু ভদ্র হয়ে বসে থাকার চেষ্টা করছে। আঁখির আত্মীয়স্বজন, চাচাতো মামাতো খালাতো ফুপাতো ভাইবোনেরাও এসেছে। স্কুলের ছেলেমেয়েরা এক পাশে বসে নিজেরা নিজেরা গল্প করছি শুধু রিতু অপরিচিত ছেলেমেয়েদের সাথেও ভাব করে ফেলছে! আমি জানি আজকে জন্মদিনের শেষে যখন আমরা সবাই ফিরে যাব তখন এই বাসার সবাই শুধু রিতুর কথা মনে রাখবে।
এরকম সময় একজন মানুষ একটা গ্লাসের মাঝে চামুচ দিয়ে ঠুন ঠুন শব্দ করতে লাগলেন, আর সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়াল, আমরাও গেলাম। মানুষটাকে আমরা চিনতে পারলাম, আঁখির আব্বু, প্রথম দিন আঁখিকে নিয়ে আমাদের স্কুলে এসেছিলেন। আঁখির আব্বু তখন গ্লাসে ইন ইন শব্দ বন্ধ করে বললেন, “আঁখির জন্মদিনে আসার জন্যে সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। এখন আমরা জন্মদিনের কেক কাটব তারপর আমাদের লাঞ্চ। লাঞ্চের পর জন্মদিনের উপহার খোলা হবে।”
সুজন হাত তুলে বলল, “কেকটা খালি কাটব? খাব না?”
সবাই হেসে উঠল, আঁখির আব্বুও হাসলেন, বললেন, “খাব, অবশ্যই খাব। এতো ভালো একটা কেক আনা হয়েছে সেটা আমাদের খেতে হবে। যখন জন্মদিনের উপহার ভোলা হবে তখন কেকও খাওয়া হবে।”
কোনো কারণ ছাড়াই সবাই তখন আনন্দে চিৎকার করে উঠল। আঁখির আব্বু বললেন, “কেক খেতে খেতে জন্মদিনের উপহার খোলার পর আমরা বড়রা সরে যাব। তখন তোমরা ছোটরা যেভাবে খুশি সময় কাটাতে পার। বাইরে খালি জায়গা আছে খেলতে পার, ভেতরে নাচানাচি করতে পার, লাফালাফি করতে পার। তোমাদের বাসা থেকে পারমিশান দেওয়া থাকলে যতক্ষণ খুশি থাকতে পার। কীভাবে বাসায় যাবে সেটা নিয়ে চিন্তা কোরো না, আমি সবাইকে বাসায় পৌঁছে দেব।”
সবাই তখন আবার আনন্দের একটা শব্দ করল। আঁখির আম্মু হাত তুলে সবাইকে বললেন, “আমি জানি তোমাদের বয়সী ছেলেমেয়েদের বেশি বেশি খিদে পায়–তাই একটু পরে পরেই এই টেবিলে নাস্তা দেওয়া হবে। তোমরা খাবে।”
সুজন আবার হাত তুলে জিজ্ঞেস করল, “কী কী নাস্তা দেওয়া হবে?”
সুজনের প্রশ্ন শুনে সবাই আবার হেসে উঠল, শুধু আঁখির আম্মু হাসলেন না, বললেন, “চানাচুর, চিপস, বিস্কুট, স্যান্ডউইচ, শিঙ্গাড়া, সমুচা, চিকেন নাগেট, মিষ্টি, ফলমূল, কোল্ড ড্রিংকস। তুমি যদি এর বাইরে আর কিছু চাও আমাকে বলতে পার।”
আঁখির আম্মুর লিস্ট শুনে সুজনের মতো মানুষও একটু লজ্জা পেয়ে গেল, বলল, “না খালাম্মা আর কিছু লাগবে না।”
আঁখির আব্বু বললেন, “তা হলে সবাই এসো, আমরা কেক কাটি।” আমরা ছোটাছুটি করে আঁখির পাশে দাঁড়ালাম, সাধারণত এরকম সময়ে অনেক মানুষ ছবি তোলে কিন্তু এখানে কেউ ছবি তুলছে না। আঁখি ছবি দেখতে পারে না সেই জন্যেই মনে হয় ছবি তোলায় কারো উৎসাহ নেই। একজন মানুষ শুধু চুপচাপ একটা ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে ভিডিও করছে। কেকের উপর মোমবাতি লাগানো হল সেই মোমবাতি জ্বালানো হল তারপর হঠাৎ একজন সুর করে হ্যাপি বার্থ ডে গাইতে শুরু করল। আমরা সবাই তখন গলা মিলিয়ে হ্যাপি বার্থ ডে গাইতে লাগলাম। কেউ একজন বলল, “ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভাও।”
আরেকজন চিৎকার করে বলল, “এক ফুঁয়ে নিতে হবে কিন্তু।”
এক ছুঁয়ে যদি নিভানো না যায় কেউ সেই ঝুঁকি নিল না। সবাই মিলে চারিদিক দিয়ে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দিল। তখন আঁখির হাতে একজন কেক কাটার ছুরি ধরিয়ে দিল, আঁখি বলল, “ওয়ান টু থ্রি”, তারপর কেকটার মাঝখান দিয়ে কেটে ফেলল। সবাই চিৎকার চেঁচামেচি করতে থাকে আর তখন একজন কেকটা ভিতরে নিয়ে টেবিলে খাবার দিতে থাকে। কতো রকম খাবার, দেখে আমাদের চোখ একেবারে ছানাবড়া হয়ে গেল। খাবার দেখেই কি না জানি না আমাদের হঠাৎ করে সবার একসাথে খিদে লেগে গেল। আমরা তখন রীতিমতো কাড়াকাড়ি করে প্লেটে খাবার নিতে থাকি গপগপ করে খেতে থাকি! একজন এর মাঝে টেবিলে মাংসের বাটি উল্টে ফেলল, একজনের হাত থেকে চপ নিচে পড়ে গেল, একজনের খাবার বোঝাই প্লেট মেঝেতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল, কোল্ড ড্রিংকসের বোতল থেকে ভুর ভুর করে ফেনা বের হয়ে এলো, কিন্তু কেউ সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামালো না।
